ফুটপাতেই নিম্নবিত্ত মানুষের স্বস্তি

সারা বছর নগরীর বিভিন্ন মোড়ে ফুটপাতের দোকানে বেচা বিক্রি তেমন না থাকলেও ঈদ এলেই জমে ওঠে ভাসমান এসব দোকানপাট।  মানুষের ব্যাপক সমাগমে ফুটপাত হয়ে ওঠে নগরীর বাড়তি সৌন্দর্য্যরে কেন্দ্রবিন্দু।  ভাসমান এসব দোকানে মানুষের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে।  বড় বড় মার্কেটের চেয়ে জিনিসপত্রের দাম তুলনামূলক কম হওয়ায় এসব দোকানের প্রতি ক্রেতাদের বাড়তি আকর্ষণ লক্ষণিয়। দোকানিরাও নগরীর বিভিন্ন মোড়ে ভ্যান, ঠেলাগারী, চৌকি, তাক পেতে নানান রকম মালামালে সাজিয়েছেন দোকান।  এসব দোকানে স্থান পেয়েছে ছেলেদের গেঞ্জি, শার্ট, জুতা, স্যান্ডেল, বেল্ট, মানি ব্যাগ; বাচ্চাদের প্যান্ট-গেঞ্জি, মেয়েদের জামা, পায়জামা, ব্যাগ, অলংকার সহ গৃহস্থলির বিভিন্ন পণ্যের পসরা।  সেই সাথে দোকানিরা নানা রকম উক্তি, প্রবাদ ও অঙ্গভঙ্গিমা করে আকর্ষণ করছেন ক্রেতাদের।  একদিকে দব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি অপরদিকে মানুষের আয়ের সল্পতা, তাই ফুটপাতের ভাসমান দোকানগুলোই এখন নিম্নবিত্ত মানুষের স্বস্তি বা ভরসা এমনই বলছেন ক্রেতারা।

মঙ্গলবার (১৮ এপ্রিল) চট্টগ্রাম নগরীর নিউমার্কেট, জিইসি, চকবাজার বহদ্দারহাট ও আগ্রাবাদ ঘুরে দেখা যায় ফুটপাতের দোকানগুলোর এমন চিত্র।  এসময় নগরীর চকবাজার এলাকায় ফুটপাত ব্যতিত বাকী স্থানগুলোতে পুরুষ ও বাচ্চাদের পোশাকই বেশি দেখা গেছে।

নগরীর নিউমার্কেট মোড়ে হারুনুর রশীদ বলেন, তিনি ৪০ বছর ধরে ফুটপাতে ব্যবসা করছেন।  এখানে তার বেশ কয়েকটি দোকানও রয়েছে।  এ সব দোকানে টেবিল ক্লথ, শপিং ব্যাগ, মহিলাদের ব্যাগ, নারী-পুরুষের জুতা স্যান্ডেলসহ বাচ্চাদের নানা রকম জুতা রয়েছে।  এসব পণ্য একশ থেকে সাতশ টাকার মধ্যে বিক্রি করছেন তারা।

তবে এবছর ব্যবসা বিগত বছরের তুলনায় অনেক কম বলে জানিয়ে তিনি বলেন, করোনা মহামারী এবং তার পরবর্তী ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি সংকটে আছে।  যার প্রভাব বাংলাদেশেও পরেছে। তাই জিনিস পত্রের দামও কিছুটা বেড়েছে।  তবে সাধারণ মানুষের হাতে টাকা না থাকায় এবছর ব্যবসা খুবই সীমিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।

এসময় আবু সাঈদ নামে একজন ক্রেতা বলেন, ঈদ এলেই নগরীর ফুটপাতগুলো জমে ওঠে, মাঝেমাঝে খুব ভাল স্যান্ডেল, টিশার্ট, ব্যাগ ও পাঞ্জাবী পাওয়া যায় এসব দোকানে।  তাই সুযোগ পেলেই উকি মেরে দেখেন এসব দোকানের জিনিসপত্র।  তার মতে দামে স্বস্তা ও মানে ভাল হওয়ায় এসব দোকান ক্রেতাদের কাছে সবসময় আকর্ষণিয়।

এদিকে নগরীর চকবাজারে গিয়ে দেখা যায়, এখানে ফুটপাতের দোকানগুলোতে মেয়ে, বাচ্চা ও গৃহস্থলি পণ্যই বেশি বিক্রি হচ্ছে।  আশপাশে স্কুল কলেজ ও ছাত্রী নিবাস থাকায় চাহিদা অনুযায়ী দোকানপাট করেছে বলে জানান দোকানিরা।

