রমজানের রেশ কাটতে না কাটতেই আবারও নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার। আমদানি শুল্ক কমিয়ে, ভর্তুকি দিয়ে, মনিটরিং করেও যেন নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না বাজার। সরকার, প্রশাসন ও জনগণকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকা লুট করে নিয়ে যাচ্ছে একটি দুষ্ট ব্যবসায়ী চক্র। মাছ-মাংস, শাক-সবজি, মুরগি-ডিম থেকে শুরু করে সবকিছুই ক্রেতাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে। এরই মাঝে ঘোষণা দিয়ে আরেক দফা বাড়ানো হয়েছে খোলা ও বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম। পাশাপাশি চিনি, পেঁয়াজ, আদা, রসুন, মসলাসহ যাবতীয় পণ্যের দাম কেজিতে ৫০-১০০ টাকা বেড়েছে। খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, দাম আরো বাড়ার সম্ভাবনা আছে। এদিকে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে হাঁসফাঁস করছেন ক্রেতারা।
গতকাল শুক্রবার চট্টগ্রাম নগরীর রিয়াজউদ্দিন বাজার, কাজীর দেউড়ি, বহদ্দারহাট বাজার ঘুরে দেখা গেছে এমন চিত্র। তবে এসময় কিছু কিছু বাজারে দেখা যায়, আগের দামেই বিক্রি হচ্ছে সয়াবিন তেল।
রিয়াজ উদ্দিন বাজারে সিদ্দিক মিয়া নামে একজন খুচরা ব্যবসায়ী জানান, চিনি ও পেঁয়াজের সরবরাহ কম থাকায় দাম কিছুটা বেড়েছে। তবে আগের কেনা থাকায় সয়াবিন এখনও আগের দামেই বিক্রি হচ্ছে। তবে আগামী সপ্তাহ থেকে বোতল এবং খোলা সব তেলই দশ থেকে বার টাকা বেশিতে বিক্রি করতে হবে। এ সময় জিনিসপত্রের দাম আরো বাড়ার সম্ভাবনা আছে বলেও জানান এই ব্যবসায়ী।
নগরীর বহদ্দারহাট মাংসের বাজার ঘুরে দেখা যায়, ফার্মের মুরগি ২৪০-২৫০ টাকা, সোনালী মুরগি ৩৫০-৩৬০ টাকা, দেশি মুরগি ৫৫০-৬০০ টাকা, হাঁস ৭০০-৮০০ টাকা, গরুর মাংস ৮৫০-৯০০ টাকা, খাসির মাংস ৯০০-১০৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। ফার্মের মুরগির ডিম ডজন ১৩০-১৪০ টাকা, হাঁসের ডিম ২০০-২২০ টাকা ও দেশি মুরগির ডিম বিক্রি হচ্ছে ২২০-২৫০ টাকায়। এ সময় কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা গেছে, সাঁজনা কেজিতে ১৬০-১৮০ টাকায়, বরবটি ৮০-১০০ টাকায়, পেঁপে ৬৫-৭০ টাকায়, লতি ৬০-৭০ টাকায়, করলা ৮০-১০০ টাকায়, চিচিঙ্গা ৮০-১০০ টাকায়, কাঁচা মরিচ ১০০-১২০ টাকায়, টমেটো ৩০-৪০ টাকায়, মিষ্টিকুমড়া ৪০-৬০ টাকায়, আলু ৩৫-৪০ টাকায় ও লেবু (এক হালি) ৩৫-৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া সব ধরনের শাকের আঁটি ৩০-৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
সবজি বিক্রেতারা বলছেন, বাজারে সবজির দাম কিছুটা বেড়েছে। এখন সবজির সরবরাহ কম এবং গরমে অনেক সবজি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি বেড়েছে পরিবহন খরচ। সবমিলিয়ে পাইকারি পর্যায়ে বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে সবজি। তাই আমরা যারা খুচরা ব্যবসায়ী তাদের বাধ্য হয়ে বাড়তি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। তবে বাজারে গ্রীষ্মকালীন সবজি এলে দাম কিছুটা কমার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানান তারা।
