মুক্তিযোদ্ধা সংসদ নির্বাচন স্থগিতে মিশ্র প্রতিক্রিয়া

হঠাৎ করে মন্ত্রনালয় কতৃক বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা, তড়িঘড়ি করে প্রস্তুতি ও আকস্মিক নির্বাচন স্থগিত আদেশ সারা বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে প্রহসন বলে মন্তব্য করেছেন মুক্তিযোদ্ধারা।  নির্বাচিত কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রায় ছয় বছর পর ১৩মে বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ নির্বাচনের ঘোষণা দেয় মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ও প্রধান নির্বাচন কমিশনার মোঃ মাহবুব হোসেন।

এরমাঝে এক দফা নির্বাচনের তারিখ পিছিয়ে ২০মে ঘোষণা করলেও হঠাৎ করেই নির্বাচন স্থগিতের সিদ্ধান্ত মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে গভীর ষড়যন্ত্র বলে ধারণা করেছেন সংশ্লিষ্টরা। অনেকে আবার তফসিল ঘোষণা ও চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের পর নির্বাচন কমিশনের এমন সিদ্ধান্তকে কাঁচা মাথার কাজ বলেও মন্তব্য করেছেন।

গত ৯ এপ্রিল সরকারি পরিবহন পুল ভবনে নির্বাচন কমিশনের অষ্টম সভায় নির্বাচন স্থগিত ঘোষণা করেন প্রধান রিটার্নিং অফিসার রঞ্জিত কুমার দাস।  এই ঘোষণার পর থেকেই সারাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেছে।

এ বিষয়ে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) রঞ্জিত কুমার দাসের সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

এসময় মন্ত্রনালয় সূত্রে জানা যায়, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের চূড়ান্ত তালিকা প্রণয়নের কার্যক্রম শেষ না হওয়া এবং মুক্তিযোদ্ধাদের যাচাইবাছাই ও আপিলের শুনানি চলমান থাকায় আপাতত নির্বাচন স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।  অন্যথায় আইনি জটিলতা দেখা দেওয়ার সম্ভবনা রয়েছে। পরিস্থিতি অনুক‚লে এলে দ্রæততম সময়ে আবারও নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হবে।

এদিকে মুক্তিযোদ্ধারা বলেন, শেষ বয়সে নির্বাচনকে ঘিরে সারাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে প্রাণ ফিরে এসেছিল। দীর্ঘদিন ধরে অচল অবস্থায় পড়ে থাকা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের অফিসগুলো বীর মুক্তিযোদ্ধাদের পদচারনায় মুখর হয়ে উঠেছিল। মুক্তিযোদ্ধা সংসদে নির্বাচিত কমান্ডার না থাকায় সারাদেশের প্রত্যেকটি উপজেলায় সরকারের বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সগুলো অযতেœ-অবহেলায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। নির্বাচনের ঘোষণায় কমপ্লেক্সগুলোতে কর্মচাঞ্চল্য ফিরে এসেছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই এমন ঘোষণা মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র বলেও উল্লেখ করেছেন অনেকে। আবার অনেকেই বলছেন, মুক্তিযোদ্ধাদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা না হলে নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক রয়েই যাবে।

এসময় তারা আরো বলেন, এদিকে বিভিন্ন স্থানে দেখা গেছে মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে সম্প্রীতি ও ঐক্যের কারণে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না বললেই চলে। এমনই চট্টগ্রাম মহানগর ইউনিট কমান্ডের প্রার্থী বীর মুক্তিযোদ্ধা মোজাফফর আহমদ। চট্টগ্রাম মহানগরে অন্য কোন প্রার্থী না থাকায় বিনা প্রতিদ্ব›িদ্বতায় নির্বাচিত হতে যাচ্ছিলেন তিনি। সারা দেশের বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে এমন অনেক জনপ্রিয় প্রার্থীর পথে বাধ সাধল এই স্থগিত ঘোষণা। অনেকে আবার এটিকে মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে প্রহসন বলেও মন্তব্য করেছেন।

এবিষয়ে চট্টগ্রাম মহানগর ইউনিট কমান্ডের একমাত্র প্রার্থী বীর মুক্তিযোদ্ধা মোজাফফর আহমদ বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের দীর্ঘদিনের দাবি একটি নির্বাচন। হঠাৎ করে রমজানে নির্বাচনের ঘোষণা দিয়ে আবার তড়িঘড়ি করে স্থগিত করা শুভ লক্ষণ নয় বলে জানান তিনি। এটি সরকার ও জননেত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের সামিল। দীর্ঘদিন পর মুক্তিযোদ্ধারা আবার জেগে উঠেছিল। এ নির্বাচনকে ঘিরে সারা বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযোদ্ধার পরিবারের মাঝে একটি জাগরণের সৃষ্টি হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে এই ধরনের কর্মকান্ড বা সিদ্ধান্ত  দেশ ও জাতির জন্য লজ্জাজনক বলে মন্তব্য করেন তিনি। তিনি আশা করেন, সংকট সমাধান করে অতি শীঘ্রই আবার সংসদ নির্বাচনের ঘোষণা দেবেন মন্ত্রণালয়।

জেলা ইউনিট কমান্ডের প্রার্থী বীর মুক্তিযোদ্ধা মহিউদ্দিন রাশেদ জানান, হুট করে মন্ত্রণালয়ের এমন সিদ্ধান্ত মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে হাসি ঠাট্টা, অপমান করার শামিল। গত পাঁচ-ছয় বছর ধরে এই সংসদ নির্বাচনকে ঝুলিয়ে রেখেছেন তারা।

তিনি বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে বিভিন্ন সময় ষড়যন্ত্র হয়েছে। জিয়া-এরশাদ সরকারের আমল থেকে এটা শুরু হয়েছে। যাচাই বাছাইয়ের নামে বিভিন্ন সময় মুক্তিযোদ্ধাদের বিব্রত ও অপমান করা হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক, রাজাকারের তালিকায় মুক্তিযোদ্ধার নাম, মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় রাজাকারের নাম সহ নানা রকম বিতর্কের জন্ম দিয়েছে মন্ত্রণালয়। নির্বাচন নিয়েও এমন সিদ্ধান্ত কাঁচা মাথার কাজ বলে জানান তিনি। তবে সব কিছুর পরেও আশাহত নয় মুক্তিযোদ্ধারা। দেশ ও জাতির প্রয়োজনে যে কোন সংকট মোকাবেলায় প্রস্তুত তাঁরা।

মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ড কেন্দ্রীয় কমিটির সহ সভাপতি সরওয়ার আলম মনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ নির্বাচন না হওয়ায় সারা দেশে মুক্তিযোদ্ধা পরিবারগুলো অভিভাবকহীন এবং সংগঠনটি প্রতিনিধিত্বহীন হয়ে পড়েছিল। দীর্ঘ নয় বছর পর মুক্তিযোদ্ধ সংসদ নির্বাচনের ঘোষণায় প্রাণ ফিরে পেয়েছিল মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারগুলো। সন্তান হিসেবে আমরাও আনন্দিত হয়েছিলাম। একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে যারাই সংসদের নেতৃত্ব নিতেন, আমরা তাদের সাধুবাদ জানাতাম। এর মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের অচল অবস্থার নিরসন হতো। কারণ আমলাতান্ত্রিক প্রশাসন দিয়ে সংসদ কিংবা একটি সংগঠন চালানো খুবই দুরূহ কাজ।

এসময় তিনি আরো বলেন, আশা করি, অনতিবিলম্বে মন্ত্রণালয় মুক্তিযোদ্ধ সংসদ নির্বাচন দেবেন এবং আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের পক্ষে মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবারকে দায়িত্ব নিয়ে কাজ করার সুযোগ করে দেবেন।

উল্লেখ্য, ২০১৪ সালে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সর্বশেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। হেলাল মোর্শেদ খান (বীর বিক্রম) নেতৃত্বাধীন মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের নির্বাচিত কমিটির মেয়াদ শেষ হয় ২০১৭ সালের ৮ জুন। পরে হাইকোর্টের নির্দেশে ওই বছরের ১৯ জুলাই কেন্দ্রীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রশাসক নিয়োগ করে সরকার। কিন্তু প্রশাসক নিয়োগের কারণে নানা সমস্যার কথা জানিয়ে নির্বাচন দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধারা। এরপর ২০২১ সালের ১৮ জুলাই মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার করে পাঁচ  সদস্যের নির্বাচন কমিশন গঠন করে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়।