চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী-চান্দগাঁও) আসনের উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ঘোষণা করা হবে আজ। দুপুরে আওয়ামী লীগের সংসদীয় মনোনয়ন বোর্ডের সভায় নৌকার প্রার্থী নির্ধারণ করা হবে।
২০২৪ সালের জানয়ারিতে যদি দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, সে হিসাবে ৭ মাসের জন্য চট্টগ্রাম-৮ আসনে প্রার্থী মনোনয়ন দেবে আওয়ামী লীগ। শহর আর গ্রামের মেলবন্ধনে গঠিত এই আসনে আগামী ২৭ এপ্রিল উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এই আসনটিতে এ নিয়ে দুই দফা উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ২০১৯ সালের ৭ নভেম্বর সংসদ সদস্য মইন উদ্দীন খান বাদল মারা গেলে প্রথম দফায় আসনটি শূন্য হয়।
এরপর ২০২০ সালের ১৩ জানুয়ারি উপনির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোছলেম উদ্দিন আহমদ। তিনি গত ৬ ফেব্রুয়ারি মারা যান। এরপর আসনটি দ্বিতীয়বারের মতো শূন্য হয়। ২০২০ সালের ১৩ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মোছলেম উদ্দিন আহমদের প্রতিদ্বন্দ্বি ছিলেন বিএনপির প্রার্থী আবু সুফিয়ান। কিন্তু এবার এই উপনির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না বিএনপি। কোনো শক্ত স্বতন্ত্র প্রার্থীও নেই। ফলে এই উপনির্বাচনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ থেকে যিনি মনোনয়ন পাবেন, তার জয় সুনিশ্চিত। তাই এই উপনির্বাচনকে সামনে রেখে ‘মনোনয়ন যুদ্ধে’ লড়ছেন ২৭ জন। এদের মধ্যে তরুণ-প্রবীণ নেতাদের পাশাপাশি রয়েছেন কয়েকজন শিল্পপতিও। রয়েছেন সাবেক দুই সাংসদের সহধর্মিনীও।
মনোনয়নপ্রত্যাশীরা হলেন-দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সহসভাপতি এস এম আবুল কালাম, চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ আবদুচ ছালাম, দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক মো. আবদুল কাদের সুজন, আওয়ামী লীগের শিল্প ও বাণিজ্য বিষয়ক উপকমিটির সাবেক সদস্য মো. সাইফুল ইসলাম, বোয়ালখালী উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য মোহাম্মদ খোরশেদ আলম, নগরীর ৫ নম্বর মোহরা ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের আহবায়ক কমিটির সদস্য আশেক রসূল খান, আওয়ামী লীগের আইন বিষয়ক উপকমিটির সদস্য এস এম কফিল উদ্দিন, নগরীর ৪ নম্বর মোহরা ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের আহবায়ক কমিটির সদস্য সেলিনা খান, নগর ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি এ টি এম আলী রিয়াজ খান, বোয়ালখালী উপজেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য মোহাম্মদ জাহেদুল হক, দক্ষিণ জেলা তাঁতী লীগের সহসভাপতি জহুর চৌধুরী, নগরীর ৫ নম্বর মোহরা ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের আহবায়ক কমিটির সদস্য সুকুমার চৌধুরী, আওয়ামী লীগের ধর্ম বিষয়ক উপকমিটির সাবেক সদস্য মো. হায়দার আলী চৌধুরী, যুক্তরাজ্য আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের সদস্য ব্যারিষ্টার মোহাম্মদ মনোয়ার হোসেন, বোয়ালখালী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সহসভাপতি মোহাম্মদ মনছুর আলম, চট্টগ্রাম-৮ আসনের প্রয়াত সংসদ সদস্য মোছলেম উদ্দিন আহমদের স্ত্রী শিরিন আহমদ, চট্টগ্রাম নগরীর ২২ নম্বর এনায়েত বাজার ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সদস্য আহমেদ ফায়সাল চৌধুরী, চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সদস্য বিজয় কুমার চৌধুরী, নগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নোমান আল মাহমুদ, নগর আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক মো. আবু তাহের, বায়েজিদ থানা আওয়ামী লীগের সদস্য কফিল উদ্দিন খান, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কৃষি ও সমবায় বিষয়ক উপকমিটির সাবেক সদস্য মুহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান, ৩ নম্বর পাঁচলাইশ ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সদস্য মো. এমরান, দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি সাইফুদ্দিন আহমেদ রবি, জাতীয় শ্রমিক লীগ চট্টগ্রাম মহানগরের সাধারণ সম্পাদক এ এ নুরুল ইসলাম, ছাত্রলীগের সাবেক উপ-দপ্তর সম্পাদক মাহাবুব রহমান এবং ওমর গনি এমইএস কলেজের জিএস আরশেদুল আলম।