এ সময় মাছের বাজার ঘুরে দেখা যায়, সব ধরনের মিঠা পানির মাছ কেজিতে ৪০-৮০ টাকা বেড়েছে। রুই মাছ ৩২০-৩৫০ টাকা, কাতাল মাছ ৩০০-৩২০ টাকা, তেলাপিয়া মাছ (আকারভেদে) ২০০-২৬০ টাকা, পাঙ্গাশ মাছ ২২০-২৫০ টাকা, সিলভার কাপ ২০০-২৫০ টাকা, পোয়া ৩০০-৪০০ টাকা, কার্ফু মাছ ২০০-২৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া সামুদ্রিক ও লোনা পানির মাছ রূপচাঁদা ৬৫০- ১২০০ টাকায়, ইলিশ ৮০০-১৩০০ টাকায়, লইট্যা ১৮০-২০০ টাকায়, পোয়া ৩০০-৫০০ টাকায়, ছুরি ৩০০-৩৫০ টাকায়, রিকশা ৭০০-৮০০ টাকায়, চাকা চিংড়ি ৪০০-৪৫০ টাকায়, পাবদা ৩৫০-৪০০ টাকায়, কাল চান্দা ৬০০-৬৫০ টাকায়, লাল কোরাল ৬০০-৬৫০ টাকায়, সুরমা (ছোট) ২০০-৩০০ টাকায়, লাক্ষা মাছ ১৬০০-২২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
এ সময় মসলার বাজার ঘুরে দেখা গেছে, ঈদুল আযহা আসার মাসখানেক আগেই মসলার দাম বেড়ে গেছে বাজারে। পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৫০-৬০ টাকায়, যা গত সপ্তাহে ছিল ৩৫-৪০ টাকা। অর্থাৎ কেজিতে পেঁয়াজের দাম বেড়েছে ১০-১৫ টাকা। রসুনের কেজি ১৩০-১৮০ টাকা, যা এক মাস আগেও ছিল ৮০ থেকে ১২০ টাকা। সে হিসেবে রসুনের দাম কেজিতে বেড়েছে ৫০ টাকা। আদা বিক্রি হচ্ছে ১৮০-৩০০ টাকায়। প্রতি কেজি জিরা বিক্রি হচ্ছে ৮০০-৯০০ টাকায়। শুকনা মরিচ (ইন্ডিয়ান) প্রতি কেজি ৪০০-৪২০ টাকা, দেশি শুকনা মরিচ প্রতি কেজি ৩৫০-৩৭০ টাকা, হলুদ গুড়া কেজি ২৫০ টাকা, গুড়া মরিচ কেজি ৪৫০ টাকা, ধনিয়া প্রতি কেজি ২২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
চাল ও ডালের বাজার ঘুরে দেখা যায়, সিদ্ধ চাল কেজি ৫২-৫৫ টাকা, আতপ চাল কেজি ৫৫-৮০ টাকা ও মিনিকেট চাল ৭০-৭৫ টাকা, মসুর ডাল ১২৫-১৪০ টাকা, লবণ ৩০-৪০ টাকা, মটর ডাল ৬০-৭০ টাকা দরে পাওয়া যাচ্ছে।
এদিকে নতুন মূল্য অনুযায়ী, বোতলজাত এক লিটার সয়াবিন তেলে ১৯৯ টাকা, যা পূর্বে ছিল ১৮৭ টাকা, পাঁচ লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেল ৯৬০ টাকা, যা পূর্বে ছিল ৯০৬ টাকা, খোলা সয়াবিন প্রতি লিটার ১৭৬ টাকা, যা পূর্বে ছিল ১৬৭ টাকা। এছাড়া পাম সুপার তেল প্রতি লিটার ১৩৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। তবে বাজারভেদে জিনিসপত্রের দামে কিছুটা তারতম্য লক্ষ্য করা গেছে।
নিত্যপণ্যের বাড়তি দামে উৎকন্ঠা ও উদ্বেগ প্রকাশ করে নগরীর বহদ্দারহাট বাজারে রবিউল নামে একজন ক্রেতা বলেন, এমনিতে বাজারে পণ্যের দাম আকাশছোঁয়া, তার উপর পাগলা ঘোড়ার মত ছুটছে জিনিসপত্রের দাম। মাছ-মাংস থেকে শুরু করে কোনোকিছুই ক্রয়সীমার মধ্যে নেই মানুষের। এখন আবার নতুন করে তেলের দাম বেড়েছে, সেইসাথে মাছ-মাংস-সবজির দাম। সবমিলিয়ে হাঁসফাঁস অবস্থা মানুষের।
তিনি আরো বলেন, দেশে ব্যবসায়ীদের শুধু দাম বাড়ার জন্য উপলক্ষ লাগে। সুযোগ পেলেই নানা ছল-ছাতুরি আর বাহানায় দাম বাড়ানোর ফন্দি আঁটে। আর একবার দাম বাড়লে সে দাম কমার নাম-লক্ষণ থাকে না। সামনে নতুন করে বাজেট আসছে। ব্যবসায়ীদের জনগণের গলা চেপে ধরার নতুন সুযোগ আসছে। এভাবেই সাধারণ মানুষ আজ কোণঠাসা। কখনও সরবরাহ কম, কখনও কৃত্রিম সংকট, আবার কখনও অথনৈতিক মন্দা- এই বলেই দাম বাড়ানোর কায়দা-কানুনে চলছে স্বদেশ।