তীব্র তাপদাহের মধ্যে লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণা

২০/২৫ দিনের মধ্যে অবস্থার উন্নতির সম্ভাবনা নেই

অসহনীয় গরম আর লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে দেশের মানুষ। তাপমাত্রা বাড়ার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে লোডশেডিং। ঢাকায় দিনে, রাতে কিংবা ভোরে বিদ্যুৎ যাচ্ছে নিয়মিত বিরতিতে। ঘড়ির কাঁটায় মেপে মেপে কোথাও আসছে এক ঘণ্টা কোথাওবা এরও বেশি সময় পর, গ্রামের অবস্থা আরও নাজুক। তাপদাহের মধ্যে ভ্যাপসা এ গরমে লোডশেডিংয়ের সেই সময়টুকু যেন এক যন্ত্রণা হয়ে ঘুরে ফিরে আসছে দিনে-রাতের বড় একটা সময়জুড়ে।

শুধু ঘরেই ভুগতে হচ্ছে তা নয়, অফিস আদালতসহ সব ধরনের প্রতিষ্ঠানের মতো বাদ যাচ্ছে না শিল্প-কারখানাও। এতে বিঘিœত হচ্ছে উৎপাদন, বাড়ছে ব্যয়। গরমের মধ্যে লোডশেডিংয়ের ভোগান্তি থেকে রেহাই পেতে অনেকেই চার্জার ফ্যান কিনছেন। জেনারেটর চালানোর জন্য ডিজেলের চাহিদাও বেড়ে গেছে। আগামী ২০/২৫ দিনের মধ্যে এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার কোনো লক্ষণ নেই বলে ইঙ্গিত দিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ।

বিদ্যুৎ, জ্বালানী ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গত ২৫ মে কয়লা সংকটে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন পায়রা বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির দুটি ইউনিটের একটি বন্ধ হয়ে যায়। জ্বালানির এই সংকটের কারণে ৫ জুনের পর পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র সাময়িক সময়ের জন্য পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাতে পারে। পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়লা আমদানি করতে আরও অন্তত ২০ থেকে ২৫ দিন সময় লাগবে। এই সময় পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের ধকল সইতে হবে দেশের মানুষকে।

জানা গেছে, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা এখন ২৩ হাজার ৩৭০ মেগাওয়াট। জ্বালানি সংকটে গড়ে সাড়ে ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কম হচ্ছে। ডলার সংকটে গ্যাস, কয়লা ও জ্বালানি তেল আমদানি বিঘিœত হওয়ায় চাহিদা অনুসারে বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রাখায় গড়ে দুই থেকে আড়াই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কম হয়। বাকি ১৭ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতার মধ্যে গড়ে উৎপাদন হয় সাড়ে ১৩ হাজার মেগাওয়াট। চাহিদা থাকে গড়ে সাড়ে ১৫ হাজার মেগাওয়াট। এর মধ্যেই বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ৭০০ মেগাওয়াটের ওপরে চলছে লোডশেডিং।

এ প্রসঙ্গে বিদ্যুৎ, জ্বালানী ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেছেন, কয়লা, গ্যাস ও তেল সংকটের কারণে দেশে বিদ্যুৎ সংকট দেখা দিয়েছে। তিনি বলেন, যত দ্রæত পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়লা নিয়ে আসা যায়, সেই চেষ্টা চলছে। আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে এই অবস্থা থেকে যেন বের হয়ে আসা যায়, সেই চেষ্টা করছি।

এই মুহূর্তে শিডিউল লোডশেডিং দেওয়া হবে না জানিয়ে তিনি বলেন, কিছু কিছু এলাকায় লোডশেডিং হচ্ছে, বেশ কিছুদিন তা বেড়ে গেছে। সারা দেশে আড়াই হাজার মেগাওয়াটের মতো লোডশেডিং হচ্ছে। ফুয়েলের যোগান দিতে সমস্যা হচ্ছে। পরিস্থিতি অসহনীয় হয়েছে, সরকার সেটা জানে। কিছু প্লান্ট অর্ধেক জ্বালানি দিয়ে চলছে।

সংকটের কারণ হিসেবে জ্বালানি ঘাটতির কথা তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র অর্ধেক ক্যাপাসিটিতে চলছে। বড় পুকুরিয়া বিদ্যুৎকেন্দ্রটি অর্ধেক ক্যাপাসিটিতে চলছে। লিকুইড ফুয়েল বা তরল জ্বালানির বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো প্রায় অর্ধেক ক্যাপাসিটিতে চলছে। এসব কারণে লোডশেডিংয়ের মাত্রা অনেক বেড়ে যাচ্ছে। গত ২ মাস ধরেই সমাধানের চেষ্টা হচ্ছে। আর্থিক কারণসহ নানা কারণে এখনও সমাধান করা যায়নি।

এলসি খুলতে দেরি হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, কয়লা আমদানি করতে আরও অন্তত ২০ থেকে ২৫ দিন সময় লাগবে। কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশে লোডশেডিং বেড়েছে। বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট লোডশেডিং চলছে। লোডশেডিংয়ের জন্য তিনি দুঃখপ্রকাশ করেন।

নসরুল হামিদ আরও বলেন, তেলের ব্যাপারেও আমরা হিমশিম খাচ্ছি। এখন ইন্ডাস্ট্রিতে ডাইভার্ট করছি বেশির ভাগ গ্যাস। আর গরম বেড়ে গেছে, ৩৮ ডিগ্রির ওপরে চলে গেছে, কোনও কোনও জায়গায় ৪০-৪১ ডিগ্রি। এতে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে গেছে। ফলে লোডশেডিং বেড়েছে। কিছু দিন এ পরিস্থিতি থাকবে।

রোববার (৪ জুন) গণভবনে এক অনুষ্ঠানে লোডশেডিং বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আমরা প্রত্যেক ঘরে ঘরে শতভাগ বিদ্যুত দিয়েছিলাম। কিন্তু আজ বিশ্বব্যাপী গ্যাস-তেল-কয়লা সব কিছুর দাম বেড়ে যাওয়াতে এখন বিদ্যুৎ উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে। টাকা দিয়েও কেনা যাচ্ছে না। এ রকমই অবস্থা দাঁড়িয়েছে। যার জন্য আমি জানি এই গরমের মানুষের একটু কষ্ট হচ্ছে। একদিকে মূল্যস্ফীতি আর অপরদিকে এখন বিদ্যুৎ নেই, এই দুটি কষ্ট আমার দেশের মানুষ পাচ্ছে।

এদিকে দেশজুড়ে তীব্র তাপদাহের কারণে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় দেশের সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় চার দিনের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। আগামী ৫ থেকে ৮ জুন দেশের সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণি কার্যক্রম বন্ধ থাকবে বলে গতকাল রোববার প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, দেশব্যাপী বিদ্যমান তীব্র তাপদাহের কারণে কোমলমতি ছাত্র-ছাত্রীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার কথা বিবেচনা করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দেশের সকল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণি কার্যক্রম আজ সোমবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত বন্ধ থাকবে। দেশজুড়ে তীব্র গরম ও তাপদাহের কারণে সারাদেশে বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতা গোল্ডকাপ প্রাথমিক বিদ্যালয় ফুটবল টুর্নামেন্টের সব খেলাও স্থগিত করা হয়েছে। শনিবার থেকে এ টুর্নামেন্ট শুরু হওয়ার কথা ছিল।

বর্ষা আসার আগে গত ২৯ মে থেকে দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে চলছে তাপপ্রবাহ, ভ্যাপসা গরমে জনজীবনে উঠেছে নাভিশ্বাস। আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, গতকাল রোববার রাজশাহী, নওগাঁ, নীলফামারী ও দিনাজপুর জেলার ওপর দিয়ে তীব্র তাপপ্রবাহ বইছে। ঢাকা, ময়মনসিংহ, খুলনা ও বরিশাল বিভাগসহ রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের অবশিষ্টাংশ এবং মৌলভীবাজার, চাঁদপুর ও নোয়াখালী জেলার ওপর দিয়ে মৃদু থেকে মাঝারি তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। আগামী পাঁচ থেকে ছয় দিন অব্যাহত থাকতে পারে।