কোন পথে দেশের রাজনীতি

আগামী নির্বাচন নিয়ে বড় দুই দলই বিদেশ নির্ভর হয়ে পড়েছে। বিদেশিদের খুশি করে নিজেদের অবস্থানকে শক্ত করতে মরিয়া শীর্ষ নেতারা। মাঠের বিরোধীদল বিএনপি সরকার পতনের লক্ষ্যে কর্মসূচি নিয়ে সোচ্চার থাকলেও তারা বিদেশিদের মাধ্যমে সরকারকে চাপে রাখতে চায়। কিন্তু সরকারি দলও নানা কৌশলে উন্নয়ন সহযোগীদের বুঝিয়ে নির্বাচনকালীন সরকারের অধীনে নির্বাচন করাতে চায়। দুই দলেই দেশের জনগনের চেয়ে বিদেশিদের প্রতি নির্ভর হতে চাচ্ছে। বড় দুই দলের নেতারা কথায় কথায় বিদেশিদের টেনে আনছেন। কেউ আমেরিকার দিকে গেলে অন্যরা রাশিয়া চীনের দিকে ঝুঁকছে। কার চেয়ে কে বড় মুরুব্বি তার দিকে ধাবিত হচ্ছেন নেতারা।

গতকাল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের রাজধানীতে দলীয় শান্তি সমাবেশে বলেছেন, এখন বিদেশি শক্তিকে দিয়ে আবারও ওয়ান ইলেভেনের মতো দুই বছরের জন্য নিজেদের ইচ্ছামতো তত্ত্বাবধায়ক বসাবে। আর আমরা কি ললিপপ খাবো? সবই জানি, কোথায় কোথায় ষড়যন্ত্র হচ্ছে। ওয়ান ইলেভেনের তত্ত্বাবধায়কের দুঃস্বপ্ন দেখে লাভ নেই। এটা দিবাস্বপ্ন। আমরাও প্রস্তুত আছি। তিনি বলেন, বিএনপি আইন অমান্যকারী দল। তারা আইন মানে না, বিচার মানে না, নিরপেক্ষ সালিশ মানে না। তারা কেন কথায় কথায় বলে আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক বাদ দিয়েছে? বাদ তো দিয়েছে উচ্চ আদালত।

তিনি আরও বলেন, নির্বাচন হবে সংবিধান অনুযায়ী। নির্বাচনে যারা বাধা দেয় যুক্তরাষ্ট্রের ভিসানীতি তাদের বাধা দেয় কিনা আমরা সেটা দেখতে চাই। আবার তারা আগুন নিয়ে আসবে, ভাঙচুর করবে, রেললাইন উপড়ে ফেলবে, ভূমি অফিসে আগুন দেবে- সেই তত্ত্বাবধায়ক আমরা চাই না। বাংলাদেশের মানুষ শান্তি চায়, স্বস্তি চায়।

ওবাদুল কাদেরের বক্তব্যের পাল্টা জবাবে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, এখনো সময় আছে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের ব্যবস্থা করুন। তা না হলে যতই চেষ্টা করুন পালাবার পথ খুঁজে পাবেন না। পালাবার পথ আমেরিকা বন্ধ করে দিয়েছে। তিনি গতকাল বিদ্যু অফিসে স্মারক লিপি দিতে যাবার আগে সমাবেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে আওয়ামী লীগকে উদ্দেশ্য করে এ কথা বলেন।

এদিকে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের ছয় সদস্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান জোসেপ বোরেলকে বাংলাদেশের বিষয়ে একটি চিঠি দিয়েছেন। চিঠিতে তারা জোসেপ বোরেলকে বলেছেন বাংলাদেশে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ সাধারণ নির্বাচন নিশ্চিত করতে অবদান রাখতে অনুরোধ করছি এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অবসান ঘটাতে হবে। বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলসহ (বিএনপি) অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সম্পৃক্ত করে চলমান সংকটের টেকসই ও গণতান্ত্রিক সমাধান খুঁজে বের করতে আহ্বান জানাচ্ছি।
জানতে চাইলে ইইউ ঢাকা অফিসের একজন মুখপাত্র গণমাধ্যমেকে বলেন, ইউরোপীয় পার্লামেন্টের ছয়জন সদস্য ব্যক্তিগতভাবে তাদের মতামত ব্যক্ত করেছেন। অন্যদিকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, যার কাছে এ চিঠি পাঠানো হয়েছে, তিনি আমাদের এ ব্যাপারে কিছু জানাননি। ফলে বিষয়টি নিয়ে কীভাবে মন্তব্য করব?

