বরিশালে হাসনাত পরিবারের দ্বন্দ্বে নৌকা টালমাটাল

আগামী ১২ জুন বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচন। বিএনপিবিহীন এ নির্বাচনে বর্তমান মেয়র সাদিক আবদুল্লাহকে বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগ এবার মনোনয়ন দিয়েছে খোকন সেরনিয়াবাতকে। তিনি বর্তমান মেয়রের চাচা। বরিশালের প্রভাবশালী পরিবার আবুল হাসনাত আবদুল্লাহর ছোট ভাই। অন্যদিকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নেতা মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করিমও সিটি নির্বাচনে মেয়র পদে খোকন সেরনিয়াবাতের সঙ্গে লড়বেন। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মেয়র পদে ভোট করার ঘোষণা দিয়েছেন বিএনপি নেতা আহসান হাবীব কামালের ছেলে কামরুল আহসান রূপন। ভোটের লড়াইয়ে কে থাকছেন, কে থাকছেন না তা নিশ্চিত হতে ২৫ মে পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। ওইদিন মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষদিন।

তবে বরিশাল সিটিতে মেয়র পদে আওয়ামী লীগের প্রার্থী বদলানোর কারণে সেখানে দলটিকে কঠিন পরিস্থিতির মুখে ফেলে দিয়েছে। দলীয় নেতাকর্মীরা দুভাগে বিভক্ত হয়ে আছে। এই বিভক্তি কাটানোর এখন পর্যন্ত কোন উদ্যোগের কথা জানা যায়নি। তবে দু’জনই বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্য হওয়ায় তাঁদের মধ্যে মান-অভিমান ভাঙানোর দায়িত্ব কেন্দ্রীয় নেতারাও নিতে চাইছেন না। এ ক্ষেত্রে দলীয় প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কিংবা পরিবারের অন্য কোনো প্রভাবশালী সদস্যের হস্তক্ষেপের অপেক্ষায় রয়েছেন দলের নীতিনির্ধারকরা। বর্তমানে বিদেশ সফররত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে ফেরার পর এ বিষয়ে দিকনির্দেশনা পাওয়া যাবে বলে মনে করছেন স্থানীয় নেতারা ।

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ও বরিশালের স্থানীয় একাধিক নেতা বলেন, মনোনয়ন বোর্ড নতুন প্রার্থী বেছে নিলেও আবুল হাসনাত ও তার ছেলে সাদিক আবদুল্লাহ তা মেনে নিতে পারেননি। তাই বরিশাল সিটি ভোটে হিসাব-নিকাশ জটিল হয়ে উঠেছে।

বরিশাল জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন নেতা বলেন, মনোনয়ন বদলের পর এখন পর্যন্ত বাবা-ছেলে কেউই বরিশাল যাননি। মনোনয়ন ঘোষণার দিন থেকে তারা ঢাকায় অবস্থান করছেন। শুধু তাই নয়, তাদের অনুসারীদের সঙ্গে লাইভে যুক্ত হলেও সিটি নির্বাচন নিয়ে কাউকে এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কোনো নির্দেশনা দেননি।

এদিকে দলীয় কার্যালয়ে এক মঞ্চে পৃথক সময়ে মে দিবসের দুটি অনুষ্ঠান করেছে আওয়ামী লীগ। একটি সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহর অনুসারী পক্ষ, অন্যটি পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুকের পক্ষ। বরিশাল সদর রোডের সোহেল চত্বরে দুপুর ১২টায় অনুষ্ঠান করেন জাহিদ ফারুক। ওই অনুষ্ঠানে ছিলেন আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থী আবুল খায়ের আবদুল্লাহ সেরনিয়াবাত ওরফে খোকন।

বিকেল ৪টায় একই মঞ্চে সাদিক অনুসারীরা অনুষ্ঠান করে। সেখানে খোকন সেরনিয়াবাতকে উপস্থিত থাকতে দেখা যায়নি। শ্রমিক লীগ অনুষ্ঠানের আয়োজন করলেও মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাদিক আবদুল্লাহর নির্দেশনায় তা হয়েছে বলে দলের স্থানীয় কয়েকজন নেতা জানান।

বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী এক নেতা বলেন, সিটি করপোরেশন নির্বাচন সামনে রেখে মে দিবসের কর্মসূচি পালনে বরিশালে আওয়ামী লীগের রাজনীতি ও মেয়র পদে ভোটে প্রভাবশালী পরিবারের ভূমিকা কী হতে পারে, সবাই টের পাচ্ছে। ২০১৩ সালে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী আহসান হাবীব কামালের মেয়র নির্বাচিত হওয়ার আলোচনা বরিশালে আবার জমে উঠেছে। গুরুত্বপূর্ণ ওই নেতা আরও বলেন, ‘ঘরের দ্বন্দ্ব’ বরিশাল সিটির নির্বাচনকে কোথায় নিয়ে যায়, বলা মুশকিল। এই দ্বন্দ্ব প্রকাশ পেলে নৌকা ডুবে যাওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যাবে। ‘ঘরের ঐক্য’ নিশ্চিত হলে নৌকার জয় সহজ হবে।

মে দিবসের অনুষ্ঠানে দূরত্বটা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মেয়র পদের ভোট নিয়ে হাসনাত পরিবারের বিভক্তি ও মাঠে খোকন সেরনিয়াবাতের একলা অবস্থা পিছিয়ে দিচ্ছে প্রার্থীকে। পারিবারিক এ অবস্থার কারণে আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মীরাও নামতে পারছেন না প্রকাশ্যে। দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও অস্বস্তি কাজ করছে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত সব নেতাকর্মীর মধ্যে।

