‘বাপ-দাদার পেশা ছাড়তে পারি না, কিন্তু অবস্থাও বদলায় না’
বংশ পরমপরায় দারিদ্র্যের শেকলে বাঁধা উপকূলের মাঝি-মাল্লাদের জীবন। গভীর সমুদ্রে দস্যু আর প্রাকৃতিক দুর্যোগের আতঙ্ক কাটিয়ে ঘাটে ফিরেই পড়তে হয় দাদনদারদের রোষানলে। হিসাব বুঝিয়ে দিতে হয় কড়ায়-গন্ডায়। অনেকটা শূন্য হাতেই ফিরতে হয় ঘরে। দিন আনা দিন খাওয়া মাঝি-মাল্লাদের পরিবারের অবস্থা বদলায় না, এক টুকরো সম্পদ গড়তে পারেন না তারা।
চট্টগ্রামের আনোয়ারার উপকূল ঘুরে মাঝি-মাল্লাদের জীবনের এসব তথ্য অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
উপজেলার রায়পুর, জুঁইদন্ডী ও বারশত ইউনিয়নের মানুষের প্রধান পেশা জেলে কাজ করা। সবচেয়ে বেশি গভীর সমুদ্রে মৎস আহরণের কাজ করে থাকেন রায়পুর ইউনিয়নের মানুষ। এ ইউয়িনের শতকরা ৮০% লোক জেলে কাজ করে থাকেন।
সরেজমিনে রায়পুর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা- সরেঙ্গা, ফকিরহাট, ঘাটকুল, নজুমিয়ার ঘাট, বার আউলিয়ার ঘাট, বাঁচা মিয়ার ঘাট, উঠান মাঝির ঘাট, চিপাতলী ঘাট ও গলাকাটার ঘাট প্রত্যেকের কণ্ঠেই যেন আক্ষেপের সুর।
আজ শনিবার (২০ মে) থেকে আগামী ২৩ জুলাই পর্যন্ত মোট ৬৫ দিন সামুদ্রিক মাছের সুষ্ঠু প্রজনন, উৎপাদন ও মজুদ সংরক্ষণ এবং মৎস্য আহরণের জন্য বঙ্গোপসাগরে সকল মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। যার ফলে মোখার ভয়ে বিভিন্ন খালে- ডাঙায় নোঙর করা লাইটার জাহাজগুলো একই স্থানে নোঙর করে রেখে দিয়েছে জেলেরা। ঘূর্ণিঝড়ের ফলে তড়িঘড়ি করে মাছ ধরার কার্যক্রম বন্ধ এবং পরবর্তী সময়ে নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ায় বিপাকে পড়েছে উপকূলীয় এলাকার জেলেরা।

আনিছুর রহমান কোম্পানী (৩২) নামের এক ফিশিং ট্রলার মালিক জানান, বংশ পরামপরায় তাদের মৎস আহরণের পেশা। বাপ-দাদা শুরু করেছি এই পেশা, এখন একটি ফিশিং ট্রলারের মালিক। দ্রব্যমূল্যের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রতিনিয়ত লোকসানের সম্মুখীন হচ্ছেন তিনি। তাই পূর্ব পুরুষের পেশা আর বেশিদিন ধরে রাখতে পারবেন না বলে আক্ষেপ প্রকাশ করেন তিনি।
শাহ আলম (মাঝি) (৬০) নামের এক জেলে বলেন, বাপ-দাদার পেশা ছাড়তে পারি না, কিন্তু অবস্থাও বদলায় না। আজ থেকে আগামী ৬৫ দিন মাছ ধরা বন্ধ। বউ-বাচ্চা নিয়ে কোথায় যাবো বুঝতে পারছি না। আমরা মৎস আহরণ ছাড়া অন্য কোনো কাজ জানি না। যদি বন্ধের আগে মাছ পেতাম তাহলে এই চিন্তা করতে হতো না।
উঠান মাঝির ঘাট কমিটির সভাপতি নাছির উদ্দীন বলেন, বন্ধের আগে যখন সব কিছু গুছিয়ে নেওয়ার সময় তখনই ঘূর্ণিঝড় এসেছে। যার কারণে সব এলোমেলো রয়ে গেছে। ঘূর্ণিঝড়ের কবল থেকে রক্ষা পেতে যে যেখানে পেরেছে বোট সেখানে নোঙর করে রেখেছে। ঘূর্ণিঝড়ের পরপরই বন্ধ শুরু হয়ে গেল। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে সামনে দীর্ঘদিনের বন্ধে জেলেদের কষ্টের সীমা থাকবে না।
উপজেলার সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মো. রাশিদুল হক বলেন, ২০ মে থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত মোট ৬৫ দিন মাছ ধরা বন্ধ। এই নির্দেশনা বাস্তবায়নে বিভিন্ন এলাকায় ব্যানার টাঙগানো, মাইকিং, অবহিতকরণ সভা, লিফলেট বিতরণ, পোস্টার লাগানোসহ বিভিন্ন সচেতনমূলক কর্মকাণ্ড করে যাচ্ছি। মাছ ধরার এই বন্ধে আনোয়ারার নিবন্ধিত ৩ হাজার ৫৮৯ জন জেলের মাঝে কয়েক ধাপে ৮৩ কেজি চাল বিতরণ করবো।