জন্মনিবন্ধন বানিয়ে কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে ইউপি চেয়ারম্যান ও সচিব

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের সলিমপুর ইউনিয়নের লতিফপুর গ্রামের কামাল উদ্দীনের ছেলে মাহতাব উদ্দীন। সম্প্রতি তিনি নিজের জন্মনিবন্ধন সনদ বানাতে ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে জানতে পারেন তার সনদ আগেই হয়ে গেছে। পরে তিনি তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে জানতে পারেন, তার নামে নিবন্ধিত জন্ম সনদ ব্যবহার করছেন এক সৌদি প্রবাসী, বর্তমানে তিনি সেখানেই অবস্থান করছেন।

অভিযোগ উঠেছে, শুধু মাহতাব নয়, সীতাকুণ্ডের সলিমপুরের অনেকেই জন্মনিবন্ধন সনদ করতে গিয়ে ফিরে আসতে হয়েছে সনদ না পেয়ে।

আরও অভিযোগ উঠেছে, জালিয়াতির মাধ্যমে ১৬৭টি জন্মনিবন্ধন সনদ বানিয়ে কোটি টাকা হাতিয়েছেন সলিমপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সালাউদ্দিন আজিজের বিরুদ্ধে। তাছাড়া, আরও বেশ কয়েকজন ইউপি সদস্যের নামও উঠে এসেছে তালিকায়।

স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, সীতাকুণ্ডের সলিমপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, ইউপি সদস্য ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে টাকার বিনিময়ে জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মনিবন্ধন, চেয়ারম্যান সনদ, ওয়ারিশ সনদ, মৃত্যু সনদসহ নাগরিক সুবিধা দিতে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ দীর্ঘ দিনের।

গত ২১ মে স্থানীয় সরকার বিভাগের ইউপি-১ শাখা এ সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। এ বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব জেসমিন প্রধান স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, সলিমপুর ইউনিয়নে কোনো ধরনের ইউজার আইডি হ্যাকিংয়ের ঘটনা ঘটেনি। হ্যাকিংয়ের দোহাই দিয়ে চেয়ারম্যান সালাউদ্দিন আজিজ ও সচিব আল আমিন এসব জন্মনিবন্ধন সনদ বানিয়ে নিয়েছেন। পরে হ্যাকিংয়ের দোহাই দিয়ে বানানো জন্মনিবন্ধন সনদগুলো বাতিলের আবেদনও করেছেন তারা। যা দুরভিসন্ধিমূলক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এভাবে সলিমপুর ইউনিয়ন পরিষদের ভেতরের লোকেরা এসব অপকর্মে জড়িত। যা সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালার অসদাচরণ ও জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন আইন ২০০৪ এর ২১(৩) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

তাছাড়া চেয়ারম্যান ও ইউপি সচিবের কাজ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের আওতায় একটা অপরাধ। তাদের এমন কর্মকাণ্ড বিডিআরআইএস’কে ক্ষতিগ্রস্ত করে, জনসম্মুখে তথা দেশে বিভিন্ন মিডিয়াতে জনমনে নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি করে।

এদিকে গত ১১ জুন চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে সলিমপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সালাউদ্দিন আজিজ ও সচিব আল আমিনকে কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠানো হয়েছে। নোটিশে অভিযুক্ত দুজনের বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নেয়া হবে না তা ১০ কার্যদিবসের মধ্যে জানতে চাওয়া হয়েছে।

প্রসঙ্গত, ৩ মাস আগে ইউনিয়ন পরিষদের জন্মনিবন্ধনের আইডি হ্যাক করে ১৬৭টি জন্মনিবন্ধন বানিয়ে নেওয়া হয়েছে দাবি করে সীতাকুণ্ড থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন চেয়ারম্যান সালাউদ্দিন আজিজ। এসব নিবন্ধন বাতিল চেয়ে তিনি জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন রেজিস্ট্রার জেনারেলের কাছে চিঠি লিখেছেন। ওই চিঠিতে চেয়ারম্যান সালাউদ্দিন আজিজ ১৬৭টি জন্মনিবন্ধন বাতিলের অনুরোধ করেন এবং দাবি করেন গত ১৫ জানুয়ারি থেকে ২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২ দেশের নানা প্রান্ত থেকে ইউজার আইডি হ্যাক করে নিবন্ধনগুলো বানানো হয়েছে।

সলিমপুর ইউনিয়ন পরিষদ সূত্রে জানা যায়, উপরে উল্লেখিত সময়ের মধ্যে সেখানে ৩৭১টি জন্মনিবন্ধন সম্পন্ন হয়েছে। এসব নিবন্ধনের সিরিয়াল ১২৫১৪১ থেকে ১২৫৫১২। তার মধ্যে ২০৪টি নিবন্ধন করার ক্ষেত্র নিয়মনীতি অনুসরণ করা হয়েছে। বাকি ১৬৭টি করার ক্ষেত্রে নিয়ম মানা হয়নি। যেসব ব্যক্তির নামে নিবন্ধন হয়েছে তারা কেউ সলিমপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা নন।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে সলিমপুর ইউনিয়ন পরিষদের সচিব আল আমিন দেশ বর্তমানকে বলেন, আমার স্ত্রী অসুস্থ থাকায় আমি ঠিকমতো অফিস করতে পারিনি। পরে চেয়ারম্যান, মেম্বার ও স্থানীয়দের অনুরোধে আইডি পাসওয়ার্ড পরিষদের উদ্যোক্তা সিফাতকে দিয়েছিলাম। কেন দিয়েছেন, দেয়া উচিত হয়েছে কিনা? জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি চেয়ারম্যানের চাপে পড়ে বাধ্য হয়ে দিয়েছি। দিতে চাইনি।

সলিমপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সালাউদ্দিন আজিজ দেশ বর্তমানকে বলেন, যা ঘটেছে তা সত্যি। আমার ও পরিষদের সিদ্ধান্তেই উদ্যোক্তাকে আইডি পাসওয়ার্ড দেওয়া হয়েছে।

সব ইউনিয়নে আইডি পাসওয়ার্ড উদ্যোক্তার কাছে থাকে দাবি করে তিনি আরও বলেন, যা করেছি তা সঠিক করেছি। কোনো ভুল করিনি। এখন আইনে যা হওয়ার হবে। কোনো অন্যায় করিনি। কারো কাছ থেকে ঘুষও নেইনি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) ও স্থানীয় সরকারের উপ-পরিচালক রাকিব হাসান প্রতিবেদকে বলেন, বিষয়টি তদন্তাধীন। বিষয়টি আমরা মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছি। মন্ত্রণালয় নোটিশ দিয়েছে। আমরা তাদেরকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছি।

সীতাকুণ্ড উপজেলা পরিষদের নিবার্হী কর্মকর্তা সাহাদাত হোসেন প্রতিবেদকে বলেন, বিষয়টি তদন্তধীন রয়েছে, দেখা যাক তদন্তে কি বেড়িয়ে আসে।

উল্লেখ্য যে, অভিযুক্ত সলিমপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান সালাউদ্দিন আজিজ সাবেক এমপি এবিএম আবুল কাসেম মাস্টারের ভাইঝি জামায় ও বর্তমান উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এসএম মামুনের চাচাত বোনের জামাই হওয়ার সরকারি দলের ক্ষমতা দেখিয়ে এসব অপকর্মে জড়িত আছে।