ক্যাম্পাসে শুধু মারামরি হয়না, অনেক ভালো এবং সেবামূলক কাজও হয়। এমনই একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন হয়ে আছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। দীর্ঘদিন যাবত সেখানে ছাত্র সংগঠনগুলো ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের বাইক সেবাসহ বিভিন্ন কল্যাণকর কাজ সাধন করে আসছে।
গত ১৮ জুন বগুড়ার মালতীনগর এলাকা থেকে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে এসেছিলেন ইসতিয়াক হোসেন। সাথে ছিল তার বড়ভাই ইকরাম হোসেন। সেদিন ছিল আইবিএ ইউনিটের প্রথম বর্ষের ভর্তি পরীক্ষার দিন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পৌঁছেই তারা পড়লেন মহা ফ্যাসাদে। প্রবেশপত্রে লেখা থাকলেও বিশাল ক্যাম্পাসে আর্টস ফ্যাকাল্টি খুঁজে পাচ্ছিলেন না তারা। একে তো সময় খুব কম, তার উপরে মুসলধারে বৃষ্টি। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক থেকেই নানাজনকে জিজ্ঞেস করে করে অস্থির অবস্থা প্রায়।
জয় বাংলা বাইক সার্ভিস: পরীক্ষার এবং লোকেশন খোঁজার উৎকন্ঠার মাঝে হঠাৎ করে তাদের চোখ গেলো একটি ব্যানারের দিকে। দুইভাই ছুটে গেলেন সেদিকে। বর্ষণের মাঝেও সেখানে খুবই ভিড়। অনেকগুলো মোটর বাইক নিয়ে একদল ছাত্র-যুবক বসে আছে, তারা কথা বলছিলেন জাবি ক্যাম্পাসে ভর্তি পরীক্ষার জন্য আগত পরীক্ষার্থী এবং তাদের অভিভাবকদের সাথে। ব্যানারে লেখা ছিল জয় বাংলা বাইক সার্ভিস। ফ্রি’তে অর্থাৎ বিনা ভাড়ায় ওই যুবকরা তাদের বাইকে করে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে আসা শিক্ষার্থীদের নিজ নিজ গন্তব্য পৌঁছে দিচ্ছেন।
পুরো বিষয়টি তাদের খুবই বিস্মিত করেছে। মারামারি করা ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা নতুনদের এমন একটি সেবা দেবে, সেটা যেন তাদের কারো কল্পনাতেও নেই। বিশেষ করে ঝড়-বৃষ্টির মতো প্রতিকূল পরিবেশে, তাও গাঁটের পয়সা খরচ করে! হাতে সময় কম, তাই এ নিয়ে ইসতিয়াকের বেশি কিছু ভাবার অবস্থা ছিল না।বড়ভাইকে সেখানেই অপেক্ষায় রেখে চেপে বসলেন একজনের বাইকের পিছনে। জয় বাংলা বাইক সার্ভিসের সেই কর্মী তাকে গন্তব্যে পৌঁছে দিয়ে দ্রুত ফিরে গেলেন আরেকজন নবাগতকে সেবা দিতে।
কেবল একজন ইসতিয়াকই নয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে আসা প্রায় সব প্রার্থীদেরকেই তার মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি পড়তে হয়েছে। এমনি সংকটময় মুহূর্তে সেই সেবাটি ছিল তার মতো নবীনদের জন্য একটি বড় পাওয়া। “জয় বাংলা বাইক সার্ভিস” হচ্ছে সরকারি দলের সহযোগী সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ জাবি শাখার একটি সেবা প্রতিষ্ঠান।
শহীদ তাজুল বাইক সার্ভিস: শুধুমাত্র ছাত্রলীগই নয়, জাবি ক্যাম্পাসে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের উদ্যেগেও ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে আসা শিক্ষার্থীদের সেবায় এই রকম বাইক সার্ভিস করা হয়েছে। ১৮ থেকে ২২ জুন পর্যন্ত পাঁচদিনব্যাপী তারাও অসংখ্য ভর্তিচ্ছুকে দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছে দিয়েছে। রোদ,ঝড়-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে তারা নবীনদের সহায়তায় এগিয়ে এসেছে। বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের জন্য ছাত্র ইউনিয়নের নেতা-কর্মীদের এই বাইক সেবা ছিল উল্লেখ্য করার মতো। ছাত্র ইউনিয়নের নারী বাইকাররা ছিলেন আস্থা আর নির্ভরতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

