ধর্মভিত্তিক দলগুলোর সাথে সখ্যতা বাড়াচ্ছে আওয়ামী লীগ

নির্বাচনী জোট গড়তে নানা পরিকল্পনা

অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য আন্তর্জাতিক নানা মহলের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে চাপ রয়েছে সরকারের ওপর।  ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারাও মনে করেন, আগামী জাতীয় নির্বাচনে গ্রহণযোগ্য ভোটের মাধ্যমেই আবার ক্ষমতায় আসতে হবে।  সেভাবেই ভোটের অংক কষতে হবে। বিষয়টি মাথায় রেখে নানা পরিকল্পনা নিয়ে সামনে এগোচ্ছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ।

সূত্রমতে, প্রচলিত সংবিধানের প্রতি অবিচল থেকেই চলছে ভোটের সব পরিকল্পনা।  এর অংশ হিসেবেই দেশের ধর্মভিত্তিক ছোট ছোট দল ও স্বাধীনতার সপক্ষের দলগুলোর সঙ্গে সখ্যতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে আওয়ামী লীগ।  সে ক্ষেত্রে পুরনো মিত্রদের সঙ্গে নতুন করে সম্পর্ক ও দেনা-পাওনার হিসাব ঝালাই করছে দলটি। আবার যেসব দল আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটে নেই, তাদের সম্পর্কের বাঁধনে আনতে চায় তারা। অন্যদিকে নিজ দলকে আরও সুসংগঠিত করতে এবং নেতাকর্মীদের চাঙা রাখতে আওয়ামী লীগ আগামী নির্বাচন পর্যন্ত নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে মাঠে থাকার পরিকল্পনা নিয়েছে।

আওয়ামী লীগের কয়েকজন সিনিয়র নেতার সাথে যোগাযোগ করা হলে তাঁরা জানান, দল টানা ক্ষমতায় থেকে পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, বঙ্গবন্ধু টানেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ দেশের অবকাঠামো খাতে যে উন্নয়ন করেছে তা অতীতে আর কোনো সরকার করতে পারেনি।  সরকারের এই উন্নয়নম‚লক কর্মকান্ড এখন অনেকাংশেই দৃশ্যমান।  ভোটের খেলায় এই উন্নয়নম‚লক কাজগুলো বড় ফ্যাক্টর হয়ে দেখা দেবে।  আবার ডিজিটাল থেকে স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার যে অঙ্গীকার রয়েছে সরকারের, তা আগামীতে যে কোনো উপায়ে ক্ষমতায় গিয়ে বাস্তবায়ন করতে চায় আওয়ামী লীগ।  দলের নেতারা মনে করেন, অন্যদল ক্ষমতায় গেলে দেশের উন্নয়ন কর্মকান্ড ব্যাহত হবে, দেশ আবার উল্টোপথে যাত্রা শুরু করবে।  তাই দেশের স্বার্থেই যে আওয়ামী লীগকে আবার ক্ষমতায় আনতে হবে- এ বিষয় জনগণের সামনে বারবার তুলে ধরারও উদ্যোগ নিয়েছে দলটি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে,বিভিন্ন স্থানে দলের নীতিনির্ধারণী মহল ধর্মভিত্তিক দল ও স্বাধীনতার সপক্ষের রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সখ্য বাড়ানোর চেষ্টা করছে। দেশের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় স্বাধীনতার চেতনা বিশ্বাসী দলগুলোকে ঐক্যবদ্ধ থাকার অপরিহার্যতা দফায় দফায় বৈঠক করে বোঝানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।  এরই মধ্যে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম নেতৃত্বাধীন কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, বাম গণতান্ত্রিক জোটের একটি দল, গণফোরাম, এবি পার্টি, সনাতন পার্টি, চরমোনাই পীরের ইসলামী আন্দোলন, হেফাজতে ইসলামসহ বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল ও সংগঠন ও বিশেষ ব্যক্তি আওয়ামী লীগের সঙ্গে থাকার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে।  এমনকি বিএনপিতে থাকা কয়েকটি শরিক দলও গোপনে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক সমীকরণের সঙ্গে হিসাব মেলাতে চাচ্ছে।  তারাও শেষ পর্যন্ত ভোটের খেলায় আওয়ামী লীগের সঙ্গে চলে আসবে বলে মনে করেন দলটির শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা।

অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার অভিপ্রায়ে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের পক্ষেই সমর্থন দিয়ে যাবে এমন ধারণাও আওয়ামী লীগের। এ ছাড়া হেফাজতে ইসলাম ও চরমোনাই পীরের ইসলামী আন্দোলন অনুগত না হলেও নানাবিধ বিবেচনায় আওয়ামী লীগের বিরোধিতা করবে না বলেও ক্ষমতাসীন দলটির নেতারা মনে করেন।  এতে করে একদিকে যেমন এসব ধর্মভিত্তিক দল ও সংগঠনের ভোট পাবে, অন্যদিকে আগামী নির্বাচনে ধর্মভিত্তিক মনোভাব নিয়ে অন্য কোনো দল যাতে সুযোগ নিতে না পারে সেদিকেও সফল হবে বলে মনে করেন তারা।

এদিকে যুগপৎ আন্দোলনে থাকা বিএনপিও শরীক দলগুলোর কোনো কোনোটি শেষ পর্যন্ত আন্দোলন থেকে সরে এসে কোনো একটি কৌশলে নির্বাচনে অংশ নেবে- হতে পারে সেটা স্বতন্ত্র কিংবা দলীয়ভাবে।  অন্যদিকে আওয়ামী লীগ বাম জোটকে স্বাধীনতার সপক্ষের দল মনে করে নিজের দিকে ভেড়াতে চাচ্ছে।  সে ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দলটি বিশেষ ক্ষেত্রে ছাড় দিতেও রাজি।  বোঝানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, একটি স্বাধীন দেশের ক্ষমতায় সরকার ও বিরোধী দল উভয় ক্ষেত্রেই স্বাধীনতার সপক্ষের দল থাকা জরুরি, যারা অসাম্প্রদায়িক দেশ গঠনে ঐক্যবদ্ধভাবে কিংবা পৃথকভাবে কাজ করবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর এক সদস্য বলেন, ‘নির্বাচন একটা কৌশলগত খেলা।  এই খেলায় অংশ নিতে কোনো বাধা নেই।  আওয়ামী লীগ দেশ ও মানুষের স্বার্থের কথা ভেবে যে কোনো কৌশল করেই ফের ক্ষমতায় আসতে চায়।  তবে ১৯৯১ কিংবা ২০০১ সালের নির্বাচনের মতো করে নয়।

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম দেশ বর্তমানকে বলেন, ‘আমরা আশা করি এবং একই সঙ্গে বিশ্বাস করি, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক, অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে।  সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন নির্বাচন পরিচালনা করবে।  এর কোনো ব্যত্যয় ঘটবে বলে আমার মনে হয় না।

আওয়ামী লীগ কৌশল করে ফের ক্ষমতায় আসতে চায় কিনা এমন একটি প্রশ্নের জবাবে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন বলেন, ‘আওয়ামী লীগের ভিন্ন কৌশল নেই।  বঙ্গবন্ধুর সময়ে যে কৌশল ছিল সে কৌশলেই এখনো আছে।  আওয়ামী লীগের কৌশল হলো সংবিধানের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে জনগণের রায়ের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস রেখে রাজনীতি করা এবং নির্বাচনে অংশ নেওয়া।  জনগণ যেদিকে রায় দেবে তারাই বিজয়ী হবে।  তবে আমাদের আশা জনগণ আওয়ামী লীগকে আবারও ক্ষমতায় আনবে, বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রী করবে।’

জাতীয় সংসদের হুইপ ও আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন বলেন, ‘আওয়ামী লীগ কোনোভাবেই বিএনপিকে বাইরে রেখে নির্বাচন করতে আগ্রহী নয়।  বিশ্বসেরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ স্থিতিশীল ও টেকসই গতিতে এগিয়ে চলছে।  এই এগিয়ে চলাকে আরও শাণিত করতে সব রাজনৈতিক দল, শ্রেণি ও পেশার লোকদের অন্তর্ভুক্তিমূলক অংশগ্রহণ অপরিহার্য।

এমতাবস্থায়, সব দলের অংশগ্রহণমূলক একটি অবাধ, নিরপেক্ষ নির্বাচন একান্ত আবশ্যক। এই আবশ্যকতা আওয়ামী লীগ উপলব্ধি ও বিশ্বাস করে বলেই বিএনপিকে নির্বাচনে আনার জন্য সব প্রচেষ্টা চালাবে।  তবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা বা না করার পূর্ণ গণতান্ত্রিক অধিকার বিএনপির রয়েছে।’