ফিরে দেখা ঐতিহাসিক ৭ জুন ও এর তাৎপর্য

আজ ঐতিহাসিক ৭ জুন। বাংলাদেশ ও বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসে প্রথম সংগ্রামী প্রতিবাদ দিবস হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। ১৯৬৬ সালের এই দিনে বাঙালি স্বাধিকার ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ সব রাজবন্দীর মুক্তির দাবিতে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সর্বব্যাপী হরতাল পালন করেছিল। পুলিশ ও ইপিআরের গুলিতে প্রাণ দেন তেজগাঁওয়ের মনু মিয়া, আবুল হোসেন ও আদমজীর মুজিবুল্লাহসহ ১১ জন শ্রমিক। প্রায় ৮০০ রাজনৈতিক কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়।

১৯৬৬ সালের ৭ই জুন সকাল ১১টার দিকে তেজগাঁও শিল্প এলাকার শ্রমিক কর্মচারীরা মিছিল নিয়ে রাজপথে বের হয়। তারা তেজগাঁও রেলস্টেশনের আউটার সিগনালের কাছে অবস্থান নিয়ে রেললাইন অবরোধ করে। পুলিশরা তাদেরকে দমানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হলে একপর্যায়ে প্রতিবাদকারী শ্রমিক-জনতার ওপর গুলি চালায়। এ সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন ৩০ বছর বয়সী শ্রমিক মনু মিয়া। ছয় দফা আন্দোলনের প্রথম শহীদ ছিলেন তিনি। মনু মিয়ার লাশ নিয়ে ছাত্র-জনতা ও শ্রমিকরা বিশাল বিক্ষোভ মিছিল করে। বিক্ষোভে ফেটে পড়ে সারা দেশ। এভাবে সাধারণ জনতার মধ্যে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ক্ষোভ আরো বহুগুণ বেড়ে যায়। ফলশ্রæতিতে বাঙালির স্বাধিকার চেতনা প্রবল হয় এবং স্বাধীনতা আন্দোলনের মতো একটি আন্দোলনের প্রয়োজন অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে। (উইকিপিডিয়া)

১৯৬৬ সালের ৭ জুন তারিখের পিছনে যে ইতিহাস জড়িত ছিল সেটা হলো ৬ দফা দাবীর ভিত্তিতে গ্রেফতারকৃত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির দাবীতে গড়ে উঠা আন্দোলনের চূড়ান্ত রূপ। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হবার পর থেকেই বাঙালিদের প্রতি পাকিস্তানীদের অনীহা এবং এ অঞ্চলের উন্নয়নের প্রতি নানান ধরণের বৈষম্য পরিলক্ষিত হয়। দিনে দিনে বৈষম্য বাড়তেই থাকে। ফলে ১৯৬৬ সালের ৫-৬ ফেব্রæয়ারি তারিখে লাহোরে অনুষ্ঠিত বিরোধী দল সমূহের নেতৃবৃন্দের এক কনভেনশনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক ৬ দফা কর্মসূচি উপস্থাপন করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৬ দফাকে আওয়ামী লীগ নেতা কর্মীদের মাধ্যমে পূর্ব বাংলায় প্রচার করার আহবান জানান। বাংলার জনগণ ছয় দফাকে গ্রহণ করে এবং এটাকে তাঁদের প্রাণের দাবী বা বাঁচার দাবী হিসেবে গ্রহণ করে। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে এই ৬ দফা ছিল আওয়ামী লীগের নির্বাচনী মেনিফেস্টো। কিন্তু ৬ দফাকে পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠী মেনে নিতে পারে নি। পক্ষান্তরে পূর্ব বাংলায় ৬ দফার জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। উপায়ন্তর না দেখে পাকিস্তানী স্বৈরশাসক আইয়ুব খান রাজনৈতিকভাবে দমননীতির প্রয়োগ শুরু করেন এমন কি নেতা কর্মীদের কারাগারে প্রেরণের হুমকি দেখাতে শুরু করেন। কিন্তু ৬ দফার প্রবর্তক আওয়ামী লীগ প্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রকাশ্যে জনসভায় আইয়ুব খানের জবাব দেন। পত্র পত্রিকাতেও আইয়ুব খানের দমন নীতির কঠোর সমালোচনা করা হয়। দৈনিক ইত্তেফাকের রাজনৈতিক মঞ্চ কলামে ১৯৬৬ সালের ১৮ ফেব্রæয়ারি মোসাফির সমালোচনা মূলক লেখা লেখেন। ৬ দফাকে সাংগঠনিক রূপ দেয়া এবং এই দাবি বাস্তবায়নের জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একটি গণ আন্দোলনের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। যার ফলশ্রæতিতে তিনি আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে সারা দেশ জুড়ে ৬ দফার প্রচার শুরু করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৬ সালের ২০ শে মার্চ ঢাকার পল্টনের ময়দান থেকে ৬ দফার পক্ষে প্রচারণা মূলক জনসভা শুরু করেন। প্রচারণা শুরুর দিন দৈনিক ইত্তেফাক শিরোনাম করেছিল: “ অতৃপ্ত শ্রোতৃমÐলীর শুভেচ্ছা ও আশীর্বাদ-সিক্ত পরিবেশে ৬-দফার প্রবক্তাদের যাত্রা শুরু।” ঠিক একইভাবে ওই দিনের ইত্তেফাক পত্রিকাতেই বঙ্গবন্ধুর উদ্ধৃতি দিয়ে দৈনিক ইত্তেফাক লিখলো: চরম ত্যাগের প্রস্তুতির বাণী লইয়া দিকে দিকে ছড়াইয়া পড়ুন, প্রত্যন্ত প্রদেশের প্রতিটি মানুষকে জানাইয়া দিন- সর্বস্ব পণ করিয়াই আমরা আজ আন্দোলনের এ কন্টকাকীর্ণ পথে পা বাড়াইয়াছি।” ৬ দফার পক্ষে এই প্রচারণার যাত্রা চলে ১৯৬৬ সালের ৮ মে তারিখ পর্যন্ত। এই ৫০ দিনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৬ দফা নিয়ে প্রায় ৩২ টি জনসভায় ভাষণ দেন। এই সময় সীমার মধ্যে তিনি ৬ দফার পক্ষে যে অভাবনীয় জনমত সৃষ্টি করেন, তা সত্যিই এক অকল্পনীয় ব্যাপার। ৬ দফার জনপ্রিয়তায় শাসক আইয়ুব খান ভীত হয়ে পড়েন এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যাতে জনসভা করতে না পারেন এজন্য হয়রানি ও নির্যাতনের পথ বেছে নিলেন। দু:খের বিষয় ওই দিনই নারায়ণগঞ্জের জনসভা শেষে সেদিন রাতেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করা হয়। এই সময় আরো গ্রেফতার হলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জনাব তাজউদ্দিন আহমদ, খন্দকার মেশতাক আহমদ, চট্টগ্রামের এম এ আজিজ, জহুর আহমদ চৌধুরী প্রমুখ। পরে পাবনার জনাব মনসুর আলী, আবদুর রব বগা মিয়া, ময়মনসিংহের রফিকউদ্দিন ভূঁইয়া, রাজশাহীর জনাব মুজিবুর রহমান গ্রেফতার হন। ( মুস্তাফা সরওয়ার, স্মৃতিসত্তায় ৭ই জুন, বাংলার বাণী, ৭ জুন, ১৯৭৩)

