বিরোধীদের মোকাবেলায় ঘরের ঐক্যকে গুরুত্ব দিচ্ছে আ. লীগ

আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে শাসক দল আওয়ামী লীগ ঘরের ঐক্যকেই গুরুত্ব দিচ্ছে। বিশেষ করে আর্দশিক জোট ১৪ দলীয় জোটের ঐক্যকে আরো সুদৃঢ় করতে উদ্যেগী হচ্ছেন দলের দায়িত্বশীল নেতারা। শরীকদের মধ্যে দূরত্ব কমিয়ে শক্ত ভীতের উপর ঐক্যকে দাঁড় করা এখনকার বড় কাজ। পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক দলগুলোর মধ্যে যারা নির্বাচনী জোটে আসতে আগ্রহ প্রকাশ করছে তাদেরকে কি ভাবে জোটে স্থান দেয়া যায় তা নিয়ে কাজ করছেন নেতারা। এ কাজে দলীয় প্রধান ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ নির্দেশনা রয়েছে বলে জানা গেছে।

আওয়ামী লীগের নীতিনিধারনী নেতাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ‘ঘরের মধ্যে ঘর’ যারা তুলছেন-তাদের বিষয়ে কঠোর হওয়ার পাশাপাশি রাজনীতির মাঠে দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত সঙ্গী শরিক দলগুলোর সঙ্গে দূরত্ব কমিয়ে আনাকেই গুরুত্ব দিচ্ছেন। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ভিসানীতি এবং আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপিসহ বিরোধী বলয়কে মোকাবিলায় এর বিকল্প নেই বলে মনে করছেন তারা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে,ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের জন্য আগামী আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বড় চ্যালেঞ্জ। এর আগে পাঁচ সিটি করপোরেশন নির্বাচন ছিল দলটির জন্য এক কথায় টেষ্ট পরীক্ষা’। বিএনপিবিহীন ভোটে অনেকটা হেসেখেলেই জয়ের সুফল ঘরে তোলার কথা তাদের। কিন্তু গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন শাসক দলের হিসাব-নিকাশ এলোমেলো করে দিয়েছে। ২৫ মে অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনে নৌকার প্রার্থী আজমত উল্লা খান পরাজিত হয়েছেন। একই দলের বহিষ্কৃত নেতা, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের মা জায়েদা খাতুনের কাছে। বুকে নৌকার ব্যাজ পরা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ম‚লত জায়েদা খাতুনের টেবিল ঘড়ি প্রতীকের পক্ষে কাজ করে দলীয় প্রার্থীর পরাজয় নিশ্চিত করেন।

আগামী ১২ জুন খুলনা ও বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচন। এরপর ২১ জুন রাজশাহী এবং সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচন। খুলনায় আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী, সাবেক মেয়র তালুকদার আবদুল খালেক অনেকটাই নির্ভার। দলের পাশাপাশি ১৪ দলীয় জোটের শরিক দলগুলোর স্থানীয় নেতাকর্মীরাও ভোটের মাঠে তার সঙ্গে আছেন পুরোদমে। তবে বরিশালে আওয়ামী লীগের চিত্র ঠিক এর বিপরীত। এখানে আওয়ামী লীগই আওয়ামী লীগের বড় সমস্যা। দলটির একটি অংশ এখন পর্যন্ত নৌকা মনোনীত মেয়র প্রার্থী আবুল খায়ের আবদুল্লাহ ওরফে খোকন সেরনিয়াবাতের পক্ষে মাঠে নামেননি। রাজশাহী এবং সিলেটেও নৌকার প্রার্থীর পক্ষে ভোটের মাঠে নীরব ও নিষ্ক্রিয় দলটির একটি অংশ, যা ভাবিয়ে তুলেছে ক্ষমতাসীনদের।

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়ামের সদস্য কাজী জাফর উল্লাহ বলেন, সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীর পক্ষেই জোটের শরিকরা কাজ করবে। ইতোমধ্যে তাদের সঙ্গে কথাও হয়েছে। নৌকার জয় নিশ্চিত করতে আমরা সর্বাত্মকভাবেই মাঠে আছি। আশা করছি আমরা জয়ী হয়েই ঘরে ফিরব।

এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম দেশ বর্তমানকে বলেন, গাজীপুরের বিষয়টা ভিন্ন। সেখানে একজন নারী প্রার্থী ছিলেন। বাকি চার সিটিতে এ রকম কোনো প্রার্থী নেই। তাই আমরা জয় নিয়ে চিন্তিত বা শঙ্কিত-কোনোটাই নই। বরিশালে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ সংকট সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বরিশালে কোনো দ্ব›দ্ব নেই। কারও কারও কিছুটা মনোকষ্ট আছে। দিনশেষে এটাও থাকবে না। আমরা আওয়ামী লীগ এবং ১৪ দল মিলে নৌকার সঙ্গে আছি। দিনশেষে নৌকাই জয়ী হবে। আশা করছি জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও আমরা একসঙ্গে ভোটের মাঠে থাকব।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গাজীপুর থেকে শিক্ষা নিয়ে চার সিটিতেই দলীয় প্রার্থীর জয় নিশ্চিত করতে চান আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকরা। এজন্য নির্বাচনের আগেই যে কোনো ম‚ল্যে স্থানীয় পর্যায়ের বিরোধ মেটানোকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন। দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গেলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে-এমন বার্তা চার সিটির নেতাকর্মীদের মাঝে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। সংসদ নির্বাচনের ক্ষেত্রেও একই বার্তা থাকবে।