৭ মাসের জন্য এই আসনে কে হচ্ছেন নৌকার কান্ডারি-চট্টগ্রামের রাজনৈতিক অঙ্গনে গত কয়েকদিন ধরে এ নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা চলছে। গত ২২ মার্চ দলীয় মনোনয়ন ফরম জমা দেওয়ার পর সম্ভাব্য প্রার্থীরা ঢাকায় অবস্থান করছেন। সেখানে তারা মনোনয়ন পেতে ক্ষমতাধর মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের শীর্ষ নেতাদের কাছে দৌড়ঝাঁপ করছেন। অনেকে সামাজিক যোগযোগ মাধ্যমকে ব্যবহার করে মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসেবে নিজেদের জানান দিচ্ছেন।
সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২৭ জন মনোনয়নপ্রত্যাশীর মধ্যে আলোচনায় এগিয়ে আছেন দুজন। এরা হলেন-সিডিএ’র সাবেক চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম ও প্রয়াত সংসদ সদস্য মোছলেম উদ্দিন আহমদের স্ত্রী শিরিন আহমদ।
দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্প পরিবার ওয়েল গ্রুপের চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম ওই সংসদীয় এলাকার মোহরায় বসবাস করেন। ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে এই আসনে তাকে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু মহাজোটের সমীকরণের কারণে মনোনয়ন পেয়েও শেষ পর্যন্ত তিনি ছিঁটকে পড়েছিলেন।
এরপর এই আওয়ামী লীগ নেতাকে সিডিএ’র চেয়ারম্যান করা হয়। টানা ১০ বছর চেয়ারম্যান ছিলেন তিনি। এ সময় ফ্লাইওভার, আউটার রিং রোডসহ বড় বড় মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করেন তিনি।
সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রগুলো জানিয়েছে, চট্টগ্রাম-৮ আসনের প্রধান সমস্যা হলো কালুরঘাট নেতু। যা ওই এলাকার মানুষের দীর্ঘ দিনের দাবি। প্রয়াত দুজন সংসদ সদস্য কালুরঘাট নতুন সেতু বাস্তবায়নের আশ্বাস দিয়েও তা করতে পারেননি। এ নিয়ে সরকারের প্রতি ওই এলাকার মানুষের মধ্যে চরম ক্ষোভ জন্মেছে। সরকারের জন্য এটা এখন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ অবস্থায় এই সেতু দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য উন্নয়নমূলক কাজে দক্ষ ও অভিজ্ঞ একজন জনপ্রতিনিধি প্রয়োজন। সেদিক থেকে চট্টগ্রামে বড় বড় মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা আবদুচ ছালাম হলেন সবচেয়ে উপযুক্ত।
সূত্রটি জানিয়েছে, আরও একটি কারণে আবদুচ ছালাম এগিয়ে রয়েছেন। সেটা হলো ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে এই আসনে তাকে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল। সেদিক থেকে মনোনয়ন দৌড়ে এবার তিনি এগিয়ে আছেন।
সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, চট্টগ্রামের একটি বড় শিল্প গ্রæপের কর্ণধার আবদুচ ছালামের মনোনয়নের জন্য সরকারের উচ্চ পর্যায়ে তদবির করছেন। এ ছাড়া চট্টগ্রামের একজন প্রভাবশালী নেতা, একজন মন্ত্রী ও দুজন এমপি ছালামের মনোনয়নের জন্য তৎপরতা চালাচ্ছেন।
এসব কারণে মনোনয়ন দৌড়ে এগিয়ে আছেন আবদুচ ছালাম।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আবদুচ ছালাম বলেন, ‘একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে আমি মনোনয়ন চাইছি। ২০০৮ ও ২০১৪ সালের সংসদ নির্বাচনেও চট্টগ্রাম-৮ আসন থেকে আমাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু মহাজোটের প্রার্থীর কারণে আমার নেত্রীর (প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা) সিদ্ধান্ত মেনে সরে দাঁড়িয়েছিলাম। এবার উপনির্বাচনে মহাজোটের কোনো সমীকরণ নেই। এই এলাকার উন্নয়নের জন্য নেত্রী যদি আমাকে উপযুক্ত মনে করেন, তাহলে ইনশাআল্লাহ তিনি নমিনেশন দেবেন।’
