মন্ত্রী-এমপির সুপারিশে চট্টগ্রাম বন্দরে ২৩ প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স প্রদান

তালিকা প্রকাশে কঠোর গোপনীয়তা

চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্ণোঙরে বড় জাহাজ থেকে পণ্য খালাসের জন্য বন্দর কর্তৃপক্ষ ২৩টি প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স প্রদানের সিদ্ধান্ত নেয়। এক সপ্তাহ আগে এ লক্ষে গঠিত কমিটির তিন সদস্যের স্বাক্ষরিত চূড়ান্ত তালিকা চূড়ান্ত হলেও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (চবক) এটি প্রকাশের ক্ষেত্রে কঠোর গোপনীয়তা অবলম্বন করছে।

কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে তালিকা প্রকাশ না করলেও অন্য সূত্র থেকে প্রাপ্ত তালিকা পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২৩ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৬টি চট্টগ্রামের, ঢাকার পাঁচটি, খুলনা ও যশোরের একটি করে।

বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত খবরে জানা যায়, মন্ত্রী-এমপির সুপারিশসহ রাজনৈতিক বিবেচনায় এসব নতুন লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। লাইসেন্স প্রদানে গঠিত তিন সদস্যের কমিটি এক্ষেত্রে অসহায়। আর্থিক লেনদেনের বিনিময়ে অনেক নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান অপারেটর হিসেবে সংযুক্ত হয়েছে এমন অভিযোগও ওঠেছে। গত ২৭ এপ্রিল চট্টগ্রাম বন্দরের বোর্ড সভায় বহির্ণোঙরে পণ্য খালাসের জন্য ২৩টি প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স প্রদানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর আগের দিন তিন সদস্যের কমিটি এসব প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স প্রদানের জন্য সুপারিশ করে। শতাধিক আবেদন জমা পড়লেও কমিটি ২৩টি প্রতিষ্ঠানকে যোগ্য বিবেচনা করে লাইসেন্স প্রদানের সুপারিশ করলেও অনেক প্রতিষ্ঠান নামসর্বস্ব। বহির্ণোঙরে পণ্য খালাসের মতো অভিজ্ঞতা এবং যন্ত্রপাতি কোনোটাই নেই তাদের। অভিজ্ঞতার চাইতে রাজনৈতিক সুপারিশই লাইসেন্স প্রদানের গুরত্বপূর্ণ নির্ণায়ক হিসেবে ভূমিকা রেখেছে। তিন সদস্যের স্বাক্ষরে প্রাপ্ত তালিকায় দেখা যায়, কমিটি প্রতিষ্ঠানের নাম লিখলেও মালিকের নাম উল্লেখ করেনি। নতুন ২৩টি প্রতিষ্ঠান হচ্ছে; শালুটিকার অ্যাসোসিয়েটস (মালেক চেম্বার, ২য় তলা, ৫/৫, আগ্রাবাদ, চট্টগ্রাম), বিসমিল্লাহ মেরিন সার্ভিসেস (এস ভি রিভারিও, ৪র্থ তলা, হাউস-১০৭৯, সিএসই ভবন, পূর্ব গোসাইলডাঙ্গা, বাবিক বিল্ডিং মোড়, চট্টগ্রাম), এনএমটি-এমএসএন লি.(কে এম টাওয়ার, তৃতীয় তলা, ৭৬/৭৭, আগ্রাবাদ, চট্টগ্রাম), জিডি হারবার সার্ভিসেস (জীবন বীমা ভবন, ৬ষ্ঠ তলা, ৫৬, আগ্রাবাদ বা/এ, চট্টগ্রাম), লামিসা এন্টারপ্রাইজ (এম এ আজিজ স্টেডিয়াম, পূর্ব গ্যালারী, তৃতীয় তলা, কাজির দেউড়ি, চট্টগ্রাম), পোর্ট হারবার ইন্টারন্যাশনাল (৩০১-৩০২, সেন্ট্রাল প্লাজা, ৪র্থ তলা, জিইসি সার্কেল, চট্টগ্রাম), আহমেদ মেরিটাইম লজিস্টিকস (শাহজাদী চেম্বার, ৩য় তলা, ১৩৩১/বি, শেখ মুজিব রোড, চট্টগ্রাম), শাহী শিপিং এন্ড ট্রেডিং (ডিএম কমপ্লেক্স, ডিটি রোড, বানুর বাজার, ভাটিয়ারী, সীতাকুণ্ড, চট্টগ্রাম), মা ট্রেডিং (পোর্ট ল্যান্ড-সাত্তার টাওয়ার, ৭ম তলা, চট্টগ্রাম), এস ট্রেডিং (জাবেদ টাওয়ার, ২য় তলা, ৬০২/৪৮৫, সুলতান কলোনী, নর্থ পাঠানটুলি, শেখ মুজিব রোড, চট্টগ্রাম), মেসার্স তাইফুল এন্টারপ্রাইজ (সাবের প্লাজা, ৫ম তলা, ১৬১ স্ট্র্যান্ড রোড, বারিক বিল্ডিং, চট্টগ্রাম), কিউ এন এস গ্লোবাল লজিস্টিকস লি. (আজিজ কোর্ট, ২২ তলা, ৮৮-৮৯, আগ্রাবাদ বা/এ, চট্টগ্রাম), মেসার্স ওশান কনট্রাক্টিং অ্যান্ড সাপ্লাইয়িং ফার্ম (পোর্ট কানেকটিং রোড, ব্লক- কে, চট্টগ্রাম), গফুর ব্রাদার্স অ্যন্ড কোং ,পোর্ট ল্যান্ড-সাত্তার টাওয়ার, বারিক বিল্ডিং, চট্টগ্রাম), এস এস কনসাল্টিং লি. (১১৯, অলংকার শপিং কমপ্লেক্স, ২য় তলা, পাহাড়তলী, চট্টগ্রাম), এ বি করপোরেশন (প্লাটিনাম টাচ, ৫ম তলা, বাড়ি নং-৭, ও. আর নিজাম রোড, চট্টগ্রাম), আরিয়ান ট্রেডার্স লি. (হাউস নং-৩১৪১, এপার্টমেন্ট নং-২/এ, রোড-৪, ব্লক-এ, বনানী, ঢাকা), ব্রিডেক্স ইনফ্রাসট্রাকচার লি (মাইডাস সেন্টার, ৮ম তলা, হাউস নং- ৫, রোড-১৬, ধানমন্ডি, ঢাকা), আর কে করপোরেশন (হাউস নং-৬, রোড-২, বনানী, ঢাকা), কেয়ার শিপিং অ্যান্ড ফ্রেইট লি. (গুডলাক সেন্টার, ৭ম তলা, ১৫১/৭, গ্রীণ রোড, ঢাকা), কে এ এস ট্রেডিং (১২৩৬ স্টেশন বাজার, নোয়াপাড়া, অভয়নগর, যশোর ও খুলনা ইউনিয়ন এন্টারপ্রাইজ লি. (হাউস নং-২০৫, রোড-৮, সোনাডাঙ্গা আর/এ, খুলনা)।