এসময় চকবাজারে ফুটপাতের দোকানি মো. সাইফুল ইসলাম জানান, তার দোকানে বিছানার চাদর, বালিশের কাভার,  দরজা জানালার পর্দা, বাচ্চাদের বিছানা সহ বাসা বাড়ীর বিভিন্ন জিনিস পাওয়া যায়।  এগুলো খুবই সীমিত দামে বিক্রি করেন তিনি।  দুইশ থেকে পাঁচশ টাকার মধ্যে পাওয়া যায় এসব পণ্য।

সস্তায় জিনিসপত্র বিক্রির বিষয়ে তিনি বলেন, কমদামে কিনতে পারি তাই কম দামে বেচি।  তিনি নগরীর মিয়া সওদাগরের পুল থেকে এসব জিনিসপত্র কিনে আনেন।  তবে এবারের ঈদ বাজারে বেচা বিক্রি তেমন নেই বলেই জানালেন তিনি।

নগরীর জিইসি মোড় ফুটপাতে ছেলেদের জামা কাপড় বেশি লক্ষ্য করা গেছে।  নান রকম জিন্স, গাবাডিন্ট, গেঞ্জি, শার্ট, ক্যাজুয়াল, লুঙ্গি, পাঞ্জাবী সহ ছেলেদের টুকিটাকি অনেক কিছুই বিক্রি হচ্ছে এখানে।

ক্রেতারা বলেন, এখানে কাপড় চোপড়গুলো খুব সুন্দর, ফ্যাশন্যাবল ও মানসম্পন্ন হওয়ায় এখান থেকে কেনাকাটা করেন তারা। একই কাপড় মার্কেটের তুলনায় এখানে অনেক কম দামে পাওয়া যায় বিধায় তরুণ ও যুবক সকলের পছন্দ এই ফুটপাত।

এমোড়ে পাঞ্জাবি বিক্রেতা মো. আফছার বলেন, এবার পাঞ্জাবী বিক্রি করছেন তিনি।  ঢাকা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন কারখানা থেকে সংগ্রহ করেন এসব পাঞ্জাবী।  যেগুলো তিনশ থেকে সাতশ টাকার মধ্যে বিক্রি করছেন। এসব পাঞ্জাবীর সেলাই ও মান খুবই ভাল বলে জানান তিনি।  তবে সাইজ দেওয়া নিয়ে বাধে বিপত্তি। যেহেতু তারা কারখানা থেকে লটে কিনে নেয় তাই ক্রেতাদের পছন্দের পাঞ্জাবীটার সাইজ দেওয়া কষ্টকর হয়ে যায়।

তিনি বলেন, ফুটপাতের এসব দোকানে তেমন কোন খরচ নেই বলনেই চলে। শুধু লাইন খরচ দিয়ে ব্যবসা করছেন তারা।  এসব দোকানে কোন সালামি-ভাড়া নেই, কর্মচারিদের বেতন নেই, বিদ্যুৎ খরচ নেই বিধায় ক্রেতাদের কম দামে কাপড় বিক্রি করতে পারছেন তারা।

নগরীর আগ্রাবাদে রিয়াজ নামে একজন ফুটপাত ব্যবসায়ি জানান, প্রতি বছর ঈদে দৈনিক লাখ খানেক টাকা বিক্রি হয় তার দোকানে।  কিন্তু এবার বিক্রি অর্ধেকেরও কম। তার দোকানের বেশির ভাগ জুতাই বাইরের দেশ থেকে আমদানিকৃত। চট্টগ্রামের ইপিজেড ও আগ্রাবাদে তাদের গো-ডাউন (মজুতখানা) রয়েছে।  এখানে ফুটপাতের দোকানগুলোতে দেশিয় গার্মেন্টস থেকে তৈরি হওয়া জুতা, প্যান্টের পাশাপাশি পাওয়া যায় চায়না, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম সহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা সু ও ক্যাডস। এসব জুতা হাজার থেকে দুহাজারে পাওয়া যায়।

শুধু বড় বড় শপিং মল নয়, এবার ঈদে বিক্রি নেই ফুটপাতের ভাসমান দোকানগুলোতেও এমনই বলছেন ব্যবসায়ীরা। বিশ^ অর্থনীতির মন্দা কবে কাটবে সে বিষয়ে কারও সুস্পষ্ট ধারণা না থাকলেও আর কয়েকদিন পরেই ঈদ এটা সকলের কাছেই স্পষ্ট।  তাই প্রয়োজনীয় ও টুকিটাকি জিনিস কিনতে প্রিয়জনদের সাথে নিয়ে শুধু মার্কেটে নয়, ফুটপাতেও ভিড় জমাচ্ছেন ক্রেতারা।