নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রচুর অবৈধ অস্ত্র আসছে, উৎকন্ঠা

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশে রাজনৈতিক উত্তাপের পাশাপাশি অবৈধ অস্ত্র ব্যবহারেও উৎকণ্ঠা বাড়ছে। রাজনৈতিক সহিংসতা, হত্যা, আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার হচ্ছে। তবে নির্বাচনের আগে এসব অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে রাজনৈতিক সহিংসতায় গত তিন মাসে খুলনা, লক্ষ্মীপুর ও কুমিল্লায় একাধিক খুনের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে গত ২৪ মার্চ খুলনায় দিঘলিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাংস্কৃতিক সম্পাদক আনছার উদ্দিনকে (৬০) গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। একইভাবে ২৫ এপ্রিল লক্ষ্মীপুর জেলা যুবলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল নোমান ও জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক রাকিব ইমামকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

এরপর গত ৩০ এপ্রিল কুমিল্লার দাউদকান্দির গৌরিপুরে যুবলীগ নেতা জামাল হোসেনকেও গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহিনীর সংশ্লিষ্ট তথ্য মতে, এসব খুনের ঘটনায় অবৈধ অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অবৈধ অস্ত্র ব্যবহার বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা।

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সংশ্লিষ্ট তথ্য মতে, ২০২২ সালে দেশে ৪৭৫ টি রাজনৈতিক সহিংসতায় ৭০ জন মারা গেছেন। আর চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় একাধিক খুনের ঘটনা ঘটেছে।

গত ফেব্রয়ারি মাসে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবিষয়ক মন্ত্রিসভা কমিটির এক সভায় দেশে অবৈধ অস্ত্র ঢুকার তথ্য উঠে আসে। সভায় বলা হয়, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সরকার জানতে পেরেছে বর্তমানে দেশে প্রচুর অবৈধ অস্ত্র আসছে। এসব অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান চালাতে সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দেশ দেওয়া হয় সভা থেকেই।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কারা অবৈধ অস্ত্র দেশে আনছেন, কারা কিনছেন, কারা ব্যবহার করছেন সার্বিকভাবে তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। তা না হলে পরিস্থিতি অবনতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন পুলিশ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, রাজনৈতিক সহিংসতা, হত্যা, আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার হচ্ছে। এসব অস্ত্রের একটি অংশ আসে পার্শ¦বর্তী দেশ ভারত ও মায়ানমার থেকে। এছাড়াও বিমানবন্দর ও সমুদ্রবন্দর দিয়েও অবৈধ অস্ত্র দেশে ঢুকছে। জাতীয় নির্বাচনের আগে সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অস্ত্র আসা ঠেকাতে নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে সাঁড়াশি অভিযান চালাতে হবে। তা না হলে নির্বাচন ছাড়াও নানা সহিংসতায় এসব অস্ত্র ব্যবহার করবে দুর্বৃত্তরা।

গোয়েন্দা প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে সম্প্রতি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেছেন, দেশে প্রচুর অবৈধ অস্ত্র এসেছে। তিনি বলেন, অনেকে এসব অস্ত্রের নকল লাইসেন্স বানিয়ে নিয়েছে। লাইসেন্সের সত্যতা যেন যাচাই করা হয়। এসব অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে বড় আকারে যেন অভিযান চালানো হয়। এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সতর্ক থাকতেও বলেছেন তিনি।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন সম্প্রতি গণমাধ্যমকে বলেছেন, সারা বছরই অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করে র‌্যাব। যেহেতু নির্বাচনে অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি বেড়ে যাওযার আশঙ্কা থাকে, তাই সীমান্ত সহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

সারা দেশে কতগুলো অবৈধ অস্ত্র রয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে তার সঠিক তথ্য নেই। তবে পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) হালনাগাদ অবৈধ অস্ত্রের তথ্যভান্ডার ফায়ার আর্মস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (এফএএমএস) সূত্র থেকে জানা যায়, দেশে বৈধ আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে ৪৪ হাজার ১০৪ টি। এরমধ্যে ৪০ হাজার ৭৭৭ টি অস্ত্র বিভিন্ন ব্যক্তির নামে নিবন্ধিত।

গত তিন বছরে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) ২ হাজার ৪০৭টি অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করেছে। র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার এক তথ্য মতে, ২০২১ সালে ৮৪৬ টি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। পরের বছর উদ্ধার করা হয়, এক হাজার ৩৯৪ টি। আর চলতি বছরের এ পর্যন্ত ১৬৭ টি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। এসব অস্ত্র উদ্ধারের মামলায় র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার হয়েছেন এক হাজার ৫৯৫ জন।

বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সীমান্তে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করে আসছে। বিজিবি’র সংশ্লিষ্ট তথ্য মতে, গত ১০ বছরে এসএমজি একটি, রাইফেল পাঁচটি, রিভলবার ৫৮টি, পিস্তল ৫৫৪টি, বন্দুক ৬৪৬টি, গোলাবারুদ ১৮ হাজার ৪৭০টি, ম্যাগাজিন ৪৯৬টি, আর্টিলারি, মর্টার, রকেট শেল ৯৪টি, বোমা ১৩৭টি, ককটেল ২৭১টি, গান পাউডার ১ হাজার ২৮ কেজি উদ্ধার হয়েছে। মালিক ও মালিকবিহীন অবৈধ এসব অস্ত্র-গোলাবারুদ উদ্ধার করতে গিয়ে দেশের বিভিন্ন থানায় সাত শতাধিক মামলা করেছে বিজিবি। এসব মামলায় ২২০ জন আসামিকে আটক করে থানায় হস্তান্তর করেছে তারা।