লাভের আশায় কেনা লাগেজভ্যান এখন রেলের গলার কাঁটা

ঘাটতিতে চলা বাংলাদেশ রেলওয়ের আয়ের অন্যতম উৎস পরিবহন খাত। আর এই খাতকে আরও প্রবৃদ্ধি করতে ২০২০ সালের ১৩ আগস্ট রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ ও চীনের মধ্যে লাগেজ ভ্যান (মালামাল পরিবহনের বগি) সংগ্রহে দুটি চুক্তি সই হয়। এর প্রেক্ষিতে ৩৫৮ কোটি ৩৯ লাখ টাকা ব্যয়ে ১২৫টি লাগেজ ভ্যান কেনা হয়। যা ২০২৩ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে রেলওয়ের প্রতিটি ট্রেনে যুক্ত হওয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত মাত্র ১৫ ট্রেনে যুক্ত করা হয়েছে মাত্র ১৬টি ভ্যান। এর মধ্যে রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলে কোনো লাগেজ ভ্যান যুক্ত করা হয়নি। লাভের আশায় কেনা এসব লাগেজ ভ্যান যেন এখন বাংলাদেশ রেলওয়ের গলার কাঁটায় পরিণত হয়েছে।

সূত্রে জানা গেছে, ১২৫টি লাগেজ ভ্যানের মধ্যে ৭৫টি মিটারগেজ এবং ৫০টি ব্রডগেজ। এরমধ্যে ৭৫টি মিটারগেজ ভ্যানে রয়েছে ২৬টি রেফ্রিজারেটর। যা দিয়ে কৃষিপণ্যসহ মাছ-মাংস, দুধ ও পচনশীল পণ্য পরিবহন করার কথা থাকলেও এই ২৬টি রেফ্রিজারেটর পড়ে আছে রেলওয়ের ডক ইয়ার্ডে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আপাতত রেফ্রিজারেটর ভ্যানের প্রয়োজন পড়ছে না, তাই এর ব্যবহারও হচ্ছে না। আদৌ কী রেফ্রিজারেটর ও লাগেজ ভ্যানের প্রয়োজন ছিল? এমন প্রশ্ন সচেতন মহলের।

রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, ২০২৩ সালের ২ ডিসেম্বর প্রথম দফায় ১০টি ও পরে আরও ৪ দফায় মোট ৫০টি লাগেজ ভ্যান পশ্চিমাঞ্চলের সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানায় পাঠানো হয়েছিল। এরমধ্যে ২৮টি ভ্যান চলাচলের উপযোগী করে রেলের ট্রাফিক বিভাগে হস্তান্তর করা হলেও তা এখন পর্যন্ত পশ্চিমাঞ্চলের কোনো আন্তনগর (যাত্রীবাহী) ট্রেনে সংযোজন হয়নি।

পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের দেওয়া তথ্য মতে, চীন থেকে ৩৫৮ কোটি ৩৯ লাখ টাকা ব্যয়ে আনা ১২৫টি লাগেজ ভ্যানের মধ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে ১৫টি ট্রেনে মাত্র ১৬টি। যার মাসিক আয় গড়ে মাত্র ২২ লাখ টাকা। যদি এমন ধীর গতিতে চলতে থাকে তাহলে এর ব্যয়ভার তুলতে রেলের সময় লাগবে প্রায় ৪’শ বছর।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, আপাদমস্তক চিন্তা করলে বোঝা যায়, বাংলাদেশ রেলওয়ের এতোগুলো লাগেজ ভ্যানের প্রয়োজনই ছিল না। এছাড়া সঠিক পরিকল্পনা ও মার্কেটিংয়ের অভাবে লাগেজ ভ্যান থেকে আশানুরূপ তেমন আয় অর্জন সম্ভব হচ্ছে না।

১২৫টি লাগেজ ভ্যান আনা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রধান পরিকল্পনা কর্মকর্তা এস. এম. সলিমুল্লাহ বাহার দৈনিক দেশ বর্তমানের এই প্রতিবেদককে সঠিক কোনো উত্তর দিতে পারেননি। খোদ এই পরিকল্পনা কর্মকর্তা দোষ চাপাচ্ছেন মেকানিক্যাল ও ট্রাফিক কন্ট্রোল বিভাগের ওপর।

তিনি বলেন, মেকানিক্যাল ও কন্ট্রোলার অফিস যাচাই-বাছাই করে আমাকে দেন। আমি শুধু অ্যাপ্রুভ করি।

এখন প্রশ্ন থেকেই যায়, তাহলে পরিকল্পনা কর্মকর্তার কাজ কি? পরিকল্পনা কর্মকর্তা সলিমুল্লাহ বাহারের কথার সত্যতা যাচাই করতে বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রধান যন্ত্র প্রকৌশলী তাপস কুমার দাসের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনিও এর কোনো সঠিক জবাব দেননি। তবে ক্ষুদে বার্তায় দেশ বর্তমান প্রতিবেদককে জানান, রেলভবনে প্রেজক্ট ডিরেক্টরের কাছ থেকে সব তথ্য পাবেন।

এভাবেই রেল কর্মকর্তারা দুষছেন একে অপরকে। দায় নিতে নারাজ কেউ। তবে মুঠোফোনে বারবার ফোন দিয়ে চেষ্টার পরও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি প্রকল্প পরিচালক ও যুগ্ম মহাপরিচালক (লোকো) বোরহান উদ্দিনের সাথে।

প্রসঙ্গত, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থায়নে ‘রেলওয়ের রোলিং স্টক অপারেশন উন্নয়ন’ প্রকল্পের আওতায় ২০২০ সালের ১৩ আগস্ট চুক্তিতে সই করেন তৎকালীন প্রকল্প পরিচালক মো. মিজানুর রহমান এবং সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান চীনের সিএনটিক-রেলটেকো-জিনসি যৌথ কোম্পানির ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার ইয়াং বিং।