গৃহায়নের ভবনে ছাত্রলীগ নেতার টর্চারসেল

নিশানের ছত্রছায়ায় এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব

চট্টগ্রাম নগরীর ফিরোজশাহ কলোনী হাউজিং এস্টেটের সামনে কিশোর গ্যাং এর আক্রমন থেকে নিজের ছেলেকে বাঁচাতে গিয়ে আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরন করেন দন্ত চিকিৎসক কোরবান আলী।

জানা যায়, গত ৬ ফেব্রুয়ারি ভবনটিতে তিন কিশোরকে নির্যাতন করতে দেখে পুলিশে খবর দিয়েছিলেন নিহত কোরবান আলীর ছেলে আলী রেজা রানা। এর জের ধরে রানাকে বেধড়ক পিটিয়ে গুরুতর আহত করে সন্ত্রাসীরা।

এ বিষয় নিয়ে বাকবিতণ্ডার একটি অডিও রেকর্ড পাওয়া যায়। গত ৫ এপ্রিল আবারও সন্ত্রাসীরা রানার ওপর হামলা করে। রানাকে বাঁচাতে গিয়ে সন্ত্রাসীদের হামলায় গুরুতর আহত হন তাঁর বাবা চিকিৎসক কোরবান আলী। গত ১০ এপ্রিল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু ঘটে। এর পর সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও এখনও নিশানসহ তার দলের অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।

এ ঘটনায় গত ১১ এপ্রিল আকবরশাহ থানায় মামলা করেছিলেন নিহতের ছেলে রানা। মামলার মোট ১২ আসামির মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র তিনজনকে গ্রেপ্তার করতে পেরেছে পুলিশ। এখনও নিশানসহ তার সহযোগী ফয়জুল আকবর চৌধুরী আদর, আরিফুল্লাহ রাজু, মাহির সামি, আকিব, সোহেল ওরফে বগা সোহেল, প্রিন্স বাবু, অপূর্ব ও রিয়াদ পলাতক।

জানা যায়, ফিরোজশাহ হাউজিং এস্টেটে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের (জাগৃক) নির্মাণাধীন ১০ তলা ভবনটিকে স্থানীয়রা চেনেন ছাত্রলীগের সাবেক নেতা গোলাম রসুল নিশানের বিল্ডিং হিসেবে। এলাকায় কারও সঙ্গে সামান্যতম সমস্যা হলেই নিশানের সন্ত্রাসী বাহিনী লোকজনকে ধরে ওই ভবনে নিয়ে নির্যাতন করত। পাশাপাশি সেই ভবনের এক পাশে টিনের বেড়া দিয়ে বানানো একটি রুমে চলতো মাদকের আড্ডা যেখানে ইয়াবা মদ গাজা সহ নানান রকমের নেশাজাতীয় দ্রব্য সেবন করতো নিশান সহ তার অনুসারীরা।

ওই ভবনে কর্মরত নিরাপত্তা প্রহরী জানায় শুরুর দিকে আমরা যখন এখানে আসি এলাকার পরিস্থিতি দেখে আমি চলে যেতে চেয়েছিলাম। এই ভবনে দেদারসে লোকের যাতায়ত। জিজ্ঞেস করলেই বলতো এইটা নিশান ভাইয়ের বিল্ডিং।

কর্মরত নিরাপত্তা প্রহরী আরো জানান, কর্তৃপক্ষ বিষয়টি জানতো কিন্তু কোন ব্যাবস্থা নেয় নি। আমরা কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করলে আমাদেরকে বলা হয় ওদের বাঁধা না দিতে। ওরা ওদের মত করুক।

এই গোলাম রসুল নিশানের হত্যা ও হত্যা চেষ্টাসহ বেশ কয়েকটি ঘটনা থাকলেও কোন এক অদৃশ্যচাপে মুক্তি পেয়ে যান। অনেকটা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থাকেন তিনি। এর আগে ২০১৭ সালে জয়দাশ নামে এক যুবককে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে অন্ডকোষে ছুড়িকাঘাত করে হত্যা করে।

নিহত জয় দাশের বাবা সুবোধ দাশ বলেন, লক্ষী পূজার দিন বৃহস্পতিবার রাতে নিশানের সাথে আমার ছেলে জয়ের বাকবিতন্ডা হয়। পরদিন শুক্রবার সকালে কৈবল্যধাম আশ্রমের গেইটের পুর্বপাশে অতর্কিত হামলা করে আমার ছেলেকে ছুরিকাঘাত করে। হাসপাতালে নেওয়ার পথেই আমার ছেলে মারা যায়। এ ঘটনায় আমি মামলা করলে পুলিশ তিনজনকে গ্রেফতার করে। পরবর্তীতে তারা জামিনে বের হয়ে যায়। মামলা এখনো বিচারাধীন রয়েছে।

২০২০ সালের ১৩ অক্টোবর চয়ন বড়ুয়া নামে এক যুবককে মোটরসাইকেল রাখা নিয়ে বাকবিতন্ডায় জড়িয়ে মারধর ও হত্যা চেষ্টা করা হয়। কোনক্রমে প্রাণে বেঁচে যান ওই যুবক। এ ঘটনায় মামলা হলে নিশান, গাজী সোহেল, ও আকবর নামে তিনজন কোর্টে গিয়ে আত্মসমর্পণ করে। দুইজনের সাজা হলেও নিশান আগাম জামিনে বের হয়ে যায়। পরবর্তিতে ওই দুই যুবককে ও জামিনে বের করা হয়।

এ বিষয়ে ভুক্তভোগী চয়ন বড়ুয়া জানান, আমি বায়েজিদ থানা ছাত্রলীগের যুগ্ন আহ্বায়ক। সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন চলাকালীন সময় আমাদের ছাত্রলীগ ইউনিটের প্রোগ্রাম ছিলো আকবরশাহ থানাধীন ফিরোজশাহ কলোনী এলাকায়। সেখানে বাইক রাখাকে কেন্দ্র করে আমার সাথে বাকবিতন্ডায় জড়ায়। প্রোগ্রাম শেষে বর্তমান আল-আমিন হাসপাতালের বিপরীতমূখী রাস্তায় আমাকে আক্রমন করে আমার পিঠে ও পায়ে ছুরি দিয়ে বেশ কয়েকটি আঘাত করে। পরবর্তীতে মৃত্যু নিশ্চিত করতে পেটেও আঘাত করে। আমার নড়াচড়া বন্ধ হয়ে গেলে তারা মৃত ভেবে আমাকে রাস্তায় রেখে পালিয়ে যায়। পরে স্থানীয়রা আমাকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়।

তিনি আরও বলেন, এ ঘটনায় আমি মামলা করেছিলাম। তবে পুলিশের কাছ থেকে যথাযথ সহযোগিতা পাইনি।

এ বিষয়ে আকবরশাহ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা গোলাম রাব্বানী বলেন, নিহত ডাক্তার কোরবান আলীর ছেলে শুরুতে থানায় একটি হত্যাচেষ্টা মামলা করেন। পরবর্তীতে তার মৃত্যুর পর সেটা হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়। আমরা ইতোমধ্যে তিনজনকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছি। বাকিদের গ্রেফতার চেষ্টা অব্যহত আছে।