ক্ষতিপূরণ না দিয়ে আবারও চালু কার্যক্রম

বিএম ডিপোর বিস্ফোরণের ১ বছর

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে বিএম কন্টেইনার ডিপোতে অগ্নিকাণ্ডে ভয়াবহ বিস্ফোরণের এক বছর পূর্ণ হচ্ছে আজ রোববার (৪ জুন)। গত বছরের ৪ জুন রাতে সীতাকুন্ডে বিএম ডিপোতে স্মরণকালের ভয়াবহ বিস্ফোরণে কেঁপে উঠেছিল পুরো এলাকা। সেনাবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস, পুলিশসহ বিভিন্ন বাহিনীর চেষ্টার পরও আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সময় লাগে ৮৬ ঘণ্টা অর্থাৎ সাড়ে ৩ দিন। বিস্ফোরণে লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় পুরো ডিপো। ডিপোর শ্রমিক, ফায়ার সার্ভিস কর্মীসহ প্রাণ হারান ৫১ জন, আহত এবং পঙ্গু হন অন্তত ২০০ জন। অনেকে এখনও দুর্ঘটনার ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছেন। যারা প্রাণ হারিয়েছেন তাদের পরিবারও পায়নি উপর্যুক্ত ক্ষতিপূরণ। পরিবারের কর্মক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে পথে বসেছে অনেকে পরিবার। ক্ষতিপূরণ না দিয়ে আবারও চালু করা হয়েছে কার্যক্রম। এর যথাযথ জবাব চান তারা। যদিও ডিপো কর্তৃপক্ষের দাবি, হতাহতদের পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ দিয়েছে।

বিএম কন্টেইনার ডিপোতে অগ্নিকাণ্ডের ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনায় গত বছরের ৭ জুন সীতাকুণ্ড থানা পুলিশ বাদী হয়ে বিএম ডিপোর ৮ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে মামলা করে। পুলিশ এজাহারে বলেছে, ‘বিএম ডিপোতে যথাযথ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করে বিপজ্জনক কেমিক্যালভর্তি কন্টেইনার রাখে। অগ্নিকাণ্ডের পর উদ্ধারকাজে নিয়োজিত ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের কন্টেইনারের ভেতর কেমিক্যালভর্তি ড্রাম থাকার বিষয়টি অবহিত করা হয়নি। আসামিদের ইচ্ছাকৃত অবহেলার কারণে বিএম ডিপোতে অগ্নিকাণ্ড ও হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।’

ভয়াবহ এই বিস্ফোরণের নেপথ্যে মালিক-কর্তৃপক্ষের স্পষ্ট দায় বা অবহেলা দেখেন বিশ্লেষকরা। তবে এ মামলায় মালিকপক্ষ না থাকলেও আসামি করা হয়-বিএম ডিপোর ডিজিএম (অপারেশন) নুরুল আক্তার, ম্যানেজার (অ্যাডমিন) খালেদুর রহমান, সহকারী অ্যাডমিন অফিসার আব্বাস উল্লাহ, সিনিয়র এক্সিকিউটিভ (অ্যাডমিন অ্যান্ড কমপ্লায়েন্স) মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন, সহকারী ব্যবস্থাপক (ইনল্যান্ড কন্টেইনার ডিপো-আইসিডি) আবদুল আজিজ, সিএফএস ইনচার্জ সাইফুল ইসলাম, কন্টেইনার ফ্রেইট স্টেশনের (সিএফএস) কর্মী নজরুল ইসলাম এবং জিএম (সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং) নাজমুল আক্তার খানকে।

অভিযুক্তদের অবহেলায় জান, মাল ও সম্পত্তির ক্ষতি হয়। দুর্ঘটনার পর চট্টগ্রামে তৎকালীন অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার মো. মিজানুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত সরকারি তদন্ত কমিটি একটি প্রতিবেদন দেয়। এ জাতীয় ঘটনার পুনরাবৃত্তি এড়াতে তাতে ২০টি সুপারিশ করা হয়। তদন্ত কমিটি সরকারের বিভিন্ন পক্ষের অবহেলা এবং মালিক পক্ষের অবহেলাকেও এ ঘটনার জন্য দায়ী করে। তবে এসব সুপারিশের কোনটাই বাস্তবায়ন হয়নি। দুর্ঘটনার পর ডিপোর কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। পরে ধীরে ধীরে সেটি ফের চালু করা হয়।

শনিবার বিকেলে চট্টগ্রাম নগরের চেরাগি পাহাড় মোড়ে বিস্ফোরণের এক বছর পূর্তি উপলক্ষে কর্মসূচির আয়োজন করে চট্টগ্রাম যুব ট্রেড ইউনিয়ন নেটওয়ার্ক। বাংলাদেশ লেবার ফেডারেশনের চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক আবু আহমেদ মিয়ার সভাপতিত্বে এবং বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের কেন্দ্রীয় কমিটির সংগঠক ফজলুল কবিরের সঞ্চালনায় কর্মসূচিতে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) জ্যেষ্ঠ কর্মসূচি কর্মকর্তা পাহাড়ি ভট্টাচার্য, আইনজীবী ইকবাল হোসেন প্রমুখ। সমাবেশে বক্তারা বলেন, দুর্ঘটনার পর পর বিএম কনটেইনার ডিপো কর্তৃপক্ষ বিবৃতি ও বিজ্ঞাপন দিয়ে আহত ও নিহতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণের ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু এখনো অন্তত ৭-৮ জন শ্রমিকের পরিবার কোনো ক্ষতিপূরণ পায়নি। ডিএনএ পরীক্ষায় শনাক্ত না হওয়ার অজুহাতে এই ক্ষতিপূরণ দেওয়া হচ্ছে না।

