হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ সত্ত্বেও চট্টগ্রাম বন্দরে অপারেটর নিয়োগ

হাইকোর্টের রিটকে আমলে না নিয়েই চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (চবক) বহির্নোঙরে পণ্য খালাসের জন্য নতুন করে ২৩টি প্রতিষ্ঠানকে ‘শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর’ হিসেবে লাইসেন্স দিয়েছে।  তবে রায়ের কপি গ্রহণ নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পাওয়া গেছে।  বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, কোনো রায়ের কপি পায়নি, অন্যদিকে শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন বলছে ‘রায়ের কপি’ গ্রহণ করেনি।

চট্টগ্রাম বন্দর সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার এক বোর্ড সভায় নতুন ২৩টি লাইসেন্স দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।  একই দিন এস. টি. এন্টারপ্রাইজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারেক কামাল অপারেটর নিয়োগে বন্দর কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট করেন। রিট নং-৫০৭১/২০২৩। বিচারপতি মো. খায়রুজ্জামান এবং বিচারপতি শাহেদ নুরুদ্দীনের সমন্বয়ে গঠিত দ্বৈত বেঞ্চ শুনানি শেষে বন্দর কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ওপর ছয় মাসের স্থগিতাদেশ দেন।

চট্টগ্রাম বন্দর সচিব ওমর ফারুক বলেন, লাইসেন্স পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো এখন বহির্নোঙরে পণ্য খালাসের জন্য তালিকাভুক্ত হতে পারবে।  তালিকাভুক্ত হওয়ার পরই পণ্য খালাসের কাজে সুযোগ পায় তারা।  হাইকোর্টের রিট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর নিয়োগে বন্দর কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত স্থগিতে হাইকোর্টের রায়ের কোনো কপি আমরা পাইনি।

চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পণ্য হ্যান্ডলিংয়ে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানকে ‘শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর’ এবং জেটিতে পণ্য হ্যান্ডলিংয়ে নিয়োজিতদের ‘বাথ অপারেটর’ বলা হয়। বর্তমানে শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরের সংখ্যা ৩২টি। এর মধ্যে পাঁচটি প্রতিষ্ঠান নিজেদের আমদানিকৃত পণ্য খালাস করে।  এগুলো হচ্ছে মেসার্স এম এ কালাম এন্ড কোং (সিটি গ্রুপ), মেসার্স সি লিফট স্টিভিডোর লিমিটেড (সানশাইন সিমেন্ট), কে এস আবদুল হাকিম সন্স এন্ড কোং (মেঘনা গ্রুপ), আর চৌধুরী লিমিটেড (আবুল খায়ের গ্রুপ) এবং এরিয়ান স্টিভিডোর লিমিটেড (প্রিমিয়ার সিমেন্ট)।  বাকি ২৭টি প্রতিষ্ঠান অন্য আমদানিকারকের পণ্য খালাসে নিয়োজিত রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান বহির্নোঙরে বড় জাহাজ থেকে লাইটার জাহাজে (ছোট জাহাজ) পণ্য খালাস করে নদীপথে চট্টগ্রামের বিভিন্ন ঘাটসহ দেশের বিভিন্ন গন্তব্যের উদ্দেশ্যে নিয়ে যায়।

২০০৭ সাল পর্যন্ত বহির্নোঙরে পণ্য খালাসে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানগুলো ‘স্টিভিডোর কোম্পানি’ হিসেবে পরিচিত ছিল।  ২০০৮ সালে স্টিভিডোরিং প্রথা বিলুপ্ত করে সরকার শিপ হ্যান্ডলিংয়ের কাজে নিয়োজিত ৫৬টি স্টিভিডোর কোম্পানিকে বার্থ অপারেটর এবং শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর হিসেবে ভাগ করে।  ২০১৫ সালে সর্বশেষ শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর নিয়োগ করে বন্দর কর্তৃপক্ষ।  ওই সময় ১৫টি শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর থেকে বেড়ে ৩২টিতে দাঁড়ায়।  ২০২১ সালে বন্দর কর্তৃপক্ষ শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর নিয়োগের জন্য নতুন করে টেন্ডার বিজ্ঞপ্তি দিলে আটটি অপারেটর প্রতিষ্ঠান হাইকোর্টে রিট করে।  এর ফলে আটকে যায় অপারেটর নিয়োগের প্রক্রিয়া। গত বৃহস্পতিবার বন্দরের বোর্ড সভায় ২৩টি প্রতিষ্ঠানকে নতুন করে লাইসেন্স দেওয়া হয়।

বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, এ সংক্রান্ত গঠিত কমিটির সুপারিশের প্রেক্ষিতে নতুন লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে।  কিছুদিন আগে বন্দরের বর্তমান চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম শাহজাহানের বদলির আদেশ হয়েছে।  আগামী ২ মে তিনি দায়িত্ব ছাড়ার কথা রয়েছে বলে বন্দর সূত্রে জানা যায়।  বিদায়ী চেয়ারম্যানের যাওয়ার আগে তড়িঘড়ি করে শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর নিয়োগের বিষয়টি সুদৃষ্টিতে দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা।

বন্দরের কর্মকর্তারা বলছেন, বহির্নোঙরে বড় জাহাজ থেকে প্রতি বছর সাড়ে ছয় টন পণ্য খালাস করা হয়।  দীর্ঘ সময়ে বন্দরের সক্ষমতা ও পণ্য আমদানি প্রায় সাত গুণ বৃদ্ধি পেলেও নানা জটিলতায় নতুন করে শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর তালিকাভুক্ত করা যায়নি।  তাই পণ্য আমদানি এবং প্রতিযোগিতা বাড়াতে এসব বিষয়ে করণীয় নির্ধারণ করতে একটি কমিটি গঠন করা হয়।  কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে নতুন করে লাইসেন্স দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

বাংলাদেশ শিপ হ্যান্ডলিং অ্যান্ড বার্থ অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান এ কে এম শামসুজ্জামান রাসেল টেলিফোনে দেশ বর্তমানকে বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ রেগুলেশনস ফর ওয়ার্কিং অব চিটাগং পোর্ট (কার্গো অ্যান্ড কন্টেইনার) ২০০১ এর প্রবিধানমালা অনুসরণ না করে অনিয়মতান্ত্রিকভাবে ও দরপত্র ব্যতীত নতুন শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর তালিকাভুক্ত করছে।

চট্টগ্রাম বন্দরে কাজের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও অনেক প্রতিষ্ঠান শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর হিসেবে তালিকাভুক্ত হতে ব্যর্থ হয়েছে। কাজের জন্য দরপত্র ব্যতীত শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর তালিকাভুক্তি ও নিয়োগ করা অযৌক্তিক ও বেআইনি।  এ ব্যাপারে উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশও রয়েছে।  তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, বৃহস্পতিবার রায়ের কপি বন্দর ভবনে নিয়ে যাওয়া হলেও ‘ডেসপাস’ রায়ের কপি রিসিভ করেনি।  এ ব্যাপারে কমিটির সাথে আলাপ করে করণীয় নির্ধারণ করা হবে।