জাহাঙ্গীরের মধুর প্রতিশোধ, মা জায়েদাই গাজীপুরের মেয়র

আ. লীগের জন্য সতর্কবার্তা

সকল জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে আওয়ামী লীগের বহিষ্কৃত নেতা ও সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের মা জায়েদা খাতুনই হলেন গাজীপুরের নগরমাতা। তার এমন বাজিমাতে প্রথম নারী মেয়র পেল গাজীপুরবাসী। ঢাকার উপকণ্ঠের এই সিটির নির্বাচনী দৌঁড়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে জায়েদা খাতুন টেবিলঘড়ি প্রতীকে ভোট পেয়েছেন ২ লাখ ৩৮ হাজার ৯৩৪ টি। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের নৌকার প্রার্থী অ্যাডভোকেট আজমত উল্লা খান পেয়েছেন ২ লাখ ২২ হাজার ৭৩৭ ভোট। ১৬ হাজার ১৯৭ ভোটে আজমত উল্লাকে হারিয়ে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন জায়েদা খাতুন।

ছেলে জাহাঙ্গীর আলমের ‘ডামি প্রার্থী’ থেকে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রথম নারী মেয়র জায়েদা খাতুন। গৃহিণী জায়েদার জন্য দীর্ঘ এই পথটা পাড়ি দেওয়া মোটেই সহজ ছিল না। কিন্তু ছায়ার মতো মায়ের পাশে থেকে জটিল সমীকরণটাই যেন সহজ করে তুলেছেন জাহাঙ্গীর আলম। আর তাতে আওয়ামী লীগের মনোনীত নৌকা মার্কার প্রার্থী আজমত উল্লা খানকে ১৬ হাজার ১৯৭ ভোটে হারিয়ে শেষ হাসি হেসেছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী জায়েদা খাতুন।

বঙ্গবন্ধুকে কটূক্তি করে ২০২১ সালে মেয়র পদ থেকে বরখাস্ত হন জাহাঙ্গীর আলম। এরপর আওয়ামী লীগ থেকেও বহিষ্কার হন তিনি। চলতি বছরেই সাধারণ ক্ষমায় দলে ফেরেন। গাজীপুর সিটি নির্বাচনে চেয়েছিলেন আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়নও। তবে মনোনয়ন না পেয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ায় দল থেকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার হন। ওদিকে ঋণখেলাপির কারণে তার প্রার্থিতাও শেষ পর্যন্ত বাতিল হয়ে যায়। দুই বারের মেয়র জাহাঙ্গীর নিজেও হয়তো এমন আশঙ্কা করেছিলেন। এজন্য মা জায়েদা খাতুনকেও প্রার্থী করেন তিনি। মায়ের পক্ষে দিনরাত প্রচারণা চালিয়েছেন। ভোটের লড়াইয়ে কার্যত আজমত উল্লার প্রতিদ্ব›িদ্ব ছিলেন জাহাঙ্গীর। আর সেই জাহাঙ্গীরের দূরদর্শিতা আর ছায়া প্রার্থীই আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী আজমত উল্লা খানকে হারিয়ে দিলেন।

মা কাগজকলমে প্রার্থী হলেও বাস্তবে ভোটে লড়েছেন ছেলে। ফলে তার (মায়ের) বিজয় মানে জাহাঙ্গীরের বিজয়। ক্ষমতাসীন দলের সর্বাত্মক সমর্থন পেয়েও আজমত উল্লার মতো একজন বর্ষীয়ান প্রার্থী গৃহিণী জায়েদার বিরুদ্ধে হেরে যাবেন, তা কেউ ধারণাই করতে পারেননি। কিন্তু সুষ্ঠু ভোটের সব হিসাব-নিকেষ পাল্টে দিয়েছে।

আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান নেতা আজমত উল্লার এই পরাজয় নিয়ে রাজনৈতিক মহলে চলছে নানা আলোচনা। তার পরাজয়ের পেছনে কোনো একক নয়, একাধিক কারণ কাজ করেছে বলে রাজনৈতিক দলের নেতা, রাজনীতি-সচেতন ব্যক্তি ও সাধারণ ভোটাররা মনে করছেন। তাদের মতে, জাতীয় নির্বাচনের মাত্র কয়েক মাস আগে এই ফলাফল ক্ষমতাসীন দলের জন্য একটি সতর্ক বার্তা বহন করে। একজন ছায়া প্রার্থীর কাছে এমন পরাজয় থেকে অনেক কিছু শিক্ষা নেওয়ার আছে। তাই এই নির্বাচন থেকে শিক্ষা নিয়ে আগামী জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের আরও সতর্কতা অবলম্বনের প্রয়োজন রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনিয়ম ও কারচুপির নিয়মিত অভিযোগের কারণে দেশের নির্বাচন ব্যবস্থায় সাধারণ মানুষের অনাস্থা তৈরি হয়েছে। সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিতে জাতীয় ও আস্তর্জাতিক মহল থেকেও সরকার ও নির্বাচন কমিশনের ওপর নানামুখী চাপের গুঞ্জনও ছিল। ভোটের আগের রাতে মার্কিন ভিসা নীতি পরিবর্তনের ঘোষণা আসে। সুষ্ঠু ভোটে বাধা দানকারীরা যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নিষেধাজ্ঞায় পড়বেন। এ ঘোষণা গাজীপুরের ভোটে নতুন মাত্রা যোগ করে।

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সাত মাস আগে, গাজীপুরের নির্বাচন গুরুত্বের সঙ্গে নিতে বাধ্য হয় সরকার ও নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ইসিও বলেছিল, গাজীপুরের নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; কারণ দেশের মানুষ, বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা তাকিয়ে আছে এই নির্বাচনের দিকে। গাজীপুরের সুষ্ঠু ভোট কিছুটা হলেও চাপমুক্ত করেছে ইসিকে। রাজনৈতিকভাবে নির্বাচনী অনিয়মের আরেকটি অভিযোগ থেকেও রেহাই পাচ্ছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ।