ভূমিকম্পে নিস্তব্ধ তুরস্ক ও সিরিয়া

প্রাণহানি ২৩০০ ছাড়িয়ে গেছে

তুরস্ক ও সিরিয়ায় শক্তিশালী ভূমিকম্পে ২৩০০ লোকের প্রাণহানি ঘটেছে।  ৭.৮ মাত্রার এই ভূমিকম্পে দুই দেশের বিস্তীর্ণ এলাকার ঘরবাড়ি ও দালান কোটা পরিণত হয়েছে ধ্বংসস্তুপে।  তুরস্কে নিহতের সংখ্যা ১৫০০ ছাড়িয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম।  আহত হয়েছে আরও পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ। অন্যদিকে তুরস্কের প্রতিবেশী দেশ সিরিয়াতে ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৮১০ জন ছাড়িয়েছে।  দেশটিতে আহতের সংখ্যাও ২০০০ হাজারের বেশি।  উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসস্তুপের নিচে থেকে একের পর এক লাশ বের করে আনছেন।  সে কারণে নিহতের সংখ্যা আরো অনেক বেশি হতে পারে বলে আশংকা করা হচ্ছে।

তুরস্কে গাজিআনতেপে ৭.৮ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানার পর আরও একটি ৭.৫ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে ওই এলাকার আশপাশে।  সবমিলিয়ে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে।  খারাপ আবহাওয়ার কারণে অনেক জায়গায় ব্যাহত হচ্ছে উদ্ধারকাজ।

 

আবহাওয়ার পূর্বাভাস বলছে, তুরস্কের ভূমিকম্প কবলিত এলাকায় ভারী বৃষ্টি ও তুষারপাতের সম্ভাবনা রয়েছে।  আর তাপমাত্রাও নামতে পারে ৩-৪ ডিগ্রিতে।

প্রেসিডেন্ট এরদোগান বলেন, ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার হওয়া মানুষের সংখ্যা ২ হাজার ৪৭০ এ পৌঁছেছে।  ধসে পড়া ভবনের সংখ্যা ২ হাজার ৮১৮টি। বেঁচে যাওয়া অনেকে ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে প্রিয়জনদের জীবিত উদ্ধারের আশায় অপেক্ষা করছেন।

এদিকে তুরস্কে জরুরি পরিস্থিতি সামাল দিতে ১০টি উদ্ধারকারী দল পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কমিশনার জোসেপ বোরে ও জেনেজ লিনার্কিক জানিয়েছেন, শহর অঞ্চলে আটকে পড়াদের খোঁজ ও উদ্ধারকাজে দ্রুত যোগ দিতে বুলগেরিয়া, ক্রোয়েশিয়া, চেক, ফ্রান্স, গ্রিস, নেদারল্যান্ডস, পোল্যান্ড ও রোমানিয়া থেকে বিশেষ দল পাঠানো হয়েছে। ইতালি ও হাঙ্গেরিও উদ্ধারকারী দল পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছে। তুরস্কে উদ্ধারকর্মী ও ত্রাণ সহায়তা পাঠাচ্ছে পাকিস্তান।

তুরস্কে ভূমিকম্প কবলিত ১০ শহরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এক সপ্তাহের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।  দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট ফুয়াত ওকাত এই ঘোষণা দেন। কাহরামানমারাস, হাতে, গাজিয়ানতেপ, ওসমানিয়ে, আদিয়ামান, মালাতিয়া, আদানাসহ ১০ শহরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এক সপ্তাহ বন্ধ থাকবে।

এছাড়া হাতে প্রদেশের বিমানবন্দরে বিমান চলাচলও স্থগিত করা হয়েছে।  মারাস ও আন্তেপের বিমান বন্দরগুলোতেও বিমান চলাচল বন্ধ আছে।

