এ বছর (২০২৩) চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে এইচ এস সি পরীক্ষায় পাশের হার এবং জিপিএ- ৫, দু’টিতেই পিছিয়ে। কিন্ত মানতে নারাজ বোর্ড কর্তৃপক্ষ, শিক্ষক, অভিভাবক এবং সংশ্লিষ্টরা। এর জন্য দুষলেন তিন পার্বত্য এলাকার পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠির অপর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধাকে।
বুধবার (০৮ ফেব্রুয়ারি) সারাদেশে একযোগে প্রকাশিত হয়েছে ২০২৩ সালে অনুষ্ঠিত এইচ এস সি ও সমমানের পরীক্ষার ফল। সারাদেশে গড় পাশের হার ৮৫.৯৫ এবং জিপিএ-৫ প্রাপ্তদের সংখ্যা এক লাখ, ৭৬ হাজার ২৮২ জন। ১০টি শিক্ষা বোর্ডের ফলাফলে এগিয়ে রয়েছে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ড। তাদের পাশের হার ৯০.৭২ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছেন ১৪ হাজার ৯৯১ জন। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ঢাকা বোর্ড। তাদের পাশের হার ৮৭.৮৩ শতাংশ এবং জিপিএ- ৫ পেয়েছেন ৬২ হাজার ৪২১ জন। এর পর যথাক্রমে বরিশাল, যশোর ও সিলেটের স্থান। এ বছর চট্টগ্রামের অবস্থান ষষ্ঠ।
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, ২০২২ অনুষ্ঠিত পরীক্ষায় এর অধীনে ২৬৭ টি কলেজ থেকে ৯৩ হাজার ৯৯৭ জন পরীক্ষার্থী ফরম পূরণ করে। কিন্ত অংশ গ্রহণ করে ৯১হাজার ৯৬০জন। এই অংশ গ্রহণকারীদের সংখ্যার উপরেই পাশের হার নির্ধারন করা হয়। চট্টগ্রাম থেকে এবারে পাশ করেছেন ৭৪ হাজার ৩২ জন। পাশের হার ৮০.৫০ এবং জিপিএ -৫ পেয়েছেন ১২ হাজার ৬৭০ জন। এর আগে ২০২১ সালে অনুষ্ঠিত এইচ এস সি পরীক্ষায় পাশের হার ছিল ৮৯.৩৯ এবং জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ১৩ হাজার ৭২০ জন।
প্রাপ্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের এবারের এইচ এস সি পরীক্ষার ফলাফলে তুলনামূলক বিপর্যয় পরিলক্ষিত হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টরা সেটা মানতে নারাজ। বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোস্তফা কামাল আকতার পরীক্ষার ফল নিয়ে ঢাকায় অবস্থান করায় চেষ্টা করেও মোবাইলে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক নারায়ণ চন্দ্র নাথ এই প্রতিবেদককে জানান, এই ফলাফলকে কোনভাবেই বিপর্যয় বলা যাবেনা। কারণ বৃহত্তর চট্টগ্রামে তিনটি পার্বত্য জেলা ছাড়াও কক্সবাজারে বেশ কিছু দুর্গম এলাকা রয়েছে। সেখানকার মানুষ আর্থিকভাবে তেমন স্বচ্ছল নয়। অনেক পরিবার তাদের সন্তানদের উচ্চ শিক্ষার খরচ যোগাতে সক্ষম নয়। সে কারণে ওই এলাকার শিক্ষার্থীরা পড়া লেখায় অনেক পিছিয়ে আছে। শহরের ফল অনেক ভালো। দুর্গম এলাকার শিক্ষার্থীদের অগ্রসর করতে বোর্ডের ভূমিকা কি ? এর জবাবে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক বলেন, তাদের কাজ হচ্ছে সুষ্ঠভাবে পরীক্ষার ব্যবস্থা করা। পিছিয়ে পড়াদের ব্যাপারে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)ই পারে পদক্ষেপ নিতে। ২০১৮/১৯ সালের চেয়ে এবারের ফলাফল অনেক ভালো বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মুহাম্মদ সিকান্দার খান বলেন, ফলাফল নিয়ে হৈ চৈ করার কিছু নেই। সাম্প্রতিককালে পরীক্ষাগুলোতে সিলেবাস পুরোপুরি কাভার করা সম্ভব হয়নি। সে তুলনায় প্রাপ্ত ফল অনেক ভালো। প্রতি বছর পাশের হার ৮০ থেকে ৯০ বেড়ে যাবার হিড়িক পড়ে গেছে। এতে করে শিক্ষার মান বেড়ে গেছে- তেমনটি ভাবার কোন কারণ নেই। সিলেবাস সম্পন্ন করা, পরীক্ষা পদ্ধতি এবং সঠিক মূল্যায়ন এগুলোতে বেশি নজর দিতে হবে। পার্বত্য অঞ্চলে অনেক শিক্ষার্থী আছে যারা ঠিক মতো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যেতে পারেনা। এর পেছনে অনেক কারণ রয়েছে। তারা পড়ার চেয়ে অন্য কাজে বেশি ব্যস্ত থাকে। তাদের অনেকের সত্যিকার মাথা গোঁজার মতো বাড়ি ঘরই নেই। এই জনগোষ্ঠিকে শিক্ষার আলোতে সম্পৃক্ত করতে বিশেষ নজর দেয়ার উপর গুরুত্ব আরোপ করেন ইষ্ট ডেল্টা ইউনিভার্সিটির উপাচার্য সিকান্দার খান।
চট্টগ্রাম কলেজের অধ্যক্ষ (বর্তমানে অবসরে) অধ্যাপক মুজিবল হক প্রায় একই কথার পুনরাবৃত্তি করেন। তিনি বলেন, কুমিল্লার চেয়ে চট্টগ্রামের পরিসর অনেক বড়। চট্টগ্রামের পিছিয়ে পড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে তিনিও তিন পার্বত্য জেলার দুর্গম অঞ্চলের অপ্রতুল সুবিধাকে দায়ি করেন। সে তুলনায় শহর কেন্দ্রিক সুযোগ অনেক বেশি। পার্বত্য এলাকার শিক্ষার্থীরা অনেকে মেধাবী, পরিশ্রমী হলেও তারা শিক্ষার আলো থেকে অনেকাংশে বঞ্চিত।
চট্টগ্রাম সরকারি কমার্স কলেজের অধ্যক্ষ সুশান বড়ুয়া বলেন, এটা কোন বিপর্যয় নয়। পার্বত্য এলাকার চেয়ে শহরে পরীক্ষার ফল অনেক ভালো। শহরে পাশের হার ৯৯.৪৩। করোনা পরবর্তীতে অনেকের আর্থিক সঙ্গতি হ্রৃাস পেয়েছে। পার্বত্য এলাকায় তথ্য প্রযুক্তির সুবিধা এখনো অনেকের হাতে হাতে এসে পৌঁছায়নি।সঠিকভাবে তারা শিক্ষা গ্রহণ করতে পারছে না। তাদের কারণে পাশের হার কমে গেছে। মহসিন কলেজের শিক্ষার্থী কামরুল আহসানের পিতা আনোয়ারুল আলম ঘোষিত চট্টগ্রাম বোর্ডের সার্বিক ফলাফলে খুিশ বলে মত ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, যে সব ছাত্র ছাত্রী পড়ালেখায় দুর্বল, তাদের উপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। পার্বত্য এলাকাতেও সরকারকে সুযোগ সুবিধা বাড়াতে হবে।