পরিবেশদূষণের জন্য দায়ী শিল্প-কারখানা

প্রায় ৫০০ কোটি বছরের পুরাতন এ পৃথিবীতে প্রথম প্রাণের আবির্ভাব হয় প্রায় সাড়ে তিনশত কোটি বছর আগে। পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্বের কারণ হচ্ছে এখানে আছে প্রচুর বায়ু আর পানি। এই পৃথিবীর উদার আকাশ, নির্মল বাতাস, সবুজ গাছপালা, উর্বর মাটি এবং সুর্যের আলো থেকে প্রতিদিন মানুষ পাচ্ছে জীবনধারণের উপাদান। আর এই উপাদানসমূহের ক্রমাগত দূষণের কারণে জীবনোপযোগী পৃথিবী ও মানুষসহ জীবচক্র এখন বিপদগ্রস্ত। আর এই দূষণের জন্য দায়ী মানুষ নিজেই। পরিবেশদুষণের জন্য দায়ী মানবসৃষ্ট উৎসসমূহ হলো- কেমিক্যাল প্লান্ট, তৈল-শৌধনাগার, পরমাণু-বর্জ্য, দৈনন্দিন জঞ্জাল-আবর্জনার স্তূপ, পিভিসি কারখানা, দহন-চুল্লি, গাড়ির কারখানা, প্লাস্টিক-কারখানা, পশুপালনের বড় খামার, চামড়া-প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প,- এককথায় শিল্প-কারখানা, যেখান থেকে প্রচুর পরিমাণ ক্ষতিকর বর্জ্য নির্গত হয়।

পরিবেশদূষণের সবচেয়ে বড় কারণ শিল্প-কলকারখানা। প্রতিটি শিল্প-কলকারখানা বিভিন্নভাবে দূষিত করছে মাটি, পানি, বায়ু, নদীসহ ভূগর্ভস্থ পানিও। বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) গবেষণার তথ্যমতে, মোট বায়ুদূষণের ৫০ শতাংশেরও বেশি, নদীদূষণের প্রায় ৬০ শতাংশ এবং শব্দদূষণের প্রায় ৩০ শতাংশ শিল্প-কারখানা থেকে সৃষ্ট। পরিবেশ দূষণে চামড়া-শিল্প অন্যতম। চামড়া-প্রক্রিয়াকরণের কয়েকটি ধাপে বিভিন্ন ধরনের তরল ও কঠিন বর্জ্য পরিবেশের বিভিন্ন উপাদানকে দূষিত করে। এক্ষেত্রে সিক্তকরণ প্রক্রিয়ায় নির্গত তরল বর্জ্যে প্রচুর পরিমাণে সোডিয়াম ক্লোরাইড, দ্রবীভূত প্রোটিন, জৈব-পদার্থ, ধুলাবালি, ময়লা ও গোবর মিশ্রিত থাকে। এগুলো দুর্গন্ধ সৃষ্টি করে, ফলে বায়ুদূষণ ঘটে। তাছাড়া বর্জ্যে বিদ্যমান সোডিয়াম ক্লোরাইড ও রাসায়নিক দ্রব্য মাটি ও পানির দূষণ ঘটায়। আবার ডিলাইমিং ও ট্যানিং প্রক্রিয়া থেকে অ্যামোনিয়াম ও ক্রোমিয়াম মিশ্রিত তরল বর্জ্য পানিতে ও মাটিতে মিশে যায়। যা ভূ-গর্ভস্থ পানিতে মিশে এর মানমাত্রা পরিবর্তন করে।

টেক্সটাইল ও ডায়িং শিল্প পরিবেশ দূষণকারী একটি শিল্প। বাংলাদেশের শিল্প-কলকারখানা থেকে নির্গত দূষিত পানির শতকরা ১৭-২০ ভাগই আসে টেক্সটাইল ও ডায়িং শিল্প হতে। বুয়েটের ‘ইভ্যালুয়েশন অব প্রেজেন্ট অ্যান্ড ফিউচার ওয়েস্ট ওয়াটার ইম্প্যাক্টস অব টেক্সটাইল ডায়িং ইন্ডাস্ট্রিজ ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণামতে, পোশাক-শিল্প থেকে দেশে বার্ষিক বর্জ্য পানির উৎপাদনের পরিমাণ ২০১৬ সালে ২১ কোটি ৭০ লাখ ঘনমিটার এবং ২০১৭ সালে ২৩ কোটি ৮০ লাখ ঘনমিটার এবং ২০২১ সালে তার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৩৪ কোটি ঘনমিটার। এই বিপুল পরিমাণ বর্জ্যের একটি বড় অংশ অপরিশোধিত অবস্থায় নদীসহ সব ধরনের জলাধারে মিশে নষ্ট করছে জলজ পরিবেশ, বিপন্ন হচ্ছে জলজ প্রাণ।

এসব শিল্প-কলকারখানার রাসায়নিকদূষণ পৃথিবীর বাস্তুতন্ত্রের সুক্ষ্ম ভারসাম্যকে প্রভাবিত করছে। খনি, কৃষি এবং বর্জ্য মাটির দূষণ ঘটাচ্ছে। ক্যাডমিয়াম, পারদ এবং সীসার মতো ভারী ধাতুর উপস্থিতি মাটির গুণমানকে প্রভাবিত করছে এবং মাটির উবর্রতাকে সহায়তাকারী অণুজীবের সংখ্যা হ্রাস করছে। যার দরুণ মাটির জীববৈচিত্র্য এবং খাদ্য উৎপাদনের ক্ষমতা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে। প্লাস্টিক-বর্জ্যরে রাসায়নিকদূষণের কারণে বিপর্যস্ত সাগর-মহাসাগর। প্লাস্টিক-বর্জ্যে আচ্ছন্ন সাগরের বিস্তৃত অঞ্চল ইতোমধ্যে ‘মৃত অঞ্চল’-এ পরিণত হয়েছে, যেখানে পানির অক্সিজেনস্তর জীবনকে সুরক্ষায় যথেষ্ট নয়। ক্ষতিকারক রাসায়নিকের উচ্চমাত্রায় সামুদ্রিক-জীববৈচিত্র্যকে বিপদাপন্ন করছে।