সোমবার (০৬ ফেব্রুয়ারি) ভোরে সিরিয়া ও তুরস্কে ৭ দশমিক ৮ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে।  ভূকম্পন বিন্দু ছিল তুরস্কের গাজিয়ানতেপ।  স্থানীয় সময় ভোর ৪টা ১৭ মিনিটে ভূমিকম্প শুরু হয় বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের জিওলজিক্যাল সার্ভে।  গাজিয়ানতেপ শহরের কাছে এর গভীরতা ছিল মাত্র ১৭ দশমিক ৯ কিলোমিটার গভীরে।  এ সময়ে লোকজন ঘুমিয়ে ছিল।

গাজিয়ানতেপের এক বাসিন্দা বলেন, ‘৪০ বছর ধরে এখানে বাস করছি।  আজকের মতো এমন অনুভূতি কখনো হয়নি।’  কমপক্ষে তিনবার খুব ভালোভাবে ভূকম্পন অনুভূত হয়েছে বলেও জানান তিনি।

জানা গেছে, ১৯৯৯ সালের পর এটাই তুরস্কে সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প।  ওই ভূমিকম্পে সাড়ে ১৭ হাজার মানুষ নিহত হয়।

ইউনিভার্সিটি কলেজ অব লন্ডনের ভূকম্পনবিদ স্টিফেন হিকস বলেন, এর আগে ১৯৩৯ সালের ডিসেম্বরে তুরস্কের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে ৭ দশমিক ৮ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল।  ওই সময় ৩০ হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটে।

বাচ্চারা ধ্বংসস্তূপের নিচে জমে যাবে:

ভূমিকম্পে তুরস্ক ও সিরিয়ার বেশ কয়েকটি শহরে অনেক ভবন ধসে পড়েছে।  অনেকে ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়েছেন।  অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দল উদ্ধারকাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

দিয়ারবারকিরে কুর্দিশ বৃদ্ধ এক নারীকে দেখা যায় বিলাপ করছেন।  ভগ্নীপতি, ভাতিজি ও ভাতিজা ভবনের নিচে আটকা পড়েছেন।  তিনি তাদের জন্য অপেক্ষা করছেন। তার কিছু তরুণ প্রতিবেশী তাকে সমবেদনা জানাচ্ছিলেন।  তারা বলেন, উদ্ধারকারীরা একজনকে কিছুক্ষণ আগেই উদ্ধার করেছেন।  তোমার পরিবারকেও উদ্ধার করবেন। তবে এই নারী খুব বেশি আশা করছেন না, কারণ তার পরিবার ১২ তলা ভবনের একেবারে নিচতলায় বাস করতেন।

তিনি বলেন, তারা একেবারে নিচতলায় ছিল, ঘুমাচ্ছিল।  আমি জানি না, কেউ তাদের পর্যন্ত পৌঁছাতে পারবে কি না… খুবই ঠান্ডা।  বাচ্চারা ধ্বংসস্তূপের নিচে ঠান্ডায় জমে যাবে।  হঠাৎই সেখানে লোকজন তালি দেওয়া শুরু করে।  একজনকে উদ্ধার করা গেছে। তবে ওই ব্যক্তি ওই বৃদ্ধার আত্মীয় নন।  তবে কী! একজনকে উদ্ধার করা গেছে।  খুবই শীত পড়েছে, বৃষ্টি হচ্ছে।  একের পর এক কম্পনের কারণে কেউ নিজের বাড়িতে যেতে পারছেন না।

দিয়ারবারকিরে কমপক্ষে সাতটি ভবন ধসে পড়ছে।  ৩৩ জন নিশ্চিতভাবেই মারা গেছেন।  ১২ জনকে ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।  চারদিকে শুধু প্রাণহীন দেহ, কাঁদার লোকও নেই অনেক পরিবারে।

এখনও অসংখ্য মানুষ ধসে যাওয়া হাজার হাজার ভবনের নিচে চাপা পড়ায় মৃতের সংখ্যা কয়েক হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে