দফায় দফায় নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধিতে দিশেহারা সাধারণ মানুষ। বৈদেশিক মুদ্রার আয় ও রিজার্ভ, তারল্য সংকট, বাণিজ্য ঘাটতি, ব্যাংকিং খাতে অনিয়মসহ নানা কারণে চাপে রয়েছে দেশের সার্বিক অর্থনীতি। এর মধ্যে আগামী ১ জুন জাতীয় সংসদে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল।
‘উন্নয়নের দীর্ঘ অগ্রযাত্রা পেরিয়ে স্মার্ট বাংলাদেশের অভিমুখে’ শীর্ষক বাজেট বক্তৃতা করবেন অর্থমন্ত্রী। এতে স্মার্ট নাগরিক, স্মার্ট অর্থনীতি, স্মার্ট সরকার এবং স্মার্ট সমাজ করার কথাও তুলে ধরবেন তিনি।
নতুন এই অর্থবছরের বাজেটে সবার নজর থাকবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্তপূরণের দিকে। আইএমএফের শর্ত মোতাবেক আগের মতো বিভিন্ন খাতের ভর্তুকি থাকবে, না কমানো হবে। করছাড় সুবিধা কোনো ক্ষেত্রে বাতিল এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে কমানো হবে। অনেক ধরণের প্রনোদনাও বাতিল বা কমানো হতে পারে। ফলে সাধারণ মানুষের ঘাড়ে করের সঙ্গে সঙ্গে নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে ব্যয়ের বোঝা আরও বাড়তে পারে। তাই আইএমএফের শর্তগুলোকে প্রাধান্য না দিয়ে দেশের মানুষের চাহিদার নিরিখে পণ্যের মূল্য বা মূল্যস্ফীতি কমানোর উদ্যোগ থাকতে হবে এমন বলছেন বিশ্লেষকরা।
জানা গেছে, আগামী ২০২৩- ২৪ অর্থবছরের বাজেটের আকার হতে পারে ৭ লাখ ৬২ হাজার কোটি টাকা। মোট আয়ের (রাজস্ব আদায়ের) লক্ষ্যমাত্রা ৫ লাখ কোটি টাকা। এবং এর ঘাটতি ২ লাখ ৬১ হাজার ৯৯১ কোটি টাকা। এর মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) হবে ২ লাখ ৬৩ হাজার কোটি টাকা। আর মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৭ দশমিক ৫ শতাংশ হতে পারে। বাজেটে ঘাটতি মেটাতে ব্যাংকিং খাতে আরও বেশি নির্ভর করতে যাচ্ছে সরকার।
এক্ষেত্রে চলতি অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ১৮ শতাংশ বেশি ব্যাংক ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকার বেশি পরিমাণে ব্যাংক ঋণ নিলে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ কমে যাওয়ার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাবে।
বাজেটে একদিকে যেমন ভর্তুকি বা সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে বরাদ্দ কমানোর কথা ভাবা হচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি বিভিন্ন খাতে করহার বাড়ানো, নতুন করে কর আরোপ করা এবং বিদ্যমান করছাড় সুবিধা প্রত্যাহারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। কর সনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) থাকলেও ন্যূনতম দুই হাজার টাকা করে কর আদায়ের কথা ভাবা হচ্ছে নতুন বাজেটে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সংশ্লিষ্ট এক তথ্য মতে, বর্তমানে ব্যক্তি শ্রেণীতে টিআইএনধারীর সংখ্যা সংখ্যা প্রায় ৮৬ লাখ। এর মধ্যে মাত্র ৩২ লাখ ব্যক্তি আয়কর রিটার্ন জমা দেন। যে ৩২ লাখ ব্যক্তি আয়কর রিটার্ন জমা দেন, তাদের মধ্যে প্রায় ৮ লাখের করযোগ্য আয় নেই।
দেশের অর্থনীতিবিদরা বলছেন, অন্যসব বছরের তুলনায় এ বছরের বাজেট কিছুটা চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে। কারণ সরকার একদিকে জাতীয় নির্বাচনের কথা বিবেচনায় রেখে জনতুষ্ঠির দিকে গুরুত্ব দেবে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের শর্তগুলো বাস্তবায়নের চাপও থাকবে। ফলে এর সাথে ভারসাম্য রেখে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আদায় আর প্রবৃদ্ধির ওপর সরকার কতটা গুরুত্ব দিতে পারবে, সেদিকে তাকিয়ে রয়েছেন অর্থনীতিবিদরা।