১২ জুন এই পত্র প্রেরণকারী ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের ছয় সদস্য হলেন স্লোাভাক প্রজাতন্ত্রের ইভান স্টেফানেক, চেক প্রজাতন্ত্রের মাইকেলা সোজড্রোভা, বুলগেরিয়ার আন্দ্রে কোভাতচেভ, ডেনমার্কের কারেন মেলচিওর, স্পেনের জাভিয়ের নার্ট এবং ফিনল্যান্ডের হেইডি হাউটালা।

চিঠিতে তারা বলেন, আমরা সেখানে আসন্ন ১২তম সাধারণ নির্বাচনের ওপর ফোকাস করার গুরুত্বের ওপর জোর দিতে চাই, যা ২০২৩ সালের শেষের দিকে বা ২০২৪ সালের শুরুতে হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, জনগণের তাদের প্রতিনিধি নির্বাচনের অধিকার এখনো বাকি। কারণ দেশে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের কোনো ব্যবস্থা নেই। এটা একটা সমস্যা যেহেতু কারচুপি, কারসাজি এবং ভোটারদের অনুপস্থিতি ১০ ও ১১তম সংসদ নির্বাচনকে বিঘ্নিত করেছে।

যদিও দশম সাধারণ নির্বাচন প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণমূলক ছিল না এবং ১১তম সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নির্বাচন বর্জন করেছে। ফলস্বরূপ সরকারের বাংলাদেশের জনগণের কাছ থেকে কোনো বা সামান্য ম্যান্ডেট ছিল না এবং তা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অনুমোদন অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে।

সুতরাং ইইউকে শুধু বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মানবাধিকার বিষয়ে অবিরাম সংলাপে বসে থাকলেই হবে না। বাস্তব ফলে কাজ করতে হবে। সম্ভাব্য ব্যবস্থা যেমন মানবাধিকারের জন্য দায়ী এবং জড়িতদের ইইএ জোনে প্রবেশের সীমাবদ্ধতা অথবা জিএসপি+ প্রণোদনার শর্তের নিয়মিত স্মরণ করিয়ে দেওয়া যেতে পারে।

চিঠিতে তারা বাংলাদেশে মানবাধিকারের লঙ্ঘনের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা বলেছেন, এই চিঠির মাধ্যমে আমরা বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘন সম্পর্কে আমাদের উদ্বেগ প্রকাশ করতে চাই এবং আসন্ন নির্বাচন সামনে রেখে সেখানে গণতন্ত্র ও আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার আহ্বান জানাই।

ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন পার্লামেন্টের ৬ সদস্যের চিঠির প্রসঙ্গে গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ সচিবালয়ে নিজ দপ্তরের সাংবাদিকদের ব্রিফিং এ বলেছেন, ইইউ পার্লামেন্টের সাতশত সদস্যের মধ্যে মাত্র ছয়জন সদস্য বাংলাদেশ সর্ম্পকে যে অভিযোগ করেছে তা আমলে নেয়ার কিছু নেই। এগুলো কারা করাচ্ছে আমরা জানি । বাংলাদেশের জনগন নির্ধারণ করবে নির্বাচন কি ভাবে হবে।

সম্প্রতি আওয়মী লীগের বর্ষীয়ান নেতা আমির হোসেন আমু দলীয় এক সমাবেশ জাতিসংঘের প্রতিনিধির উপস্থিতিতে বিএনপির সথে সংলাপের প্রস্তাব করলে তা নিয়ে রাজনীতিতে ব্যাপক আলোচনা হয়। কিন্তু পরদিনই দলের অন্য নেতারা তা আমুর ব্যাক্তিগত বলে উল্øেখ করে তাকে থামিয়ে দেয়। নেতৃবৃন্দ বলেছেন, বিদেশিদের নিয়ে সংলাপ করার মতো তেমন কোন পরিস্থিতি এখনো সৃষ্টি হয়নি। আর বিএনপির সাথে সংলাপেরও সময় হয়নি।

রাজনৈতিক অভিজ্ঞদের মতে, আগামী নির্বাচন নিয়ে বড় দুই দলের মধ্যে একটা সংলাপ দরকার। সংলাপ ছাড়া কোন সমাধান নেই। তবে কেউ কেউ সংলাপের প্রত্যাশাকে নির্বাচনের আগ পর্যন্ত বাঁচিয়ে রেখে সুষ্ঠু নির্বাচনের দিকে দেশকে এগিয়ে নেয়ার জন্য দেশের সুনাগরিকদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার কথাও জানিয়েছেন।

দেশ বর্তমান/এআই