ঘূর্ণিঝড় ‘রেমাল’ মোকাবেলায় চট্টগ্রামে ব্যাপক প্রস্তুতি

প্রস্তুত ৩৮৮ আশ্রয়কেন্দ্র ও ৭ হাজার স্বেচ্ছাসেবক

ধেয়ে আসছে ঘূর্ণিঝড় ‘রেমাল’। পূর্ব-মধ্য বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন পশ্চিম-মধ্য বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত নিন্মচাপটি গভীর নিন্মচাপে রূপ নেওয়ার ফলে আগামীকাল রোববার সন্ধ্যা নাগাদ ঘূর্ণিঝড়টি দেশের খুলনা, সাতক্ষীরা ও চট্টগ্রাম উপকূলে আঘাত হানার আশঙ্কা জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। এ সময় উপকূলীয় এলাকায় ৭ থেকে ১০ ফুট উচ্চতায় জলোচ্ছ্বাস হতে পারে। এর প্রভাবে আজ শনিবার দুপুর থেকে বন্দর নগরী চট্টগ্রাম এবং এর আশেপাশের উপজেলাসমূহে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে সমুদ্র উপকূলে বইছে দমকা হাওয়া। কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের বাঁশখালী, আনোয়ারা, সীতাকুণ্ড, সন্দ্বীপ, মিরসরাই উপকূলীয় মানুষের মাঝে আতঙ্ক বিরাজ করছে। এদিকে ঘূর্ণিঝড় ‘রেমাল’ এর আঘাত ও জানমাল রক্ষায় ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, কোস্টগার্ডসহ সংশ্লিষ্ট সরকারী সেবাসংস্থাগুলো। প্রস্তুত রাখা হয়েছে ৩৮৮টি আশ্রয়কেন্দ্র ও সাত হাজার স্বেচ্ছাসেবক। এছাড়া ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন ওয়ার্ডভিত্তিক কর্মসূচি গ্রহণ করেন।

চট্টগ্রামের পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়াবিদ মো. আলী আকবর খান বলেন, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্টি হওয়া গভীর নিম্নচাপটি ঘূর্ণিঝড় রেমাল-এ পরিণত হয়েছে। ইতোমধ্যে এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের প্রস্তুতি প্রাণহানিসহ ঘূর্ণিঝড়ের আঘাত থেকে জানমাল রক্ষায় চট্টগ্রামের উপকূলীয় পাঁচ উপজেলাসহ জেলার ১৫ উপজেলা ও সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ব্যাপক প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে বলে জানান চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক আবুল বাসার মোহাম্মদ ফখরুজ্জামান। দুপুরে জেলা প্রশাসক আরও জানান, ঘূর্ণিঝড়ের আঘাত ও জানমাল রক্ষায় চট্টগ্রামের উপকূলীয় পাঁচ উপজেলায় ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। প্রস্তুত রাখা হয়েছে ৩৮৮টি আশ্রয়কেন্দ্র ও সাত হাজার স্বেচ্ছাসেবক। দুর্যোগ পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রাথমিক চাহিদা মিটানোর জন্য ১৫টি উপজেলায় ত্রাণ হিসেবে চাল ও নগদ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারের লক্ষ্যে প্রস্তুত রাখার জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), জেলা মাধ্যমিক এবং প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রত্যেকটি উপজেলায় নির্বাহী কর্মকর্তারা জনপ্রতিনিধি ও বিভিন্ন দফতরের কর্মকর্তাদের নিয়ে ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় প্রস্তুতিমূলক সভা করছেন।

তিনি আরও বলেন, ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষতি এড়াতে উপকূলীয় এলাকার মানুষদের নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে এবং পাহাড় ধস এড়াতে পাহাড়ি এলাকার মানুষদের নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে মাইকিং করা হচ্ছে। এছাড়া প্রত্যেক মসজিদে জুমার নামাজের বয়ানে ঘূর্ণিঝড়ের বিষয়ে বলার জন্য ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে সব ইমামকে বলার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

অপরদিকে ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় কন্ট্রোলরুমসহ জানমালের ক্ষতি কমাতে ৪১টি ওয়ার্ডে ৯০টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন চসিক মেয়র মো. রেজাউল করিম চৌধুরী। ঘূর্র্ণিঝড় রেমাল আঘাত হানলে যেন সাধারণ মানুষের জানমালের ক্ষয়ক্ষতি সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখা যায় এবং দুর্যোগপরবর্তী পুনরুদ্ধার কাজ সর্বোচ্চ গতিতে পরিচালিত হয় সে ব্যাপারে সজাগ থাকতে ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের প্রতি আহ্বান জানান। ওয়ার্ড পর্যায়ে প্রস্তুতি সভা ও ঘূর্ণিঝড় রেমালের গতিবেগ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে জরুরি যেকোনো পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলেও জানান মেয়র।