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর সহকর্মীদের কারাগারে প্রেরণের ফলে আওয়ামী লীগ ১৯৬৬ সালের ৭ জুন তারিখে সারা প্রদেশে সর্বাত্মক হরতাল পালনের ডাক দেন। জনগণ তা স্বত:স্ফুর্তভাবে পালন করে। হরতালে নাগরিক জীবন অচল হয়ে পড়ে। হরতাল চলাকালে নাগরিক জীবন সম্পূর্ণভাবে স্তব্ধ হয়ে যায়। ধর্মঘটে পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালালে এগারো জন নিহত হয় এবং এ ছাড়াও প্রায় আটশত লোককে গ্রেফতার করা হয়। আন্দোলন সংগ্রাম এতোটাই প্রকট হয়েছিল তার প্রমান পাওয়া যায় সমসাময়িক পত্র পত্রিকায়। ১৯৬৬ সালের ৮ জুন তারিখের দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার ব্যানার নিউজ শিরোনামে লেখা হয়েছিল: ‘ঢাকা নারায়নগঞ্জ পুলিসের গুলিতে ১০ জন নিহত।’

আন্দোলনের তীব্রতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায় ১৯৬৬ সালের ৮ জুন তারিখের দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার বিবরণীতে । ‘ঢাকা নগরী ও নারায়ণগঞ্জে ১৪৪ ধারা’ শীর্ষক প্রতিবেদনে দৈনিক ইত্তেফাক লিখেছিল: “ গতকাল (মঙ্গলবার) পূর্বাহ্ন ১১ টার সময় হইতে ঢাকার কোতোয়ালী, সূত্রাপুর, মালিবাগ, রমনা ও তেজগাাঁ থানার সকল এলাকা এবং নারায়ণগঞ্জ থানার সকল এলাকায় অনির্দিষ্টকালের জন্য ১৪৪ধারা জারি করিয়া পাঁচ বা ততোধিক লোকের একত্রে সমাবেশ, কোন শোভাযাত্রা, সভা অনুষ্ঠান, অস্ত্রশস্ত্র, লাঠি, ফ্ল্যাগ পোষ্ট বা কোন বিস্ফোরক অথবা আপত্তিকর কোন অস্ত্র এবং পোস্টার ও প্ল্যাকার্ড বহন, মাইক, এ্যমপ্লিফায়ার বা লাউড স্পীকার ব্যবহার নিষিদ্ধ ঘোষণা করিয়া ঢাকার অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এক নির্দেশ জারি করিয়াছেন। এই আদেশ ৭ ই জুন বেলা ১১ টা হইতে বলবৎ করা হইয়াছে।”