একই সঙ্গে ১৪ দলীয় জোট শরিকদের নেতাকর্মীদেরও সিটির ভোটে সম্পৃক্ত করতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মান-অভিমান-টানাপোড়েন ভুলে ভোটের রাজনীতিতে তারা যাতে সরকার সমর্থক মেয়র প্রার্থীদের পাশে থাকেন-এজন্য চলছে নানা দেনদরবার। প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে আলাপ-আলোচনাও চলছে উভয়পক্ষের মধ্যে। ইতোমধ্যে নির্বাচনি বৈতরণী পার হতে খুলনা এবং বরিশাল সিটি নির্বাচন পরিচালনা কমিটিতে শরিক দলের মাঠ পর্যায়ের শীর্ষ নেতাদের গুরুত্বপ‚র্ণ পদে রাখা হয়েছে। অনেকেই মনে করছে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ১৪ দলীয় জোটকে মাঠ পর্যায়ে শক্তিশালী করার এটি একটি প্রাথমিক উদ্যোগ। যা অব্যাহত থাকবে সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত।

সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকরা বিএনপিবিহীন এই নির্বাচনের ‘ফলাফল’ ঘরে তুলতে পুরোমাত্রায় মনোনিবেশ করেছেন। এর অংশ হিসাবে আওয়ামী লীগের একাধিক টিম এখন চার সিটি করপোরেশন এলাকায় অবস্থান করছেন। আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানকসহ দলটির একটি টিম এই মুহ‚র্তে বরিশালে আছেন। শিগগিরই এই টিমে সম্পৃক্ত হবেন ১৪ দলীয় জোটের শরিক দলগুলোর নেতারাও। আগামী ৩ জুন বরিশাল বিভাগ আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভা অনুষ্ঠিত হবে। এই সভায় ঐক্যবদ্ধভাবে নৌকা প্রার্থীর পক্ষে কাজ করা নিয়ে আলোচনা হবে। একইভাবে খুলনা, রাজশাহী এবং সিলেটেও আওয়ামী লীগের পাশাপাশি ১৪ দলীয় জোটের নেতারা ভোটের মাঠে পুরোদমে থাকবেন।

এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের অন্যতম প্রধান শরিক জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনু দেশ বর্তমানকে বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিভিন্ন জায়গায় আওয়ামী লীগের প্রার্থীর পরাজয়ের একটা বড় কারণ তাদের প্রার্থী বাছাইয়ে ভুল সিদ্ধান্ত। পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ¦-বিরোধেও জর্জরিত দলটি। এর সঙ্গে রয়েছে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ ও বিক্ষোভ। যার কারণে নির্বাচনে নানা ঘটনা-দুর্ঘটনার জন্ম হচ্ছে। পরিস্থিতি শক্ত হাতে সামাল দিতে না পারলে ভবিষ্যতে এই সংকট আওয়ামী লীগের জন্য বড় ধরনের সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।

তিনি আরও বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে এসেছে। আওয়ামী লীগকে প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে আরও বেশি যত্নবান এবং সতর্ক হতে হবে। বিতর্কিত কাউকেই আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন দেওয়া ঠিক হবে না। একই সঙ্গে তাদের দলের আন্তঃবিরোধ মেটানো ও স্তিমিত ১৪ দলীয় জোটকে রাজনীতির মাঠে সক্রিয় করতে হবে।

১৪ দলীয় জোটের আরেক শীর্ষ নেতা ও সাবেক মন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়া বলেন, আওয়ামী লীগে যেমন এখন রাজনীতি নেই, ১৪ দলীয় জোটেও তেমনি এখন কোনো রাজনীতি নেই। সব চলছে প্রশাসন দিয়ে অথবা প্রশাসনের ওপর নির্ভর করে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য আওয়ামী লীগকে রাজনীতির মূলস্রোতধারায় ফিরে আসতে হবে।  একইভাবে ১৪ দলীয় জোটকেও রাজনীতির মাঠে সক্রিয় করতে হবে। রাজনীতি দিয়েই বিরুদ্ধ রাজনীতিকে মোকাবিলা করা ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই।

তবে শেষ কথা হচ্ছে, আওয়ামী লীগ নেতারা বিশ্বাস করেন,রাজনীতির আর্দশিক জোট ১৪ দলীয় জোট। এ জোটের নেতাদের মধ্যে পাওয়া না পাওয়া নিয়ে কিছুটা ক্ষোভ বিক্ষোভ থাকলেও তা নিরসন করা কঠিন হবে না। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা সবাই কে নিয়ে বৈঠকে বসলে সব ঠিক হয়ে যাবে।

১৪ দলের বাইরে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর কৃষক শ্রমিক জনতা পাটি,আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর জেপি, নজীবুল বশর মাইজভান্ডারীর তরিকত ফেডারেশন, কিংবা মিজবাহুর উদ্দিনের ইসলামী ঐক্য জোট দীর্ঘ দিন থেকে আওয়ামী লীগের জোটে জোটবন্ধ হতে চাচ্ছে। কিন্তু তাদের বিষয়ে এখনো কোন সিদ্ধান্ত চুড়ান্ত হয়নি। সিটি করপোরেশন নির্বাচনের পর পর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে জানিয়েছে আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতারা।