আসন্ন পাঁচ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপি আটকাতে পারছে না দলীয় নেতাদেরকে। দলের শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে বার বার বলা হচ্ছে বিএনপি বর্তমান সরকারের অধীনে কোন নির্বাচনে অংশ নেবে না। সিটি করপোরেশন নির্বাচনের প্রশ্নই উঠে না। কিন্তু ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের কয়েকদিন আগেই বলেছেন, বিএনপি নির্বাচন না করার ঘোষণা দিলেও ‘ঘোমটা পড়ে’ আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপি থাকবেই।
গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দেখা গেছে, গত বৃহস্পতিবার মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন বিএনপি এক সিনিয়র নেতার ছেলে সরকার শাহানুর রনি। তিনি মনোনয়ন পত্র দাখিল করে সাংবাদিকদের বলেছেন, দলের তৃণমূলের চাপে মেয়র পদে নির্বাচন করছেন। কেন্দ্রীয় নেতাদের মৌন সমর্থনও তিনি পাচ্ছেন বলে স্বীকার করেছেন।
এদিকে ১ মে, মে দিবস উপলক্ষে সিলেট জেলা ও মহানগর শ্রমিক দল আয়োজিত শোভাযাত্রা ও সমাবেশে অংশ নিয়ে আসন্ন সিলেট সিটি নির্বাচনেও সিটি করপোরেশনের বর্তমান মেয়র বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যনিবাহী কমিটির সদস্য আরিফুল হক নির্বাচনে অংশ নেয়ার ঈঙ্গিত দিয়ে আগামী ২০ মে দলের সমাবেশে প্রাির্থতা ঘোষণা করার কথা বলেছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে,সিলেট সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর গত মাসে বেশ কিছু দিন লন্ডনে অবস্থান করেন আরিফুল হক চৌধুরী। সেখানে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সাথে বোঝাপড়া করতেই গিয়েছিলেন বলে ধারণা করছেন অনেকেই।
নগরীর রেজিস্টারি মাঠে আয়োজিত শ্রমিক দলের সমাবেশের প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত হয়ে সিলেট সিটি করপোরেশনের বর্তমান মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, ‘সিটি নির্বাচনের (পাঁচ সিটি) তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে। ভোটের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে সেই নির্বাচনে বিএনপি যাচ্ছে না। তবে বাস্তবতার বিবেচনায় সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আমরা কেন যাব, সে বিষয়ে আগামী ২০ মে সিলেট রেজিস্টারি মাঠে সমাবেশ ডেকে স্পষ্ট করা হবে।’
আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, ‘সিটি নির্বাচন একটি প্রহসনের নির্বাচন করতে চায় নির্বাচন কমিশন। যেখানে জাতীয়ভাবে সারাদেশে জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে, সেখানে আবার সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ইভিএম দেওয়া হয়েছে। এই ইভিএম হচ্ছে তাদের মেকানিজমের অন্যতম বিষয়। যে নির্বাচনে আপনারা আপনাদের পছন্দের লোকদের ভোট দেবেন সেই ভোট অন্য পাত্রে চলে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা দেখতে পাই এই মহানগরীর জনগণ ইভিএমের সঙ্গে কোনোভাবেই পরিচিত নয়। কাজেই এই নির্বাচন কমিশনকে বলব, যদি তারা ফ্রি অ্যান্ড ফেয়ার ইলেকশন করতে চায়… জনগণের বিরুদ্ধে কিছু হলে এর দায় দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনকেই বহন করতে হবে। নির্বাচন কমিশন তাদের চোখ থাকতে যদি অন্ধ হয়ে যায়, তবে কিছু বলার নেই।’
সিলেটের মেয়র বলেন, ‘যে ইভিএম প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে সেই ইভিএম দিয়ে সিটি নির্বাচন মানি না। সিটি নির্বাচনে ইভিএম পদ্ধতি বাতিল করতে হবে। ইভিএমে কোনো ভোট মানি না।’
আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, ‘সিলেটের মানুষ অধিকার আদায়ে সব সময় সোচ্চার। আন্দোলন করে রেফারেন্ডামের মাধ্যমে পূর্ব বাংলার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল সিলেটের মানুষ।’
মেয়র অভিযোগ করে বলেন, ‘সিটি নির্বাচনকে সামনে রেখে ইতোমধ্যেই সিলেট মহানগরীর ভেতরে প্রশাসনিক রদবদল চলছে। তবে সিলেটের মাটিতে অন্যায় করে কেউ পার পায়নি, পাবেও না।’ প্রশাসনে যারা নতুন আসছেন তাদের সব তথ্য সংগ্রহ হচ্ছে বলে জানান তিনি।
আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, গত ১০ বছর তিনি নগরবাসীর সেবা করেছেন। সিলেট মহানগরীর রাজনৈতিক নেতারা নেতৃত্ব দিতে জানে, বাইরে থেকে কাউকে ভাড়া করে নিয়ে এসে মহানগরীর মানুষকে দাস বানানো মানবে না নগরীর মানুষ।
প্রসঙ্গত, সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে এবার আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন যুক্তরাজ্য প্রবাসী নেতা আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী।
বর্তমান সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনে অংশ নেবে না বলে আগেই জানিয়ে দিয়েছে বিএনপি। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গতকালও একই কথা বলেছেন।
তিনি বলেন, ‘কোনোভাবেই সিটি নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেবে না। মেয়র, কাউন্সিলর কোনো পদেই বিএনপির কেউ নির্বাচন করবে না। কিন্তু বাস্তবতা হলো পাঁচ সিটিতেই এখন পর্যন্ত বিএনপির স্বতন্ত্র প্রার্থী আছে। গাজীপুরে সরকার শাহানুর রনি, বরিশালে কামরুল আহসান রূপম, খুলনায় নজরুল ইসলাম মঞ্জু এবং সিলেটে আরিফুল হক চৌধুরী বিএনপির স্বতন্ত্র প্রার্থী। রাজশাহীতে এখনো কেউ বিএনপির কেউ স্বতন্ত্র প্রার্থী না হলেও সম্ভাবনা এখনই উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না।
অন্যদিকে পাঁচ সিটিতেই কাউন্সিলর পদে বিএনপির অনেক প্রার্থী আছেন। মেয়র পদে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হলেও কাউন্সিলর পদে দলীয় প্রতীক নেই। ফলে এখানে বিএনপি প্রার্থীরা সহজেই দাঁড়িয়ে যাচ্ছেন।
বিএনপির নীতিনির্ধারকদের উপর তৃণমূল থেকেও চাপ রয়েছে। কারণ পাঁচ সিটিতে দলীয়ভাবে বিএনপি নির্বাচনে অংশ না নিলেও নেতা-কর্মীরা বসে নেই। তারা মেয়র পদে স্বতন্ত্র এবং নির্দলীয় কাউন্সিলর পদে দাঁড়িয়ে যাচ্ছেন। তারা মনে করছেন ভোটে না দাঁড়ালে তাদের অবস্থান টিকে থাকবে না। সিলেটের বিএনপি নেতা আরিফুল হক চৌধুরী দুই বারের মেয়র। তিনি নিজে তো বটেই বিএনপির অনেক নেতা চাচ্ছেন না এই সিটি হাতছাড়া করতে। আরিফুল হক চৌধুরী এজন্য লন্ডনে গিয়ে তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করে এসেছেন ।