চট্টগ্রাম বন্দরে শিপ হ্যন্ডলিং অপারেটর নিয়োগ নিয়ে গত কয়েক দিন ধরে চলছে নানা আলোচনা। নতুন শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর নিয়োগ নিয়ে চবক ও পুরনো অপারেটররা পরষ্পর বিরোধী প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, বহির্ণোঙরে পণ্য খালাসের পরিধি বেড়েছে। এটি বিবেচনা করে যথাযথ নিয়ম মেনে নতুন লাইসেন্স প্রদান করা হয়েছে। পুরনো শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটররা বলছেন, কোনো ধরণের দরপত্র ছাড়া নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে নতুন লাইসেন্স প্রদান করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দরের সদ্য বিদায়ী চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম শাহজাহানের দিকে অনেকের অভিযোগের তীর। চট্টগ্রাম বন্দরের শেষ কর্মদিনের পাঁচ দিন আগে (২৭ এপ্রিল) তড়িঘড়ি করে এ ধরণের একটি গুরত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তকে বাঁকা চোখে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।তাদের অভিমত, দরপত্র ছাড়া বন্দর কর্তৃপক্ষ এ ধরণের সিদ্ধান্ত নিতে পারে না।অনেক অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানের যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও তালিকায় ঠাঁই হয়নি। একই দিন এস. টি. এন্টারপ্রাইজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারেক কামাল অপারেটর নিয়োগে বন্দর কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট করেন। রিট নং ৫০৭১/২০২৩। বিচারপতি মো. খায়রুজ্জামান এবং বিচারপতি শাহেদ নুরুদ্দীন এর সমন্বয়ে দ্বৈত বেঞ্চ শুনানিশেষে বন্দর কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ওপর ছয় মাসের স্থগিতাদেশ দেন। একই সাথে বন্দরের তিন কর্মকর্তাকে শো’কজও করেন।

চট্টগ্রাম বন্দর সচিব মো. ওমর ফারুক দেশ বর্তমানকে বলেছেন, লাইসেন্স পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো এখন বহির্ণোঙরে পণ্য খালাসের জন্য তালিকাভুক্ত হতে পারবে।তালিকাভুক্ত হওয়ার পরই পণ্য খালাসের কাজে সুযোগ পায় তারা। হাইকোর্টের রীট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর’ নিয়োগে বন্দর কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত স্থগিতে হাইকোর্টের রায়ের কোনো কপি ২৭ এপ্রিল আমরা পাইনি।

বাংলাদেশ শিপ হ্যান্ডলিং অ্যান্ড বার্থ অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান এ কে এম শামসুজ্জামান রাসেল বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ রেগুলেশনস ফর ওয়ার্কিং অব চিটাগং পোর্ট (কার্গো অ্যান্ড কন্টেনার) ২০০১ এর প্রবিধানমালা অনুসরণ না করে অনিয়মতান্ত্রিকভাবে ও দরপত্র ব্যতীত নতুন শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর তালিকাভুক্ত করছে।কাজের জন্য দরপত্র ব্যতীত শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর তালিকাভুক্তি ও নিয়োগ করা অযৌক্তিক ও বেআইনি। এ ব্যাপারে উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশও রয়েছে।