এ প্রসঙ্গে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেছেন, আগামী বাজেট হতে হবে দেশের অর্থনৈতিক সংস্কার ও ঝুঁকি কমানোর বাজেট। এ জায়গা থেকে সবচেয়ে আগে নজর দিতে হবে সামষ্টিক অর্থনীতির ব্যবস্থাপনার দিকে। পাশাপাশি রাজস্ব আহরণ, নিত্যপণ্যের মূল্য স্থিতিশীল রাখা, মূল্যস্ফীতির লাগাম ধরে রাখার দিকে।
আইএমএফ বাংলাদেশকে ৪৭০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ দিচ্ছে। এরমধ্যে প্রথম কিস্তি ছাড় হয়েছে। পরবর্তী কিস্তি দেওয়ার আগে কিছু শর্ত জুড়ে দিয়েছে আইএমএফ। সে অনুযায়ী মূলত পাঁচ ধরণের পদক্ষেপ বাংলাদেশকে নিতে হবে। যেমন সরকারের আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানো, মূল্যস্ফীতি কমাতে মুদ্রানীতির কাঠামো আধুনিক করা, আর্থিক খাতকে শক্তিশালী করা, বাণিজ্য পরিবেশ ভালো করা এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবেলার সামর্থ বাড়ানো।
এই পাঁচ ধরণের বিষয়ের মধ্যে মূল বিষয় হচ্ছে, ভর্তুকি কমাতে হবে। যাতে সরকার বেশি অর্থ উন্নয়ন ও সামাজিক খাতে ব্যয় করতে পারে। এজন্য সরকারকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি, গ্যাস , পানি ও সারের দাম বাড়াতে হবে। এই পাঁচটি পণ্যেই সরকারকে বেশি ভর্তুকি দিতে হয়। সরকার এ কাজ সহজেই করে ফেলেছে । রাজস্ব আয় বাড়ানোর শর্তও এবার রয়েছে। এ জন্য নানা খাতে যেসব কর ছাড় দেওয়া হয়, তা কমানোর শর্ত দিয়েছে আইএমএফ।
সিপিডির বিশেষ ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, দেশের বাজেট এখন অনাথ আর আইএমএফ তার পালক পিতা। আইএমএফ যখন কোনো দেশে কর্মসূচি নিয়ে যায়, তখন সেই দেশের অর্থনীতির ওপর এক কর্তৃত্ব আরোপের চেষ্টা করে। আইএমএফ যখন কোনো দেশে কর্মসূচি নিয়ে যায়, তখন অনেক সময় সে দেশে বৈষম্য বেড়ে যায়। তারা যেসব শর্ত দেয়, তার কারণেই এটি হয়।
ভর্তুকি প্রসঙ্গে ড. দেবপ্রিয় আরও বলেন, ভর্তুকি অনেক সময় ভালো হয়, আবার খারাপও হয়। বিদ্যুৎ খাতে যে বিপুল পরিমাণে ক্যাপাসিটি চার্জ দেওয়া হচ্ছে, তা দিয়ে সার ও ডিজেলের মতো খাতেও ভর্তুকি বাড়ানো সম্ভব।
সিপিডির আরেক সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেছেন, গত সাত বছরের মধ্যে এখন আমাদের রিজার্ভ সবচেয়ে কম, যার পরিমাণ ৩০ বিলিয়ন ডলারের নিচে। সরকার ধারদেনা পরিশোধ করলে এই রির্জার্ভ আরো কমবে। আইএমএফের শর্ত অনুযায়ী দ্বিতীয় কিস্তির টাকা পেতে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নেট রিজার্ভ ২৪.৬ বিলিয়ন রাখতে হবে। সবকিছু মিলিয়ে আমাদের এখন একটা সমবন্টনের বাজেটের দিকে যেতে হবে।
তিনি বলেন, গত বাজেটে সরকারকে আমরা নানাভাবে পরামর্শ দিয়েছিলাম, কিন্তু সরকার সেগুলো আমলে নেয়নি। সরকার বিষয়গুলো যদি আমলে নিত তাহলে পরিস্থিতি এত খারাপ না-ও হতে পারত। উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, রিজার্ভে চাপ, পাশাপাশি বিদ্যুৎ খাতে দিতে হচ্ছে অত্যধিক ক্যাপাসিটি চার্জ। এমন পরিস্থিতিতে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জন্য অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার বাজেট প্রত্যাশা করছি।