বক্তারা আরও বলেন, ক্ষতিপূরণ পাচ্ছেন না আহত শ্রমিকেরা। প্রশাসন ও ডিপো কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও কোনো সুনির্দিষ্ট আশ্বাস মিলছে না। আহত শ্রমিকদের অনেকের চোখ নষ্ট হয়ে গেছে। অনেকে কানে শুনতে পান না। তাঁদের প্রায় সবাইকে পঙ্গুত্ব বরণ করতে হচ্ছে। এক বছর ধরে আয়-রোজগারহীন অবস্থায় জীবনযাপন করছেন। তাঁদের চিকিৎসার খরচ জোগাড় করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

নিহত লরি চালক আবুল হাশেমের পরিবারে এখনও কাটেনি শোকের ছায়া। ঘটনার ৩৪ দিন পর ডিপোর ভেতর পাওয়া গিয়েছিল দগ্ধ হাশেমের মরদেহ। ১০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ পেলেও তার শুন্যতা পূরণ হওয়ার নয়। নিহত হাশেমের স্ত্রী মুসলিমা আক্তার জানান, ঘটনার দিন হাশেম কথা দিয়ে গিয়েছেন ২ ঘণ্টা পরই ফিরে আসবেন বাড়িতে। কিন্তু সেই অপেক্ষার প্রহর শেষ হয়নি আজও। নিহত হাশেমের মেয়ে সালমা আকতারের অভিযোগ, ঘটনার সময় ডিপোর ভেতরে আটকে পড়া মানুষদের বের করে নেয়ার বদলে সমস্ত গেট আটকে দেয়া হয়। এ কারণে সেখান থেকে চাইলেও বের হতে পারেননি কেউ।

এদিকে গত ৫ মে সীতাকুণ্ডের বিএম কন্টেইনার ডিপোর আট কর্মকর্তাকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দিয়ে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন (ফাইনাল রিপোর্ট) দাখিল করে চট্টগ্রাম জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। চূড়ান্ত প্রতিবেদনে চট্টগ্রাম জেলা ডিবি পুলিশ বলেছে, ‘অভিযুক্তরা ঘটনার জন্য দায়ী নয় বা বিস্ফোরণটি কোনো নাশকতা নয়। এটি একটি দুর্ঘটনা ছিল।’

সীতাকুণ্ড মডেল থানার ওসি তোফায়েল আহমেদ বলেন, ডিবি পুলিশ বিএম ডিপোর বিস্ফোরণ-অগ্নিকাণ্ডের মামলায় ফাইনাল রিপোর্ট জমা দিয়েছে বলে জানি। সেটি সম্ভবত আদালতে এখনও শুনানি হয়নি।

প্রসঙ্গত, নেদারল্যান্ডস ও বাংলাদেশের দুটি প্রতিষ্ঠানের যৌথ বিনিয়োগে বিএম কনটেইনার ডিপো গড়ে ওঠে। এখানে বাংলাদেশের স্মার্ট গ্রুপের অংশীদারি রয়েছে। গত বছরের ৪ জুন রাতে সীতাকুণ্ডের কদমরসুল এলাকায় অবস্থিত বিএম ডিপোতে  রাত ৯টার দিকে আগুন লাগে। রাত ১১টার দিকে প্রথম বড় বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে একে একে ছুটে যায় চট্টগ্রাম ফায়ার সার্ভিসের ১৫টি ইউনিট। নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুর জেলা থেকেও পরে যোগ দেয় কয়েকটি ইউনিট। ৫ জুন সকাল পর্যন্ত আগুন নেভাতে আসা ইউনিটের সংখ্যা বেড়ে হয় ২৫টি। কিন্তু কন্টেইনারে থাকা রাসায়নিক পদার্থের কারণে দফায় দফায় বিস্ফোরণে বাড়ে আগুনের ভয়াবহতা।

৮৭ ঘণ্টা পর ৮ জুন দুপুরে বিএম কনটেইনার ডিপোর আগুন নেভে। সাংবাদিকদের সেদিন দুপুর ১২টার দিকে এ তথ্য নিশ্চিত করেন সেনাবাহিনীর ২৪ পদাতিক ডিভিশনের ১৮ ব্রিগেডের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আরিফুল ইসলাম হিমেল। আগুন ও বিস্ফোরণের ঘটনায় অর্ধশত প্রাণহানি ঘটে। আহত হন আড়াই শতাধিক।

এমএফ