চট্টগ্রামে বর্ধিত গৃহকর বাতিলে আইনি লড়াইয়ের প্রস্তুতি

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) ‘বর্ধিত গৃহকর’ বাতিলের দাবিতে রাজপথ ছেড়ে এবার হাইকোর্টের দ্বারস্থ হচ্ছে করদাতা সুরক্ষা পরিষদ। সংগঠনটি হাইকোর্টে রিটের প্রস্তুতি নিচ্ছে। আগামী জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে তারা রিট আবেদন করতে পারে। করদাতা সুরক্ষা পরিষদের সভাপতি নুরুল আবছার চৌধুরী দৈনিক দেশ বর্তমানকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

করদাতা সুরক্ষা পরিষদের আইনজীবী নাম প্রকাশ না করার শর্তে দৈনিক দেশ বর্তমানকে বলেন, ‘রিটের প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন। আগামী জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে আমরা রিট করার প্রস্তুতি নিচ্ছি। আশা করছি, রিট হলে করদাতা সুরক্ষা পরিষদের পক্ষে একটা ভালো রেজাল্ট আসবে। কারণ চসিকের বর্ধিত গৃহকর বাতিলের জন্য করদাতা সুরক্ষা পরিষদের দাবিগুলো আইনগত দিক থেকে খুবই যুক্তিসঙ্গত।’

গত ছয় বছর ধরে চট্টগ্রামে সিটি করপোরেশনের হোল্ডিং ট্যাক্সের (গৃহকর) হার নির্ধারণ নিয়ে বিতর্ক চলে আসছে। সিটি করপোরেশন স্থাপনার ভাড়ার ভিত্তিতে গৃহকর আদায় করা নিয়ে এই বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। করদাতা সুরক্ষা পরিষদের অভিযোগ, চসিক ভাড়ার ভিত্তিতে ‘অতিরিক্ত’ গৃহকর আদায় করছে। স্থাপনার আয়তনের ভিত্তিতে গৃহকর আদায়ের দাবি জানিয়ে আসছে সংগঠনটি। চসিকের ‘বর্ধিত গৃহকর’ বাতিলের দাবিতে গত ছয় বছর ধরে বিভিন্ন প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেছে তারা।

সর্বশেষ গত ১৫ মার্চ করদাতা সুরক্ষা পরিষদের নগর ভবন ঘেরাও কর্মসূচি পুলিশি বাধায় পÐ হয়ে যায়। সেদিন করদাতা সুরক্ষা পরিষদের মিছিলে মেয়রের অনুসারী নগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতাকর্মীরা হামলা চালায়। এতে একজন রক্তাক্ত হয়। এ ছাড়া আরও ৫ জন আহত হয়। পুলিশের উপস্থিতিতে তারা আমাদের ওপর হামলা চালায়।’ ওই কর্মসূচি পন্ড হলেও দাবি আদায়ে অনড় অবস্থানে রয়েছে করদাতা সুরক্ষা পরিষদ।

জানতে চাইলে করদাতা সুরক্ষা পরিষদের সভাপতি নুরুল আবছার চৌধুরী দৈনিক দেশ বর্তমানকে বলেন, ‘বর্ধিত গৃহকর বাতিল করতে আমরা এতোদিন শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করেছি। কিন্তু ১৫ মার্চ আমাদের নগর ভবন ঘেরা কর্মসূচিতে পুলিশের উপস্থিতিতে মেয়রের গুন্ডা বাহিনী অতর্কিত হামলা চালিয়েছে। আমাদের অপরাধটা কী? ৫ টাকার ট্যাক্স ১০০ টাকা হওয়ার কারণে আমরা আন্দোলনে নেমেছি। নগরবাসী আমাদের এই দাবির সাথে একাত্মতা জানিয়েছে। কিন্তু সিটি মেয়র আমাদের সঙ্গে গুন্ডামি করছে। একজন মেয়র কীভাবে এমন আচরণ করতে পারেন?’

প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘রাজপথের আন্দোলনে আমাদের দাবি ফয়সালা না হওয়ায় আমরা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হচ্ছি। আশা করছি, হাইকোর্টে আমরা ন্যায় বিচার পাবো।’

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে গৃহকর নিয়ে বিতর্কের শুরু হয় ২০১৬ সালে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ভাড়ার ভিত্তিতে পঞ্চবার্ষিকী গৃহকর পুনর্মূল্যায়ন শুরু করেন তৎকালীন মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন। আগে স্থাপনার আয়তনের ভিত্তিতে গৃহকর নেওয়া হতো। ভাড়ার ভিত্তিতে পুনর্মূল্যায়নের পর গৃহকর আগের তুলনায় ৩ থেকে ১০ গুণ বেড়ে যাওয়ায় আন্দোলন শুরু হয়। ‘চট্টগ্রাম করদাতা সুরক্ষা পরিষদ’ গঠন করে আন্দোলনে নামেন সাবেক মেয়র (বর্তমানে প্রয়াত) এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী।