সরকারি প্রেস নোটেও আন্দোলন সম্পর্কে জানা যায়। ১৯৬৬ সালের ৭ জুন তারিখের প্রেসনোট যা পরের দিন পত্রিকাতে প্রকাশিত হয়, যদিও সরকারি প্রেস নোটে দশ জনের নিহত হওয়ার কথা সরকার স্বীকার করে। কিন্তু সরকার ৭ই জুনের হরতালের প্রকৃত খবর যাতে জনগণ জানতে না পারে এজন্য শুধুমাত্র সরকারি প্রেস নোট ছাড়া অন্য কোন খবর প্রকাশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। কিন্তু ১৯৬৬ সালের ৮ জুন তারিখের দৈনিক পত্রিকাতে সরকারি প্রেসনোটের যে হুবহু অনুলিপি পাওয়া যায় তাতেও ৭ই জুনের হরতালে জনগণের স্বত:স্ফুর্ততা লক্ষ্য করা যায়। সরকারি প্রেসনোটে বলা হয়: “ আওয়ামী লীগ কর্তৃক আহুত হরতাল ৭-৬-৬৬ তারিখে অতি প্রত্যুষ হইতে পথচারী ও যানবাহনে ব্যাপক বাধা সৃষ্টির মাধ্যমে সংগঠিত করা হয়। ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে বিভিন্ন এলাকায় ছোকরা ও গুন্ডাদের লেলাইয়া দেওয়া হয়। ইপিআরটিসি বাসগুলিতে ইট পাটকেল ছোঁড়া হয় এবং টায়ারের পাম্প ছাড়িয়া দিয়া সর্বপ্রকার যান বাহনে অচলাবস্থা সৃষ্টি করা হয়। নিরীহ জনসাধারণ ও অফিসযাত্রীদের অপমান ও হয়রান করা হয়। হাইকোর্টের সম্মুখে তিনটি গাড়ী পোড়াইয়া দেওয়া হয়। পুলিস কার্জন হল, বাহাদুর শাহ পার্ক ও কাওরান বাজারের নিকট গুন্ডাদের বাধা দান করে এবং টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করিয়া তাহাদিগকে ছত্রভঙ্গ করিয়া দেয়।ৃ উচ্ছ¡ঙ্খল জনতা থানা ভবনে প্রবেশ করার পর পুলিশ আত্মরক্ষার্থে গুলীবর্ষণ করার ফলে ছয় ব্যক্তি নিহত ও আরো ১৩ ব্যক্তি আহত হয়।.. সন্ধ্যার পর একটি উচ্ছৃঙ্খল জনতা কালেকরেক্ট ও পরে স্টেট ব্যাঙ্ক আক্রমণ করে। রক্ষিগণ জনতাকে ছত্রভঙ্গ করার জন্য গুলি বর্ষণ করে। বেলা ১১টায় ৫ বা ততোধিক ব্যক্তির একত্র সমাবেশ ও শোভাযাত্রা নিষিদ্ধ করিয়া ১৪৪ ধারা জারি করা হয়।” সরকারি প্রেসনোটের ভাষ্য অনুযায়ী হরতালে অংশগ্রহণকারী জনসাধারণকে গুন্ডা বলা হয়েছে এবং তাদেরও পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য পুলিশকে গুলি বর্ষণ করতে হয়েছে। কিন্তু নিরীহ জনগণের ওপর গুলীবর্ষণ করে হত্যাযজ্ঞ চালানো সত্তে¡ও সরকারের দমন নীতির এতটুকুও শিথিল হয়নি। ৭ই জুনের ধারাবাহিকতায় দৈনিক ইত্তেফাকের সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াকে গ্রেফতার করা হয় । শুধু তাই নয় তদানীন্তন সময়ে বাঙালির অধিকার আদায়ের কন্ঠস্বর দৈনিক ইত্তেফাক যাতে আর প্রকাশিত না হতে পারে এজন্য ১৯৬৬ সালের ১৬ জুন তারিখে দৈনিক ইত্তেফাকের প্রেস বাজেয়াপ্ত করা হয়।

১৯৬৬ সালের ৭ জুন এক রক্ত ঝরানো দিন। সেদিনের শহীদদের রক্তের পথ বেয়ে শুরু হয়েছিল বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন থেকে স্বাধীনতার আন্দোলন। বিক্ষুব্ধ ৭ই জুনের রক্ত ঝরানো পথই তৈরী করে দিয়েছিল ঐতিহাসিক আগরতলা মামলা, ছাত্রদের ১১ দফা আন্দোলন, ‘৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ‘৭০-এর সাধারণ নির্বাচন, ‘৭১-এর মার্চ মাসে অসহযোগ আন্দোলন, ‘৭১-এর ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু কর্তৃক বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা এবং ‘৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ। বাঙালিরা সেদিনিই বুঝতে পেরেছিল পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর হাত থেকে মাতৃভূমিকে মুক্ত করার জন্য মুক্তিযুদ্ধ ছাড়া পথ নেই। মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমেই বাঙালি অর্জন করে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের। ৬ দফার মহান সংগ্রামের আহবান একদিন বাংলার আকাশ বাতাস প্রকম্পিত করেছিল। ১৯৬৬ সালের ৭ জুন তার জ্বলন্ত উদাহরণ। শুধু দিবস পালনের মনোবৃত্তি নিয়ে নয়, ৭ জুন বিচার করতে হবে বাঙালি জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গী দিয়ে। কারণ এর মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতি উদ্বুদ্ধ হয়েছিল ঐক্যের টানে, যার শেষ কথা ছিল স্বাধীনতা। তাই বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এই রক্তঝরা ৭ জুনের গুরুত্ব অপরিসীম।

লেখক : অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

প্রাক্তন উপ-উপাচার্য, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়