সাবেক পুলিশ সুপার (এসপি) বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু হত্যা মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি খাইরুল ইসলাম কালুকে গ্রেফতার করা হয়েছে। শনিবার (৩ জুন) ভোর রাতের দিকে নগরীর বিশ্বকলোনী এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করার কথা জানিয়েছে পিবিআই। এরপর তাকে রাঙ্গুনিয়া থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।
মামলার তদন্ত সংস্থা পিবিআই জানিয়েছে, খুনের দিন কালু মিতুকে ছুরিকাঘাত করেছিলো। মিতু হত্যাকান্ডের পর থেকে কালু পালিয়ে ছিল। নগরীর আকবর শাহ এলাকায় ব্যক্তিমালিকানাধীন একটি জায়গায় নিরাপত্তা প্রহরী হিসেবে কাজ করতো সে।
পুলিশের ভাষ্যমতে, কালু বাবুল আক্তারের ‘সোর্স’ ছিলো। এ ছাড়া এই হত্যাকান্ডের সন্দেহভাজন কামরুল ইসলাম শিকদার মুছাও বাবুলের ঘনিষ্ঠ ‘সোর্স’ ছিলো। হত্যাকান্ডের পর সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে তাদের শনাক্ত করার কথা জানিয়েছিল পুলিশ।
মিতু হত্যাকান্ডের সাত বছর পূর্তির দুই দিন আগে চাঞ্চল্যকর এই মামলার আসামি কালু গ্রেফতার হলেও মুছার এখনো পর্যন্ত কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
কালু গ্রেফতার হওয়ার পর প্রশ্ন উঠেছে, মুছা এখন কোথায়? সে পলাতক নাকি গুম হয়েছে? এর জবাব মামলার তদন্তকারী সংস্থা পিবিআইয়ের কাছেও নেই।

জানতে চাইলে পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্টোর এসপি নাঈমা সুলতানা দেশ বর্তমানকে বলেন, ‘মুছার সন্ধান আমরা এখনো পর্যন্ত পাইনি। আমরা তাঁকে খুঁজছি।’
কিন্তু মুছার স্ত্রীর পান্না আক্তারের অভিযোগ, মিতু হত্যাকান্ডের সতের দিনের মাথায় তাঁর স্বামীকে ‘তুলে নিয়ে যায়’ পুলিশ। এরপর আর ফিরে আসেননি তিনি।
মুছার স্ত্রীর অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে এসপি নাঈমা সুলতানা বলেন, ‘তিনি (মুছার স্ত্রী) দাবি করতেই পারেন। কিন্তু তাঁর এই দাবি সত্য কিনা তা আমরা জানি না।’
২০১৬ সালের ৪ জুলাই চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে পান্না আক্তার দাবি করেছিলেন, ২০১৬ সালের ২২ জুন ডিবি পুলিশ পরিচয়ে কিছু লোক তাঁর স্বামীকে নগরীর কাঠগড় এলাকা থেকে তুলে নিয়ে গেছে।
সেদিন সংবাদ সম্মেলনে পান্না জানিয়েছিলেন, ‘মিতু হত্যাকান্ডের তিন দিন পর আদালতে আত্মসমর্পন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল মুছা। ২২ জুন আদালতে যাবেন বলেও জানান। ওই সময় পতেঙ্গার কাঠগড় এলাকায় মুছার বন্ধু নুরনবীর বাসায় ছিলাম আমরা। মুছার পরদিন সকালে ওখানে আসার কথা ছিল। ২২ জুন সকালে নুরনবীর বাসায় ডিবি পুলিশ আসে। তারা মুছা এসেছে কিনা জানতে চান। এ সময় নুরনবীর ফোনে মুছার ফোন আসে। নুরনবীকে মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে লাউডস্পিকারে ফোন রিসিভ করতে বলেন এক পুলিশ কর্মকর্তা। এ সময় মুছা কোথায় আছেন তা জানতে বলেন। তাদের নির্দেশ অনুযায়ী নুরনবী তা জানতে চাইলে মুছা কাঠগড় তিন রাস্তার মোড়ে আছেন বলে জানান। তাৎক্ষণিক পুলিশ সদস্যরা নুরনবীকে পিকআপ ভ্যানে ও আমাকে মাইক্রোবাসে তুলে নেন। তিন রাস্তার মোড়ে পৌঁছালে পিকআপ ভ্যান থেকে নেমে নুরনবী মুছাকে দেখিয়ে দেন। পুলিশ পিকআপ ভ্যানে তুলে মুছাকে নিয়ে যায়। তখন থেকে তার আর কোনো সন্ধান নাই।’