আন্দোলনের মুখে ২০১৭ সালের ১০ ডিসেম্বর গৃহকর পুনর্মূল্যায়ন কার্যক্রম স্থগিত রাখার নির্দেশ দেয় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। গত বছরের ৩ জানুয়ারি সেই স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেন বর্তমান মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী। মেয়র রেজাউলের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের ১৮ জানুয়ারি এই স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে নেয় মন্ত্রণালয়। এ নিয়ে মন্ত্রণালয় একটি চিঠি দেয় চসিককে। সেই চিঠিতে বলা হয়, পাঁচ বছর পরপর গৃহকর পুনর্মূল্যায়নের এখতিয়ার সিটি করপোরেশনকে দেওয়া হয়েছে।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার পর গত বছরের জুলাই থেকে সিটি করপোরেশন স্থাপনার ভাড়ার ভিত্তিতে পঞ্চবার্ষিকী গৃহকর পুনর্মূল্যায়ন শুরু করে। এ নিয়ে নগরবাসীর মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। এর ফলে ছয় বছর পর একই দাবিতে আন্দোলনে নামে ‘চট্টগ্রাম করদাতা সুরক্ষা পরিষদ’। সংগঠনটি গত বছরের সেপ্টেম্বর মাস থেকে নগরীর বিভিন্ন স্থানে সমাবেশ ও গণমিছিল কর্মসূচি পালন করে আসছে। তাদের বক্তব্য- ‘গলাকাটা হোল্ডিং ট্যাক্স আইন বাতিল করো/ দৈর্ঘ্য-প্রস্থ গুণ করো তার ওপর কর ধরো।’

গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর নগরীর মাদারবাড়িতে এক সমাবেশে করদাতা সুরক্ষা পরিষদের সভাপতি ও ২৯ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সহসভাপতি নুরুল আবছার চৌধুরী চসিক মেয়রকে ‘গুন্ডা’ সম্বোধন করে নগর ছাড়ার হুমকি দেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নুরুল আবছারের এই বক্তব্য ভাইরাল হলে মেয়রের লোকজন ক্ষুব্ধ হন। আবছার চৌধুরীর বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করা হয়। পাশাপাশি নগরীতে প্রতিবাদ সমাবেশ করেন চসিকের কাউন্সিলর ও সিবিএ নেতারা। এ ছাড়া মেয়রের অনুসারী নগর যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতাকর্মীরাও বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেন। অপরদিকে করদাতা সুরক্ষা পরিষদও পাল্টা সমাবেশ করে।

উভয়পক্ষ পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি পালন করলে তখন বন্দরনগরী উত্তপ্ত হয়ে উঠে। ৫ মাস পর গত ১৫ মার্চ করদাতা সুরক্ষা পরিষদের নগর ভবন ঘেরাও কর্মসূচি নিয়ে উত্তপ্ত হয়ে উঠে বন্দরনগরী।

চট্টগ্রাম করদাতা সুরক্ষা পরিষদের সভাপতি নুরুল আবছার চৌধুরী দেশ বর্তমানকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন বাড়িভাড়ার ওপর ভিত্তি ধরে হোল্ডিং ট্যাক্স নির্ধারণ করছে। ভাড়ার ভিত্তিতে কর আদায় করায় ১৫ থেকে ২০ গুণ পর্যন্ত বেড়েছে। অথচ দেশের বাকি ১১টি সিটি করপোরেশনে হোল্ডিং ট্যাক্স স্থাপনার ভাড়ার ভিত্তিতে নির্ধারিত হয় না। স্থাপনার আয়তনের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়।’

চসিক মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী দেশ বর্তমানকে বলেন, ‘দেশের অন্যান্য সিটি করপোরেশনে কত শতাংশ গৃহকর আদায় হয়, তা কি তারা (করদাতা সুরক্ষা পরিষদ) জানে? বরিশাল ও রাজশাহীতে ২৭ শতাংশ, রংপুর, সিলেট ও কুমিল্লায় ২০ শতাংশ এবং নারায়ণগঞ্জে ১৯ শতাংশ কর আদায় হয়। অথচ চট্টগ্রামে ২৫টি ওয়ার্ডে ১৭ শতাংশ ও ১৬টি ওয়ার্ডে ১৪ শতাংশ কর আদায় করা হয়।’