সিমেন্ট-শিল্প থেকে পরিবেশদূষণ মূলত বায়ুকেন্দ্রিক কিন্তু পানিদূষণেও এর ভূমিকা কম নয়। সিমেন্ট তৈরিতে ক্যালসিয়াম কার্বনেটকে তাপ দিয়ে ক্যালসিয়াম অক্সাইডে পরিণত করা হয়। এতে প্রচুর কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হয়। ২০১৭ সালের কুয়েটের এক গবেষণামতে, প্রতি টন সিমেন্ট উৎপাদনে প্রায় ৫১ গ্রাম ধুলা তৈরি হয় এবং একটি সিমেন্ট-কারখানা থেকে এক বছরে প্রায় ৫০ দশমিক ২ টন ধুলা বাতাসে ছড়ায়। যার প্রভাবে কারখানায় কর্মরত শ্রমিক ও আশেপাশের লোকজনের ফুসফুস আক্রান্ত হয় ও স্বাস্থ্যহানি ঘটে। পরিবেশ অধিদপ্তর গবেষণাগারের তথ্যমতে, ইস্পাত-শিল্পে দূষণের মাত্রা খুব বেশি। সাধারণত বাতাসে ভাসমান পিএম-১০ প্রতি ঘনমিটারে ২০০ মাইক্রোগ্রাম থাকার কথা থাকলেও ইস্পাত-কারখানা সংশ্লিষ্ট এলাকায় ৪০০ থেকে সর্বোচ্চ ৯০০ মাইক্রোগ্রাম পর্যন্ত পাওয়া যাচ্ছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, ইস্পাত ও সিমেন্ট কারখানাগুলো সবচেয়ে বেশি পরিবেশদূষণ করছে।

দেশে ৭ হাজারের বেশি ইটভাটা রয়েছে। বছরে প্রায় ২৩ বিলিয়নের বেশি ইট বাংলাদেশে উৎপাদিত হচ্ছে। জিডিপিতে ইটশিল্প প্রায় ১ শতাংশ অবদান রাখছে। বছরে প্রায় ২০৫ বিলিয়ন টাকার ইট উৎপাদিত হয়। ১০ লাখেরও বেশি মানুষ দেশের ইটভাটায় কর্মরত। বছরে প্রায় ৫ দশমিক ৬৮ মিলিয়ন টন কয়লা ইটখোলাগুলোয় জ্বালানি হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ইট তৈরির কাঁচামাল হিসাবে ব্যবহৃত হয় মাটি। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বছরে প্রায় ৩৩ হাজার ৫০ মিলিয়ন কিউবিক ফুট মাটি ইট তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। গবেষণামতে, বছরে প্রায় ১৫ দশমিক ৬৭ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই-অক্সাইড ইটখোলা থেকে বায়ুমণ্ডলে যোগ হচ্ছে।

কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রসমূহও দূষণের সৃষ্টি করছে। মাতারবাড়ীতে নির্মিতব্য কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দূষণ পরিস্থিতি নিয়ে সিআরইএর সমীক্ষা অনুসারে, প্ল্যান্টগুলো বছরে ১ হাজার ৬০০ কেজি পারদ এবং ৬ হাজার টন ছাঁই উৎপন্ন করবে।

সমীক্ষা প্রতিবেদনমতে, ১ বছরে হেক্টর প্রতি ১২৫ মিলিগ্রামের কম পারদ মাছের জন্য অনিরাপদ পরিবেশ তৈরি করবে। সমীক্ষায় অনুমান করা হয়েছে, এই পারদ ৩ হাজার ৩০০ বর্গমাইল এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে পড়বে, যা দক্ষিণে বান্দরবান এবং উত্তরে চট্টগ্রামের কিছু অঞ্চলকে দূষিত করবে। নির্গত হওয়া ছাঁই এবং সালফার ডাই-অক্সাইড শিশুদের মধ্যে স্ট্রোক, হৃদরোগ, ফুসফুসের ক্যান্সার এবং শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলবে।

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার প্রকাশিত তথ্যমতে, বছরে প্রায় ৪ দশমিক ২ মিলিয়ন মানুষ বায়ুদূষণের প্রভাবে মারা যায়। এর প্রায় ৫৯ শতাংশই মারা যায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোয়। বায়ুতে বিষাক্ত উপাদানের উপস্থিতির কারণে প্রায় ২২০ মিলিয়ন শিশু শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত নানাবিধ অনাকাঙ্খিত রোগের প্রাদুর্ভাবের সম্মুখীন হচ্ছে। কাজেই পরিবেশ দূষণের এই ভয়াবহতা থেকে উত্তরণে এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন ব্যাপক বনায়ন কর্মসূচি প্রণয়ন; জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ; শিল্পবর্জ্য পরিশোধন ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ; প্লাস্টিকের ব্যবহার পুরোপুরি নিষিদ্ধকরণ; উন্নত শিল্প-প্রযুক্তির ব্যবহার করা, যার দ্বারা ক্ষতিকারক ধোঁয়া, রাসায়নিক, গ্যাস এবং বায়ু পরিষ্কার করা হয়। সর্বোপরি পরিবেশবান্ধব শিল্প-কারখানা গড়ে তোলা।

লেখক : কলাম লেখক এবং প্রাবন্ধিক