আবদুচ ছালামের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মনোনয়ন দৌড়ে এগিয়ে আছেন মোছলেম উদ্দিন আহমদের সহধর্মিনী শিরিন আহমদও। আবদুচ ছালামের সামনে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেন তিনি। কিন্তু শিরিন আহমদ আছেন সবার আড়ালে। ভোটের মাঠে তার কোনো তৎপরতাও নেই। মনোনয়নের জন্য তিনি কোনো দৌড়ঝাঁপও করছেন না। কিন্তু আড়ালে থেকেও নানা সমীকরণে দলীয় মহলে তিনি আলোচনায় আছেন।
জানা গেছে, শিরিন আহমদকে রাজনীতির মাঠে এখন প্রকাশ্যে দেখা না গেলেও তিনি ১৯৬৯ সালে চট্টগ্রাম নগরীর লালখান বাজার ওয়ার্ড ছাত্রলীগের নেত্রী ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের পর তিনি মহিলা আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত হয়েছিলেন। বিয়ের পর তিনি রাজনীতির মাঠ ছেড়ে দিলেও মোছলেম উদ্দিন আহমদের সকল রাজনৈতিক কর্মকান্ডে তিনি নেপথ্যে সহযোগিতা করেছেন। শিরিন আহমদ বোয়ালখালীর বাসিন্দা। তবে তিনি চট্টগ্রাম নগরীর লালখান বাজার হাইলেভেল রোডে বসবাস করেন।
জানা গেছে, ১৯৯৬ ও ২০০৬ সালে সরকারবিরোধী আন্দোলনের সময় আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, ওবায়দুল কাদেরসহ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা চট্টগ্রামে আসলে খাবার খেতে ছুটে যেতেন মোছলেম উদ্দিনের বাসায়। তাদেরকে নিজ হাতে রান্না করে আপ্যায়ন করতেন শিরিন আহমদ। সেই সুবাদে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় অনেক নেতার সঙ্গে শিরিন আহমদের সুসম্পর্ক রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও ব্যক্তিগতভাবে শিরিন আহমদকে চেনেন। ১৯৮০ সালে ভারতের দিল্লিতে একটি হোটেলে শেখ হাসিনাকে দেখতে গিয়েছিলেন শিরিন আহমদ।
সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, শিরিন আহমদ দৌড়ঝাঁপ না করলেও তিনি আড়ালে থেকে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করছেন। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গেও তার কথা হয়েছে।
সূত্রটি জানিয়েছে, দেশের বিভিন্ন উপনির্বাচনে অনেক প্রয়াত সংসদ সদস্যের স্ত্রীকে আওয়ামী লীগ সভাপতি মনোনয়ন দিয়েছেন। মোছলেম উদ্দিন এমপি হওয়ার তিন বছরের মাথায় মারা গেছেন। তিনি তার মেয়াদ শেষ করতে পারেননি। এ অবস্থায় মোছলেম উদ্দিনের বাকি থাকা মেয়াদ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী শিরিন আহমদকে সুযোগ দিতে পারেন।
জানতে চাইলে শিরিন আহমদ বলেন, ‘কালুরঘাট সেতু নিয়ে মোছলেম সাহেবের অনেক আক্ষেপ ছিল। তিনি এ নিয়ে ঢাকায় অনেক দৌড়ঝাঁপ করেছেন। কিন্তু তিনি সেটি করে যেতে পারলেন না। আমি মোছলেম সাহেবের এই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে মনোনয়ন চাইছি। রাজনীতিতে যাদের কোনো অভিজ্ঞতা নেই প্রধানমন্ত্রী এমন অনেক নেতাকে মূল্যায়ন করেছেন। তিনি কাকে কী করেন সেটা কেউ বলতে পারে না। আমিও সেই আশায় আছি। তবে আমার পলিটিক্যাল ক্যারিয়ার ছিল। ১৯৬৯ সালে আমি ছাত্রলীগ ও মহিলা লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলাম। পরে আমি সংসারের জন্য সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে আসি। তবে স্বামীর সকল রাজনৈতিক কর্মকান্ডে নেপথ্যে সহযোগিতা করেছি।’
আবদুচ ছালাম ও শিরিন আহমদ ছাড়া চট্টগ্রামের রাজনৈতিক অঙ্গনে এস এম আবুল কালাম ও প্রয়াত সংসদ সদস্য মইন উদ্দীন খান বাদলের স্ত্রী সেলিনা খানের নামও আলোচনায় আছে। কিন্তু নানা সমীকরণে মনোনয়ন দৌড়ে তারা পিছিয়ে আছেন বলে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে । দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সহসভাপতি আবুল কালাম হলেন বোয়ালখালীর বাসিন্দা।