মালিকদের দাবি মেনেই ফের চিনির দাম বাড়াল সরকার

চিনির উল্লম্পন চলছেই। আরও এক দফা বাড়লো চিনির দাম। চলতি বছরের শুরু থেকেই চলছে চিনির বাজারে উত্তাপ। এই উত্তাপের মধ্যে সরকার চিনির দাম বাড়ানোর ঘোষণা দিলো। চিনি পরিশোধনকারী মালিকদের সংগঠন-বাংলাদেশ সুগার রিফাইনার্স অ্যাসোসিয়েশনের দাবির প্রেক্ষিতে মুলত বাড়ানো হলো চিনির দাম। এপ্রিলে কেজি প্রতি চার টাকা কমিয়ে চলতি মাসে বাড়ানো হলো কেজি প্রতি ১৬ টাকা।

আগামী ৩১ মে চিনি আমদানিতে শুল্ক ছাড়ের মেয়াদ শেষ হলেও সরকার নতুন করে মেয়াদ বৃদ্ধির কথা ভাবছে। চিনির দাম বাড়তে থাকায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) শুল্ক হার আরও কমাতে সুপারিশ করা হবে। বাণিজ্য সচিব দিয়েছেন এমন আভাস।

চিনির দাম বৃদ্ধির জন্য ঘুরেফিরে বলা হচ্ছে একই কথা। আন্তর্জাতিক বাজারে চিনির দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি বেড়েছে ডলারের দাম। বেড়েছে পরিবহন খরচ। আমদানিকারকরা উচ্চ মূল্য এবং ডলার সংকটের কারণে বাড়তি দরে চিনি আমদানিতে এগিয়ে না আসায় বাজারে কমে গেছে সরবরাহ। যার কারণেই দামে প্রভাব পড়ছে।

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়,  বৃহস্পতিবার (১১ মে) থেকে চিনির দাম আরেক দফা বেড়েছে। প্রতি কেজি চিনির দাম ১৬ টাকা বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে সরকার। এখন থেকে খোলা চিনি ১২০ এবং প্যাকেটজাত চিনি ১২৫ টাকা বিক্রয়মূল্য নির্ধারণ করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এর আগের মূল্য ছিলো খোলা চিনি ১০৪ টাকা এবং প্যাকেটজাত চিনি ১০৯ টাকা। এছাড়া প্রতিকেজি পরিশোধিত খোলা চিনির মিলগেট মূল্য ১১৫ টাকা ও পরিবেশক মূল্য ১১৭ টাকা নির্ধারণ করেছে সরকার। আর প্রতিকেজি পরিশোধিত প্যাকেটজাত চিনির মিলগেট মূল্য ১১৯ টাকা ও পরিবেশক মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১২১ টাকা।

সূত্র মতে, চিনি মালিকদের সংগঠন-বাংলাদেশ সুগার রিফাইনার্স অ্যাসোসিয়েশন গত ১৭ এপ্রিল ও ২ মে চিনির দাম বাড়ানোর জন্য বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনকে (বিটিটিসি)চিঠি দেয়। উক্ত চিঠির প্রেক্ষিতে বিটিটিসি চিনির মূল্য ও সরবরাহ পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে। পর্যালোচনার ক্ষেত্রে এলসি খোলা, ইনবন্ড মূল্য, আউটবন্ড মূল্য ও অপরিশোধিত চিনির আন্তর্জাতিক বাজারদর বিবেচনায় নিয়ে নতুন এ দাম সুপারিশ করেছে বিটিটিসি। বিটিটিসি প্রদত্ত সুপারিশের প্রেক্ষিতে সরকার চিনির দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়। বৃহস্পতিবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ন সচিব শামীমা আকতার স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। ব্যবসায়ীদের অপর একটি সংগঠন সয়াবিনের দাম দুইশত টাকার ওপরে নির্ধারণের জন্যও পৃথক চিঠি দিয়েছে বিটিটিসিকে।