এ প্রসঙ্গে বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তালুকদার মো. ইউনুস বলেন গণমাধ্যমকে বলেন, বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে মুখে মুখে অনেক কথা হয়। সব সত্যি নয়। তিনি বলেন, পরিবারে সামান্য ঝামেলা হতেই পারে। এগুলো বড় করে দেখার সুযোগ নেই। প্রচারে খোকন সেরনিয়াবাত একলা কেন এ প্রশ্নে মো. ইউনুস বলেন, প্রচারে নামার সুযোগ এখনো হয়নি। মনোনয়নপত্র দাখিল, প্রত্যাহার, বাছাই অনেক প্রক্রিয়া রয়েছে। এগুলো শেষ হলেই সবাই সম্মিলিতভাবে নৌকার পক্ষে মাঠে নামবে। হাসনাত পরিবার অনুসারী হিসেবে পরিচিত এ নেতা বলেন, এ মাসের মাঝামাঝি জেলা আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভা হবে, সেখানে জাতীয় নেতারাও উপস্থিত থাকবেন। তারপর পরিকল্পনা অনুযায়ী সবাই মাঠে নামবেন।

তিনি বলেন, অনেকেই অনেক কথা বলেন, কিন্তু হাসনাত ভাই আমাকে একটা কথা বলেছেন, ‘ইউনুস, ও তো আমার ভাই’। বর্তমান মেয়র সাদিক আবদুল্লাহ তো মেয়র প্রার্থীর বিরুদ্ধে কোনো কথা বলেননি। অপরদিকে খোকনপন্থিদের দাবি, সাদিক নিয়ন্ত্রিত মহানগর আওয়ামী লীগের কমিটিকে তাঁরা বিশ্বাস করতে পারছেন না। প্রচারে নেমে কৌশলে খোকন সেরনিয়াবাতকে হারানো হতে পারে। তাঁরা মহানগর কমিটি ভেঙে দ্রুত আহ্বায়ক কমিটি গঠনের দাবি জানাচ্ছেন। ইসলামী আন্দোলনের দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মোহাম্মদ ফয়জুল করীম প্রার্থী হওয়ার নেপথ্যে সাদিক পরিবারের ষড়যন্ত্র রয়েছে বলে অভিযোগ খোকনপন্থিদের।

মহানগর আওয়ামী লীগ এবং সাদিকের বাবা হাসনাত আবদুল্লাহ নিয়ন্ত্রিত জেলা আওয়ামী লীগের কোনো স্তরের নেতাকর্মীরা খোকনের নির্বাচনী প্রচারে নেই। মহানগর যুবলীগ ছাড়া অপর কোনো অঙ্গ সংগঠনও নেই মেয়র প্রার্থীর পাশে। মহানগর-সদর আসনের সংসদ পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক শামীম এমপির অনুসারীদের নিয়ে নির্বাচনী প্রচার চালাচ্ছেন খোকন।

খোকনের ঘনিষ্ঠজন শহর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মীর আমিন উদ্দিন মোহন সাংবাদিকদের বলেন, হাসনাত পরিবারকে তাঁরা কোনোভাবেই বিশ্বাস করতে পারছেন না। এর আগে বিভিন্ন নির্বাচনে কৌশলে নৌকাকে হারানোর অভিযোগ রয়েছে হাসনাত পরিবারের বিরুদ্ধে। খোকন সেরনিয়াবাত গণ ২৪ এপ্রিল রাতে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সার্বিক বিষয় অবহিত করেছেন। এদিকে দুই পক্ষই পাল্টাপাল্টি কাউন্সিলর প্রার্থী দিচ্ছে। কয়েক মাস আগে সাদিকের উপস্থিতিতে এক অনুষ্ঠানে জেলা ছাত্রলীগের সহসভাপতি সাজ্জাদ সেরনিয়াবাতকে ২০ নম্বর ওয়াডের হবু কাউন্সিলর হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। সাজ্জাদের মতোই মেয়র সাদিকের অনুসারী অন্তত ১০ নেতা এক বছর আগেই হবু কাউন্সিলর হিসেবে নিজেদের ভাবতে শুরু করেন।
জানা গেছে, সাদিক মনোনীত কাউন্সিলর করা প্রার্থীর তালিকাও প্রায় চূড়ান্ত ছিল। সাদিকের মনোনয়ন পাওয়া মানেই জয় নিশ্চিত,পরিবেশটা এমনই ছিল। সাদিক মনোনয়ন না পাওয়ায় সব এলোমেলো হয়ে গেছে। স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে সাদিক অনুসারী কাউন্সিলর প্রার্থীদেরও। এ সুযোগে ওয়ার্ডগুলোতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন সাদিকবিরোধী গ্রুপের সম্ভাব্য প্রার্থীরা। এতে প্রত্যেক ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের ৩ থেকে ৫ জন কাউন্সিলর প্রার্থী হতে মাঠে নেমেছেন বলে জানা গেছে। তবে বিভিন্ন সূত্র নিশ্চিত করেছে, আধিপত্য ধরে রাখতে প্রায় সব ওয়ার্ডে সাদিক অনুসারী কাউন্সিলর প্রার্থী দেওয়া হবে। খোকন সেরনিয়াবাত মেয়র নির্বাচিত হলে তাঁকে চাপে রাখা যাবে এমন ভাবনাও আছে সাদিকপন্থিদের।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফরউল্যাহ বলেন, সময়মতো সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা দেশে ফিরে এলে সিটি নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন জটিলতার অবসান ঘটবে।