এখন চলছে ফলের মৌসুম। ফলের দোকানে, রাস্তার ধারে থরে থরে সাজানো আম, কাঁঠাল, লিচু, আনারস, তরমুজসহ নানা রকম রসালো ফল। গরমের মধ্যে স্বস্তি ও পুষ্টি পেতে এসব রসালো ফল দেদার কিনছেন মানুষ। কিন্তু একবারও কি ভেবে দেখেছেন, ফলের নামে আমরা এসব কী খাচ্ছি? এসব ফলে কি কোনো পুষ্টিগুণ আছে?
খাদ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মৌসুমি ফলের উৎপাদন থেকে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত ক্ষতিকর কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয়। তবে ফলে কোনো ফরমালিন ব্যবহার করা হয় না। ফলমূল টাটকা রাখতে ফরমালিন কার্যকরী নয়। ফরমালিন শুধুমাত্র প্রাণীজ প্রোটিনের ওপর কার্যকরী। ২০১৫ সালে সরকার ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইন করে এর ব্যবহার ও আমদানি পুরোপুরি নিষিদ্ধ করে দেয়। ক্ষতিকর কেমিক্যাল মিশ্রিত ফল খেলে শরীরের কোনো ক্ষতি হয় না। তবে কেমিক্যাল মিশ্রনের কারণে ফলের পুষ্টিগুণ নষ্ট হয়ে যায়। ফলে এসব ফল খেয়ে শরীরের কোনো উপকার হয় না।
দেশে ২০১৩ সালে খাদ্য সংরক্ষণে কোনো অনুমোদনহীন কেমিক্যাল ব্যবহার করলে পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং ২০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান তৈরি হয়। কিন্তু ফলমূলে কোনো ক্ষতিকর কেমিক্যাল আছে কিনা তা পরীক্ষা করার জন্য বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের কোনো রাসায়নিক ল্যাব নেই। প্রতিষ্ঠানটি বাজার থেকে স্যাম্পল সংগ্রহ করে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের ল্যাবে কিংবা সায়েন্স ল্যাবে পাঠিয়ে পরীক্ষা করে থাকে। ঢাকায় রাসায়নিক ল্যাব থাকলেও চট্টগ্রামে নেই। নিজস্ব ল্যাব না থাকায় বাজারে অভিযানও পরিচালনা করতে পারছে না সংস্থাটি। ফলে এই সুযোগে ব্যবসায়ীরা দেদারসে কেমিক্যাল মিশ্রিত ফল বিক্রি করছেন। ক্রেতারা সরল বিশ্বাসে বাড়তি পুষ্টির আশায় কেমিক্যোল মিশ্রিত মেশানো ফল কিনে প্রতারিত হচ্ছেন। ফল ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নিতে পারছে না নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ!
জানতে চাইলে বাংলাদেশের নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য (খাদ্যভোগ ও ভোক্তা অধিকার) মো. রেজাউল করিম দৈনিক দেশ বর্তমানকে বলেন, ‘আমাদের দেশের মানুষ মনে করেন যে, ফলমূলে ফরমালিন দেওয়া হয়। ফরমালিনের কারণে ফল দেরিতে পচে। মানুষের এই ধারণার কোনো ভিত্তি নেই। কারণ ফলমূলে ফরমালিন ব্যবহার হয় না। শুধুমাত্র প্রোটিন জাতীয় খাবারে ফরমালিন ব্যবহার করা হয়। তবে কিছু ফলে ফরমালিন পাওয়া যায়। কারণ, তা প্রাকৃতিকভাবে উৎপন্ন হয়। কিন্তু প্রাকৃতিকভাবে উৎপন্ন ফরমালিন মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর নয়।’
প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ব্যবসায়ীরা ফলমূলে ইথোফেন-কার্বাইডসহ আরও বিভিন্ন প্রকারের ক্ষতিকর কেমিক্যাল ব্যবহার করেন। তবে কেমিক্যাল মিশ্রিত ফল স্বাস্থের জন্য ক্ষতিকর না। কারণ এসব কেমিক্যাল ফলের ভেতরে প্রবেশ করে না। কিন্তু কেমিক্যালের কারণে ফলের পুষ্টিগুণ নষ্ট হয়ে যায়।’