মিতু হত্যায় মুছা জড়িত তা জানতেন না জানিয়ে পান্না বলেছিলেন, ‘‘২০১৬ সালের ১৮ বা ১৯ জুন মুছার কাছে একটা ফোন আসে। তখন তিনি আমার কাছ থেকে একটু সরে যান। ওই প্রান্ত থেকে কি বলেছে তা শুনিনি। কিন্তু মুছাকে বলতে শুনেছি-আমার পরিবারের কোনো ক্ষতি হলে আমি মুখ খুলবো স্যার। ফোন রেখে দেওয়ার পর মিতু হত্যায় তিনি জড়িত কিনা জানতে চাইলে মুছা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমি চাই নাই। আমাকে বাধ্য করা হয়েছে। নয়তো আমাকে বাঁচতে দিতো না। আমি সরাসরি ছিলাম না। লোকজন ঠিক করে দিয়েছি।’’
পান্নার এই বক্তব্যে মিতু হত্যাকান্ডে এক রহস্য ঘনীভূত হয়। মুছাকে সেদিন পুলিশের পোশাকে কারা তুলে নিয়ে গিয়েছিল? আর ধরে নিয়ে যাওয়ার আগে তিনি কাকে ফোনে স্যার সম্বোধন করে মুখ খুলতে বাধ্য হবেন বলে হুমকি দিয়েছিলেন?
তখন পুলিশ মুছাকে তুলে নিয়ে যাওয়ার কথা অস্বীকার করেছে। এখনো পুলিশের সেই বক্তব্য বদলায়নি। তখন পুলিশ মুছার দেশত্যাগ ঠেকাতে নিষেধাজ্ঞা জারি করে বিমান ও স্থলবন্দরে বার্তা পাঠায়।
এদিকে মুছা বাবুল আক্তারের ‘সোর্স’ ছিল কিনা তা নিয়ে আদালতে গত ২২ মে প্রশ্ন তুলেছেন তাঁর আইনজীবীরা।
সেদিন এ হত্যা মামলার সাক্ষী দেওয়ার পর বাদী মোশাররফ হোসেন মুছা বাবুল আক্তারের দীর্ঘদিনের ‘সোর্স’ ছিলেন বলে জানান। তখন বাবুল আক্তারের আইনজীবী কফিল উদ্দিন মোশাররফ হোসেনের কাছে জানতে চান, ‘কোনো ডকুমেন্ট দেখাতে পারবেন?’ জবাবে মোশাররফ বলেন, ‘না, আমার কাছে নেই।’
এরপর আইনজীবী কফিল উদ্দিন বাবুল আক্তারের শ^শুর মোশাররফ হোসেনকে বলেন, ‘মুছা ছিল পিবিআই’র প্রধান বনজ কুমার মজুমদারের সোর্স। মুছা, বাবুলের সোর্স, এটা মিতু হত্যার ঘটনার পর থেকে বনজ কুমার প্রচার করেন। মুছা, বাবুলের সোর্স এই কথা বনজ কুমার আপনাকে শিখিয়েছেন এবং আপনার এজাহারে লিখেছেন? জবাবে মোশাররফ হোসেন তা অস্বীকার করেন।
২০১৬ সালের ৫ জুন সকালে চট্টগ্রাম নগরীর জিইসি মোড়ে ছেলেকে স্কুল বাসে তুলে দিতে যাওয়ার পথে দুর্বৃত্তদের গুলি ও ছুরিকাঘাতে খুন হন সাবেক এসপি বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু। ওই সময় এ ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচিত হয়। ঘটনার সময় এসপি বাবুল আক্তার অবস্থান করছিলেন ঢাকায়। ঘটনার পর চট্টগ্রামে ফিরে তিনি নগরীর পাঁচলাইশ থানায় অজ্ঞাতপরিচয় কয়েকজনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
তখন পুলিশের ধারণা ছিল, চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকান্ড জঙ্গিরা ঘটিয়ে থাকতে পারে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে পুলিশ সারাদেশে জঙ্গিদের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযানে নামে। দুই সপ্তাহের অভিযানে সারাদেশে পুলিশ সাড়ে ৭ হাজার মানুষকে গ্রেফতার করে। হত্যাকাÐে অংশ নেওয়া নবী ও নুরুল ইসলাম রাশেদ নামের দুই সন্দেহভাজন ২০১৬ সালের ৫ জুলাই রাঙ্গুনিয়ার ঠাÐাছড়ি এলাকায় ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন।
মিতু হত্যার প্রায় তিন সপ্তাহ পর ২০১৬ সালের ২৪ জুন রাজধানীর খিলগাঁওয়ের শ্বশুরবাড়ি থেকে বাবুল আক্তারকে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে প্রায় ১৫ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এরপরেই ছড়িয়ে পড়ে, বাবুল আক্তারকে চাকরি থেকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। এর দেড় মাস পর ৯ আগস্ট বাবুল আক্তার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পদত্যাগপত্র প্রত্যাহারের আবেদন করেন। তবে সেই আবেদন গ্রহণ করা হয়নি। এরপর ৬ সেপ্টেম্বর বাবুলকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
২০২০ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত মামলাটির তদন্ত করে চট্টগ্রাম মেট্টোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। পরে আদালতের নির্দেশে মামলাটি পিবিআইয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
মিতু হত্যাকান্ডের প্রায় পাঁচ বছরের মাথায় ২০২১ সালের ১১ মে বাবুল আক্তারকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য চট্টগ্রাম পিবিআই কার্যালয়ে ডেকে নেওয়া হয়। এর পরদিন ১২ মে ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে পিবিআই প্রধান বনজ কুমার মজুমদার বলেন, মিতু হত্যার সঙ্গে তার স্বামী বাবুল আক্তারের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পেয়েছেন তারা।
ঢাকায় ওই সংবাদ সম্মেলনের পরপরই চট্টগ্রামে বাবুলের করা মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয় পিবিআই। এরপর ওইদিনই পাঁচলাইশ থানায় মিতুর বাবা মোশাররফ হোসেন একটি হত্যা মামলা করেন। এরপর ওই দিনই বাবুল আক্তারকে গ্রেফতার দেখায় পিবিআই। এই মামলায় বাবুল আক্তারসহ আটজনকে আসামি করা হয়। সেই মামলায় গত বছরের ১৩ সেপ্টেম্বর বাবুল আক্তারসহ সাতজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দেয় পিবিআই। চার্জশিট জমা দেওয়ার ৬ মাস পর গত ১৩ মার্চ সাত আসামির বিচার শুরুর আদেশ দেন আদালত।
বাবুল আক্তার ছাড়া চার্জশিটভুক্ত অন্য আসামিরা হলেন-মোতালেব মিয়া ওরফে ওয়াসিম, আনোয়ার হোসেন, এহতেশামুল হক ভোলা, শাহজাহান মিয়া, কামরুল ইসলাম শিকদার ওরফে মুছা ও খায়রুল ইসলাম ওরফে কালু। আসামিদের মধ্যে বাবুল আক্তারসহ চারজন কারাগারে, কালুসহ দুজন পলাতক এবং একজন জামিনে ছিলেন। হত্যাকান্ডের সাত বছর পর পিবিআই কালুকে গ্রেপ্তার করার কথা জানালো।