জাবি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান লিটন জানান, বিশাল ক্যাম্পাসে নতুন যারা আসেন, তারা তাদের নিজ গন্তব্য বা পরীক্ষার কেন্দ্র খুঁজে পেতে সমস্যায় পড়েন। ঝড়-বৃষ্টি থাকলে এই সমস্য আরো প্রকট হয়। তাই নতুনদের কষ্ট লাগবে এবং সহায়তা করতে আমরা দীর্ঘদিন যাবত এই সেবা দিয়ে আসছি।
ছাত্রলীগ জাবি শাখার নেতা সারোয়ার শাকিল জানান, ভর্তি পরীক্ষার প্রথমদিন থেকেই তিনি এই বাইক সেবা দিয়ে আসছেন। ছাত্রলীগ জাবি শাখার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের অনুপ্রেরণাতে তিনি এবং তার অন্যান্য বন্ধুরা বৃষ্টি মাথায় নিয়ে ভর্তি পরীক্ষার্থীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। এটি তার জন্য একটি খুবই আনন্দের কাজ বলে মনে হয়েছে।
অপরদিকে “শহীদ তাজুল বাইক সার্ভিস” হচ্ছে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সেবার নাম। তারাও ক্যাম্পাসের প্রবেশ মুখে তাঁবু খাটিয়ে ভর্তিচ্ছুদের একই সেবা প্রদান করে আসছে। শিক্ষার্থীদের সাথে আগত অভিভবকরা অনেকে তাদের তাঁবুতে বিশ্রাম নেন, অপেক্ষার সময় পার করেন।
ছাত্র ইউনিয়ন জাবি শাখার সাংগঠনিক আলিফ মাহমুদ জানান, ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে এসে অনেক শিক্ষার্থীকে নানান অসুবিধার সম্মুখিন হতে হয়। অনেকে সঠিক পরীক্ষা কেন্দ্রও চিনতে পারেন না। তাই এসব দিক বিবেচনা করে তারা কয়েক বছর যাবত বাইকে পৌঁছে দেয়াসহ বিভিন্ন সেবা দিয়ে আসছেন।
নাবিলা খায়ের, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নতুন আসা পরীক্ষার্থীদের কাছে একজন ভীষণ জনপ্রিয় মুখ। এই তরুণী একটা লাল রংএর স্কুটারে চেপে অনেকদিন ধরে সার্ভিস দিচ্ছেন। জাবিতে ভর্তি পরীক্ষা দিতে আসা নারী শিক্ষার্থীদের খুব দ্রুততার সাথে তাদের সঠিক গন্তব্যে পৌঁছে দেন তিনি। সবসময় তার হাসিমুখ নতুনদের খুব প্রেরণা দেয়।
ইচ্ছা: জাবি ক্যাম্পাসে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে আসা শিক্ষার্থীদের কাছে আরেকটি প্রিয় নাম ইচ্ছা। পুরো নাম ইন্সপায়ার কেয়ার এন্ড কাল্টিভেট হিউম্যান এইড (আ.সি.সি.এইচ.এ.) বা সংক্ষেপে ইচ্ছা। এটি ক্যাম্পাসে একটি অরাজনৈতিক সংগঠন। তারাও এই ক্যাম্পাসে আসা ভর্তিচ্ছুদের অনেকদিন ধরে বাইক সার্ভিস, মোবাইল ফোন এবং দামী জিনিসপত্র জমা রাখাসহ নানা সেবা প্রদান করে আসছে।
ইচ্ছার সভাপতি মেহেদী হাসান জানান, ক্যাম্পাসের আয়তন বিশাল হবার কারণে অনেকে প্রথম এসে নানা অসুবিধার সম্মুখিন হয়। তাছাড়া পরীক্ষার্থীরা তাদের সাথে আনা টাকা, মোবাইল সেট কোথায় রাখবেন সেটা নিয়ে চিন্তিত থাকেন। সেই সবকিছু মাথায় রেখেই আমরা (ইচ্ছা) তাদের পাশে দাঁড়ানোর প্রয়াস নিয়েছি। আগামীতেও তাদের এই প্রয়াস অব্যাহত থাকবে বলে তিনি জানান।
এমএইচএফ