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, গত বছরের সেপ্টেম্বরে সরকার প্রতি কেজি পরিশোধিত খোলা চিনির খুচরা মূল্য নির্ধারণ করে ৮৪ টাকা এবং প্যাকেটজাত চিনি ৮৯ টাকা। পরের মাসে খোলা চিনি কেজি প্রতি ৯০ টাকা এবং প্যাকেটজাত চিনি ৯৫ টাকা। নভেম্বরে খোলা চিনি ১০৭ টাকা এবং প্যাকেটজাত চিনি ১১২ টাকা। নভেম্বরের মাসের এ দাম কার্যকর হয় চলতি বছরের ফেব্রæয়ারিতে। ৬ এপ্রিল তিন টাকা কমিয়ে কেজি প্রতি ১০৪ টাকা ও প্যাকেটজাত চিনির দাম ১০৯ টাকা নির্ধারণ করে দেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, এ দাম কার্যকর হয় ৮ এপ্রিল থেকে।মূলত রমজানকে সামনে রেখে সরকার তিন টাকা কমালেও এক মাসের ব্যবধানে কেজি প্রতি বাড়িয়ে দিয়েছে ১৬ টাকা।

চিনির দামের লাগাম টেনে ধরতে সরকার চিনি আমদানিতে শুল্ক হার কমালেও এতে ভোক্তা পর্যায়ে কোনো ফায়দা হচ্ছে না। শুল্ক হার কমানোর সুবিধা নিচ্ছে আমদানিকারকরা। তারা আন্তর্জাতিক বাজারে দর বৃদ্ধির জন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে অস্থিরতাকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করছেন। সরকার খুচরা ও মিল পর্যায়ে চিনির দাম নির্ধারণ করে দিলেও খোদ চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের পাইকারি বাজারে চিনির বাজারে সরকার নির্ধারিত খুচরা মূল্যের চাইতে বেশি দরে চিনি বিক্রি হচ্ছে। খাতুনগঞ্জে বিভিন্ন পাইকারি দোকানে খোলা চিনি কেজি প্রতি বিক্রি হচ্ছে ১২৭ থেকে ১৩০ টাকা।এসিআই ব্র্যান্ডের প্যাকেটজাত লাল চিনি বিক্রি হচ্ছে ১৪৫ টাকা।

খাতুনগঞ্জের ভোজ্যপণ্যের পাইকারী দোকান মেসার্স সুলতান ট্রেডার্সের মলিক আবুল বশর এবং মল্লিক স্টোরের কর্ণধার উত্তম মল্লিকের সাথে  কথা বলে এই তথ্য পাওয়া গেছে। তবে বেশির ভাগ দোকানে প্যাকেটজাত চিনি নেই।

তারা জানান, পরিবেশকরা চাহিদা মতো চিনি সরবরাহ করছে না। খাতুনগঞ্জ আড়তদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. ইদ্রিছ বলেন, সরবরাহ ও চাহিদার ওপর ভিত্তি করে ভোজ্যপণ্যের বাজার ওঠানামা করে। তবে চিনি ও সয়াবিন তেল পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করছে দেশের শীর্ষস্থানীয় কোম্পানীগুলো। তাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছায় এই দুই পণ্যের দর বৃদ্ধির কারসাজি চলছে।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ফয়েজ উল্লাহ বলেন, বাজার নিয়ন্ত্রণে আমাদের নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। সরকার নির্ধারিত দামে চিনি বিক্রির বিষয়টি গুরত্ব সহকারে দেখা হয়। কোনো ব্যবসায়ীর সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে পণ্য বিক্রির সুযোগ নেই।সরকার নির্ধারিত দরের চেয়ে বেশি দরে পণ্য বিক্রির অভিযোগ পেলে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

বাণিজ্য মন্ত্রী টিপু মুনশি সচিবালয়ে বৃহস্পতিবার (১১ মে) সাংবাদিকদের বলেছেন, আমাদের ৯৯ শতাংশ চিনি আমদানি করতে হয়। গেল ১৫-২০ দিনে বৈশ্বিক বাজারে চিনির দাম টনপ্রতি ৪৫-৫০ ডলার করে বেড়েছে। এটি ঠিক যে, যেটা ঠিক করে দেয়া হয়েছে, তার চেয়ে বেশি দামেও বিক্রি হচ্ছে।

আমরা দেখছি, তাদের (ব্যবসায়ীদের) অবস্থান কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়। আবার চিনি যদি বাজার থেকে উধাও হয়ে যায়, সেটিও একটি সমস্যা। সবকিছু দেখেশুনেই আমরা চেষ্টা করছি বলে জানান তিনি।