ফলে ক্ষতিকর কেমিক্যাল মেশানো ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না-এ প্রশ্নের জবাবে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘ব্যবসায়ীরা যে ফলমূলে কেমিক্যাল মেশায় সেটা তো আমরা তাদের হাতেনাতে ধরতে পারি না। আগে তো স্যাম্পল পরীক্ষা করে নিশ্চিত হতে হবে। আর আমাদের কাছে ফল পরীক্ষা করার ল্যাবও নেই। আমরা অন্য ল্যাবে গিয়ে স্যাম্পল পরীক্ষা করে আনি। আসলে ব্যবসায়ীরা আমাদের দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছে।’
ফল ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, লিচু ও আম বাগানেই কেমিক্যাল মিশিয়ে সরবরাহ করা হয়। কলার কাঁদি কাটা থেকে বাজারে আনা পর্যন্ত দেওয়া হয় কার্বাইড। আনারসের দ্রুত বর্ধন ও পাকানোর জন্য ব্যবহার করা হয় হরমোনাল রাসায়নিক। স্বাভাবিকভাবে আনারস পরিপক্ব হতে লাগে তিন মাস। কিন্তু অতিমাত্রায় কীটনাশক ব্যবহার করার ফলে দেড় মাসেই আনারস পরিপক্ব রূপ ধারণ করে। তরমুজের রং দেখানোর জন্য ব্যবহার করা হয় লাল রং ও স্যাকারিন। তরমুজের বোঁটার মাধ্যমে এসব কেমিক্যাল সিরিঞ্জ দিয়ে ভেতরে ঢোকানো হয়।
দেশের মৌসুমী ফল ছাড়াও বাজারে বিদেশ থেকে আমদানি করা আপেল, আঙুর, মাল্টা, ডালিম, নাশপাতিসহ নানা রকমের ফলেও কেমিক্যাল মেশানো থাকে।
জানা গেছে, দেশে বেশিরভাগ ফল আসে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, আফ্রিকা, ব্রাজিল, পাকিস্তান, ভারত ও মিশর থেকে। এসব দেশ থেকে কন্টেইনারে করে সাগর ও নদীপথে তা আনা হয় চট্টগ্রাম বন্দরে। কিন্তু সেখানে ফলের গুণগত মান পরীক্ষা করার কোনো রাসায়নিক ল্যাব নেই। এতে নির্বিঘ্নে অনিরাপদ ফলমূল দেশে প্রবেশ করছে।
জানা গেছে, দেশের বাইরে থেকে আসা ফলমূল বাজারে যেতে সময় লাগে অন্তত দুই থেকে তিনমাস। কন্টেইনারে করে আসা এসব ফল সেখান থেকে বের করে খোলা অবস্থায় রাখলে দুই থেকে তিন দিনের বেশি থাকবে না। তাই আমদানিকারকরা এসব ফল কেমিক্যাল মিশ্রিত পানির মধ্যে চুবিয়ে কার্টনে ভরে বাজারজাত করে। বাজারে পৌঁছার দু’একদিনের মধ্যে এসব ফল বিক্রি করে ফেলে তারা।
চট্টগ্রাম নগরীর বিআরটিসি মোড়ে ফলমন্ডিতে ফলের আড়ত এবং দোকানের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৩শ’। প্রায় সারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকেই হরেক রকমের ফলের আগমণ ঘটে এই ফলমন্ডিতে। এমন কোনো ফল নেই এখানে পাওয়া যায় না। এই ফলমন্ডি থেকে সমগ্র চট্টগ্রাম ও আশেপাশের জেলায় ফলের সরবরাহ হয়। এখানে দৈনিক ১০-১৫ কোটি টাকা হাতবদল হয়।
ফলমন্ডির আম ব্যবসায়ী রুহুল আমিন বলেন, ‘বেশির ভাগ ফলেই কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয়। কেমিক্যাল ব্যবহার করা না হলে কীভাবে দিনের পর দিন ভালো থাকবে। শুকনা বা পচা ফল কেউ কিনবে না, তাই ফলে কেমিক্যাল মেশানো হয়। এগুলো গোপনে ব্যবহার করা হয়। যারা খায় তারাও জানে।’