অন্যদিকে ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় প্রস্তুতি নিয়েছে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব ওমর ফারুক। তিনি বলেন, এর আগে সমুদ্র বন্দরসমূহকে ১নং হুঁশিয়ারি সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হলেও বন্দরের কার্যক্রম স্বাভাবিক ছিল। তবে তিন নম্বর সংকেত দেখাতে বলার পর ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। বন্দরের স্টান্ডিং কমিটির মিটিং ও অন্যান্য বিষয়ে বিভিন্ন কমিটিকে অ্যালার্ট করা হচ্ছে। সব ধরনের লাইটার জাহাজকে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বলা হচ্ছে। ৫ নং সংকেত দেখাতে বললে জেটিতে থাকা জাহাজ বহির্নোঙরে পাঠিয়ে দেওয়া হবে।

সম্ভাব্য ঘূর্ণিঝড় রেমাল বাংলাদেশে আঘাত হানতে পারে বলে আশঙ্কায় ক্ষয়ক্ষতি মোকাবেলা সার্বিক প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। এর অংশ হিসেবে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) সব কর্মকর্তা ও কর্মচারীর ছুটি বাতিল করা হয়েছে। খোলা হয়েছে কন্ট্রোল রুম। গভীর নিন্মচাপের ফলে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্র বন্দরসমূহকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কতা সংকেত দেখাতে বলেছে আবহাওয়া অধিদফতর। একই সঙ্গে উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত সকল মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে অতিদ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বলা হয়।

শনিবার আবহাওয়া অধিদফতরের সর্বশেষ ৭ নম্বর বিশেষ বুলেটিনে এসব নির্দেশনা দেওয়া হয়। এতে আরও জানানো হয়, কন্ট্রোল রুমের মাধ্যমে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদফতর ও আন্তর্জাতিক আবহাওয়া সংস্থা থেকে হতে সার্বক্ষণিক ঘূর্ণিঝড়ের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ, পূর্বাভাস ও জলোচ্ছ্বাস সংক্রান্ত তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করা হবে। প্রতিষ্ঠানটির মাঠ পর্যায়ের দফতর থেকে উপকূলীয় বাঁধ, পোল্ডার ইত্যাদির ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ সংগ্রহ করা হবে।

ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে উত্তর বঙ্গোপসাগর এলাকায় গভীর সঞ্চরণশীল মেঘমালা সৃষ্টি অব্যাহত আছে। এর প্রভাবে উত্তর বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকা এবং সমুদ্রবন্দরগুলোর ওপর দিয়ে ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। সাগর উত্তাল রয়েছে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ১ নম্বর দূরবর্তী সতর্কসংকেত নামিয়ে তার পরিবর্তে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। উত্তর বঙ্গোপসাগর ও গভীর সাগরে অবস্থানরত মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারগুলোকে অতিদ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বলা হয়েছে।

এর অগ্রভাগের প্রভাব রবিবার দুপুরের পর থেকে উপকূলে বিভিন্ন অংশে বিভিন্ন রকম হবে জানিয়ে চট্টগ্রাম আবহাওয়া অধিদফতরের পরিচালক আবদুল বারেক বলেন, এর প্রভাবে জলোচ্ছ্বাসের সম্ভাবনা আছে দুই মিটার বা সাত ফুট পর্যন্ত। এটি বাড়তে পারে। যদি জোয়ার থাকে তখন ১০ ফুট পর্যন্ত হতে পারে। ভাটার সময় সাধারণ ঢেউ থেকে দুই মিটার পর্যন্ত বাড়বে।

তিনি আরও জানান, ঘূর্ণিঝড়টি ধেয়ে আসলে সতর্কসংকেত বাড়ানো হবে। এখন ৩ নম্বর স্থানীয় সংকেত আছে, তখন ৫, ৬ বা ৭ করা হবে। যদি সিভিয়ার সাইক্লোন বা প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেয়, তবে ৮, ৯ বা ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেত দেখানো হবে। রেমালের প্রভাবে সারা দেশে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাত হবে উল্লেখ করে এই আবহাওয়াবিদ বলেন, ২৪ ঘণ্টায় ৩০০ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টির সম্ভাবনা আছে। বিশেষ করে, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার জেলাতে বৃষ্টি বেশি হবে। এসব এলাকায় ভূমিধসের সতর্কবার্তা দেওয়া হবে।

কৃষি সম্প্রাসারণ অধিদফতর (চট্টগ্রাম অঞ্চল) উপ-পরিচালক মোহাম্মদ আবদুচ ছোবহান বলেন, চলতি মৌসুমের ৯০ শতাংশ বোরো ধান কাটা হয়ে গেছে। আগাম জাতের বোরো ফসলের চাষ করায় এবার ধান আগাম পেকেছে। ধান কাটা নিয়ে কৃষি অফিসের কর্মীরা মাঠে করছেন।