দেশের বাজারে চিনি নিয়ে অস্থিরতা কাটছেনা। পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে নিত্য প্রয়োজনীয় এ ভোগ্যপণ্যের দর নিয়ে ভোক্তাদের সাথে চলছে রীতিমত তামাশা। খোদ খাতুনগঞ্জের পাইকারি বাজারেও নির্ধারিত দরে মিলছে না চিনি। খাতুনগঞ্জের বেশিরভাগ পাইকারি দোকানে প্যাকেটজাত চিনি উধাও। বাজারে সংকটের ধূয়া তুলে রমজানের আগে আরও একবার দাম বৃদ্ধির শংকা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সর্বশেষ গত ২৬ জানুয়ারি খুচরা পর্যায়ে প্রতি কেজি পরিশোধিত খোলা চিনি ১০৭ টাকা এবং প্যাকেটজাত চিনি ১১২ টাকায় নির্ধারণের কথা জানায় চিনি পরিশোধনকারী মালিকদের সংগঠন-বাংলাদেশ সুগার রিফাইনার্স অ্যাসোসিয়েশন। কার্যকর হয়েছে ১ ফেব্রুয়ারি থেকে। এ নিয়ে গত পাঁচ মাসে চিনির দাম বাড়ানো হয়েছে চারবার। এতেও ব্যবসায়ীরা যেন সন্তুষ্ট নয়।
দেশের বৃহত্তম ভোগ্যপণ্যের পাইকারি বাজার-খাতুনগঞ্জ। গত ছয়-সাত মাস ধরে চিনির সরবরাহ কমে গেছে এ পাইকারি বাজারে। পাইকারি বিক্রেতারা বলছেন, পর্যাপ্ত পরিমাণ চিনি সরবরাহ দিতে পারছে না ডিলাররা। যার কারণে সংকট। খাতুনগঞ্জের কয়েকটি পাইকারি দোকান ও নগরের বিভিন্ন কাঁচাবাজার ঘুরে সংকটের এ চিত্র পাওয়া গেছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, খাতুনগঞ্জের বেশির ভাগ পাইকারি বাজারে প্যাকেটজাত চিনি নেই। একই অবস্থা রেয়াজুদ্দীন বাজারেও। আবার উল্টো চিত্র অভিজাতদের কাঁচাবাজার হিসেবে খ্যাত-কাজির দেউড়িতে। এ বাজারে আবার খোলা চিনির সংকট। প্যাকেটজাত চিনি বিক্রি হচ্ছে উচ্চ দরে।
খাতনুগঞ্জের পাইকারি দোকান মল্লিক স্টোরের স্বত্ত্বাধিকারি‘ উত্তম মল্লিকের সাথে আলাপকালে জানা যায়, প্রতি কেজি খোলা চিত্রি বিক্রি হচ্ছে ১০৮ টাকা করে। সাংবাদিক পরিচয় দেওয়ার পর দাম এক টাকা কমিয়ে ১০৭ টাকার কথা জানান তিনি। প্যাকেটজাত চিনি নেই এ দোকানে। কেন নেই জানতে চাইলে তিনি জানান, অর্ডার দেওয়া হয়েছে, এখনও পৌঁছায়নি। তার পাশের দোকান-মেসার্স সুলতান ট্রেডার্সে প্রতি কেজি খোলা চিনি বিক্রি হচ্ছে ১০৮ টাকা। আর প্যাকেটজাত সাদা চিনি বিক্রি হচ্ছে ব্যান্ডভেদে ১১২ থেকে ১১৩ টাকায়। প্যাকেটজাত লাল চিনির দাম ওঠেছে কেজি প্রতি ১৩০ টাকায়। খাতুনগঞ্জের আরেক পাইকারি দোকান মক্কা স্টোরের কর্মচারি সালাহ উদ্দিন জানান, বর্তমানে মণ প্রতি চিনির খরচ পড়ছে ৩৯৬০ টাকা। চিনি রিফাইনারী অ্যাসোসিয়েশন খুচরা পর্যায়ে যে দর নির্ধারণ করে দিয়েছে তার বেশি নেওয়া হচ্ছে না দাবি করলেও খোদ এ দোকানে চিনি বিক্রি হচ্ছে ১০৮ থেকে ১০৯ টাকায়। এ দোকানেও প্যাকেটজাত চিনি নেই। একই চিত্র হাজী আবুল খায়ের স্টোরে। খোঁজ করে মেলেনি প্যাকেটজাত চিনির। খোলা চিনি বিক্রি হচ্ছে ১০৮ টাকায়। অবশ্য দোকানের মালিক সালাহ উদ্দিন মাহাজী জানান, বেশি নিলে দাম আরও কম রাখা যাবে।
খাতুনগঞ্জের ন্যায় রেয়াজুদ্দীন বাজারে ইলিয়াছ ব্রাদার্সসহ বেশ কিছু দোকানির সাথে কথা বলে জানা যায়, খোলা চিনি ১০৮ থেকে ১০৯ টাকা এবং প্যাকেটজাত চিনি ১১২ থেকে ১১৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
খাতুনগঞ্জের পাইকারি বাজারে খোলা ও প্যাকেটজাত চিনির দর যদি সর্বশেষ বেঁধে দেওয়া দরে পাওয়া না যায়, তাহলে নগরের অন্য কাঁচাবাজার ও অলিগলির দোকানগুলোতে নির্ধারিত দরে চিনি দুষ্প্রাপ্য হওয়াটাই স্বাভাবিক। নগরের অভিজাতদের কাঁচাবাজার হিসেবে পরিচিত-কাজির দেউড়িতে প্রতি কেজি প্যাকেটজাত চিনি বিক্রি হচ্ছে ১১৪ থেকে ১১৫ টাকা। অথচ সর্বশেষ বেঁধে দেওয়া দর অনুযায়ি চিনি বিক্রির কথা ১১২ টাকায়। কাজির দেউড়ি সিডিএ মার্কেটের বাবুল স্টোরের মালিক মো. বাবুলের সাথে কথা বলে এ তথ্য জানা যায়। এ দোকানে খোলা চিনি নেই। একই বাজারের প্রিয়াংকা স্টোরে খোলা চিনি বিক্রি হচ্ছে ১১৩ টাকায় কিন্তু তালিকা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে ১০৬ টাকা। আসকার দিঘির পূর্বপাড়ে একটি দোকানে প্রতি কেজি খোলা চিনির দাম ১১০ টাকা, জামাল খাঁন লিচুবাগান প্রিয়াংকা স্টোরে প্রতি কেজি খোলা চিনি ১১৩ টাকা। রহমতগঞ্জের একটি গলির দোকানে খোলা চিনির দাম ১১৫ টাকা। তবে ভিন্ন চিত্র লক্ষ্য করা গেছে জামালখাঁনে নতুন গড়ে ওঠা বিলাসী শপিং মল-স্বপ্নে। সিটি গ্রুপের তীর ব্যান্ডের প্যাকেটজাত চিনির দাম ১০৭ টাকা।
কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশান অব বাংলাদেশ (ক্যাব), চট্টগ্রাম চ্যাপ্টারের সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন দেশ বর্তমানকে বলেন, সরকার যে দাম বেঁধে দেয় সে দামে প্রকৃতপক্ষে পণ্য পাওয়া যায় না। নানা অজুহাতে ব্যবসায়ীরা চিনির সংকটের কথা বলে রমজানের আগে আরও এক দফা দাম বৃদ্ধির পথ খুঁজছে। যার প্রভাব পড়বে ভোক্তা পর্যায়ে।
সরকার নির্ধারিত দরে বাজারে চিনি মিলছে না-এ ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ ফয়েজ উল্লাহ এ প্রতিবেদককে টেলিফোনে বলেন, আমরা নিয়মিত বাজারে অভিযান পরিচালনা করছি। খাতুনগঞ্জসহ অন্যান্য বাজারেও অভিযান পরিচালনা করা হবে।
তিনি বলেন, সরকার নির্ধারিত দরের চেয়ে বেশি দরে পণ্য বিক্রির অভিযোগ পেলে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।