ইউরোপ-আমেরিকায় রফতানি হ্রাস, পোশাক খাতে উদ্বেগ

বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দা

বিপর্যয়ের মুখে পোশাক খাত। বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দার কারণে বিলাসিতা ছাড়ছেন ভোক্তারা। কমিয়ে দিয়েছেন খরচ। ইউরোপ-আমেরিকার বায়াররা ক্রয়াদেশ কমিয়ে দেওয়ায় ক্রমশ কমছে পোশাক রফতানি। যার কারণে রফতানি আয়ের বড় খাত পোশাক শিল্পের নেতিবাচক ধারার বিরূপ প্রভাব পড়েছে সামগ্রিক রফতানি চিত্রে।

চলতি বছরের মার্চ-এপ্রিলে পোশাক রফতানি পুরোপুরি নেতিবাচক ধারায় ছিল। মার্চ মাসে রফতানি কমেছে ১.০৪ শতাংশ এবং এপ্রিলে কমেছে ১৫.৪৮ শতাংশ। আর এতে উদ্বিগ্ন পোশাক মালিকেরা। পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যেতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করছে পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)। নানামুখী চাপের কারণে সংকট উত্তরণে সরকারি সহায়তা অব্যাহত রাখার কোনো বিকল্প নেই বলে জানিয়েছে বিজিএমইএ।

জানা যায়, বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের বড় বাজার ইউরোপ-আমেরিকাকেন্দ্রিক। একক দেশ হিসেবে সবচেয়ে বড় বাজার হলো যুক্তরাষ্ট্র। এর পরে রয়েছে জার্মানি। বিজিএমইএর তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরের (২০২২-২০২৩) প্রথম নয় মাস (জুলাই-মার্চ) দেশ দুটিতে পোশাক রফতানি কমেছে ৪ দশমিক ৬৩ শতাংশ। প্রথম নয় মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানিতে তৈরি পোশাক রফতানির অর্থমূল্য ছিল ১ হাজার ১৪০ কোটি ৭৩ লাখ ৯০ হাজার ডলার।গত অর্থবছরের একই সময়ে রফতানির অর্থমূল্য ছিল ১ হাজার ১৯৬ কোটি ১৩ লাখ ২০ হাজার ডলার। এ হিসেবে দুই দেশ মিলিয়ে পোশাক রফতানি কমেছে ৪ দশমিক ৬৩ শতাংশ।

বিজিএমইএর পরিসংখ্যান বলছে, চলমান অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রফতানির অর্থমূল্য ছিল ৬২৫ কোটি ৯৫ লাখ ৬০ হাজার ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে (জুলাই-মার্চ) রফতানির মূল্য ছিল ৬৫৮ কোটি ৯৯ লাখ ডলার। সে হিসেবে গত অর্থবছরের তুলনায় রফতানি কমেছে ৫ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ। জার্মানির বাজারেও নেতিবাচক প্রবণতা। প্রথম নয় মাসে জার্মানিতে পোশাক রফতানি হয়েছে ৫১৪ কোটি ৭৮ লাখ ৩০ হাজার ডলারের। গত অর্থবছরের একই সময়ে (প্রথম নয় মাস) পোশাক রফতানির পরিমাণ ৫৩৭ কোটি ১৪ লাখ ২০ হাজার ডলারের। অর্থাৎ জার্মানিতে কমেছে ৪ দশমিক ১৬ শতাংশ।এছাড়া গত এপ্রিল মাসে পোশাক রফতানি কমেছে ১৫ দশমিক ৪৮ শতাংশ।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, আন্তর্জাতিক পরিমÐলে পোশাক শিল্পের নতুন নতুন বাজার সৃষ্টি হচ্ছে, তবে বৃহৎ আকারের ক্রয়াদেশ জুটছে না। পোশাকের বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্র এবং জার্মানিতে কমেছে ক্রয়াদেশ। বাজারের চাহিদা বিবেচনায় দেশগুলোর শীর্ষ পোশাক সরবরাহকারী বায়ার ওয়াল মার্ট, এইচঅ্যান্ডএম, প্রাইমার্ক, সিঅ্যান্ডএ, গ্যাপ ও ভিএফ’র মতো বড় বড় কোম্পানিগুলোর ক্রয়াদেশ একেবারেই কম। এর প্রভাব পড়েছে দেশ দুটিতে পোশাক রফতানির ক্ষেত্রে।

বিজিএমএই সূত্রে জানা যায়, প্রতিবছর এইচ অ্যান্ড এম প্রায় ৪ বিলিয়ন (৪০০ কোটি) ডলারের পোশাক কেনে বাংলাদেশ থেকে। এছাড়া ওয়েল মার্টের ক্রয়াদেশ ২ বিলিয়ন (২০০ কোটি) ডলারের ছাড়িয়ে যায়। এসব বড় বড় ক্রেতা প্রতিষ্ঠানে পোশাকের বিক্রয় কমে গেছে। যার প্রভাব পড়েছে দেশের পোশাক রফতানিতে।

কোভিড মহামারির প্রভাব কাটিয়ে পোশাক খাত ঘুরে দাঁড়ালেও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সবকিছু ওলট-পালট হয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের ভোক্তারা বিলাসিতা ছেড়ে খাদ্য ও জ্বালানির মতো অতি জরুরি পণ্যের চাহিদা মেটাতে সবচেয়ে বেশি মনোযোগী হয়ে পড়েছেন। তারা কমিয়ে দিয়েছেন পোশাক কেনাকাটা। যার কারণে বড় বড় বায়াররা তাদের ক্রয় কৌশলে এনেছে পরিবর্তন। ফলে কমেছে পোশাক রফতানি।

তবে বিশে^র দুই বড় বাজারে পোশাক রফতানি কমলেও জাপান, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মেক্সিকো, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, দক্ষিণ আফ্রিকা, নিউজিল্যান্ড ও ব্রাজিলের অপ্রচলিত বাজারে পোশাক রফতানি ছিলো উর্দ্ধমুখী। চলতি অর্থবছরের জুলাই-মার্চে জাপানে পোশাক রফতানি হয়েছে ১২২ কোটি ১৭ লাখ ৪০ হাজার ডলারের। গত অর্থবছরের একই সময়ে রফতানি হয়েছিল ৮৪ কোটি ৯৬ লাখ ৪০ হাজার ডলারের। ভারতে প্রথম নয় মাসে রফতানি হয়েছে ৮৩ কোটি ৫ লাখ ১০ হাজার ডলারের। গত অর্থবছরের একই সময়ে রফতানি হয় ৫২ কোটি ৪৩ লাখ ৯০ হাজার ডলারের। অন্যান্য দেশগুলোতেও বেড়েছে।

বিজিএমইএর প্রথম সহসভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম দেশ বর্তমানকে বলেন, বিশে^র বড় বড় কোম্পানিগুলো ক্রয়াদেশ কমিয়ে দেওয়ায় মুলত রফতানি কমেছে। তাদের কাছে পোশাক এখন বিলাসিতার পণ্য। আগে যেখানে একজন ক্রেতা ৫-৬টি পোশাক কিনতো সেখানে তারা এখন কিনছে একটি। তারা এখন নিত্য প্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের চাহিদা পূরণে বেশি মনোযোগী। তিনি বলেন, বর্তমানে গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্য অনেক বেড়েছে। এ অবস্থায় প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে আমাদের প্রয়োজন নীতি সহায়তা। পাশাপাশি এনবিআর ও কাস্টমসের প্রিিক্রয়াগুলো আরও সহজিকরণ প্রয়োজন।