দরজায় কড়া নাড়ছে পবিত্র ঈদুল ফিতর। পরিবার আর আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করতে ঘরমুখী ঈদযাত্রীরা। ভোগান্তি এড়াতে কেউ কেউ আগেই রওয়ানা দিয়েছেন। ঈদ সামনে রেখে গত কয়েকদিন ধরে বাস-ট্রেনসহ নানানভাবে চট্টগ্রাম ছাড়ছে হাজার হাজার মানুষ। ফলে ধীরে ধীরে ফাঁকা হতে শুরু করেছে বাণিজ্যিক রাজধানী খ্যাত বন্দর নগরী চট্টগ্রাম। ঈদের ছুটি এবং পহেলা বৈশাখকে ঘিরে চট্টগ্রাম মহানগরীতে তিন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা বজায় থাকার কথা বলেছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ-সিএমপি। অন্যদিকে, নগরীতে আসন্ন ঈদুল ফিতরের জামাতের স্থান ও সময় নির্ধারণসহ ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন।
সোমবার দুপুরে সিএমপি কার্যালয়ে শীর্ষ কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠককালে সিএমপি কমিশনার কৃষ্ণ পদ রায় বলেন, ঈদের ছুটি এবং পহেলা বৈশাখকে ঘিরে চট্টগ্রাম মহানগরীতে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। আশা করি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকবে।
পুলিশ কমিশনার আরও বলেন, খুব কম সংখ্যক পুলিশ সদস্য এবার ঈদের ছুটিতে যাবেন। যারা যাবেন তাদের বেশিরভাগ আবার পহেলা বৈশাখের আগে ফিরে আসবেন।
চট্টগ্রাম রেলওয়েস্টেশন, কদমতলী আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল, কদমতলী বাস টার্মিনাল, বহদ্দার হাট বাস টার্মিনাল, স্টেশন রোড, বিআরটিসি বাসস্টেশন, গরিবুল্লাহ শাহ মাজার গেট, অলংকার মোড়, একে খান ও সিটি গেট এলাকার বাস কাউন্টারগুলোতে ভোর থেকে রাত পর্যন্ত ঘরমুখো মানুষের ভিড় দেখা যায়। ট্রেনের অগ্রিম টিকিট যারা কেটেছেন এবং যারা স্ট্যান্ডিং টিকিট পেয়েছেন তাদের ভ্রমণ কিছুটা আনন্দদায়ক হলেও বাসের যাত্রীদের ভোগান্তি বেশি। বাসে দূরপাল্লার যাত্রীরা সহজে পাচ্ছেন না টিকিট। অনেক ক্ষেত্রে বাড়তি টাকায় টিকিট বিক্রির অভিযোগও আছে।
ঢাকাগামী কক্সবাজার এক্সপ্রেসের যাত্রী আফরোজা, ইকবাল হোসেন, ফারাজানাসহ বেশ কিছু যাত্রী দৈনিক দেশ বর্তমানকে বলেন, এবার টিকিট ছাড়া কেউ যেতে না পারায় কোনো ঠেলাঠেলি কিংবা ধাক্কা-ধাক্কি নেই। ফলে আরামে ঢাকা ফিরতে পারবো। আমাদের এবারের ট্রেনে বাড়ি ফেরার অনুভূতি অন্যরকম।
দামপাড়া থেকে রাজশাহীগামী বাসযাত্রী মো. ফারুক বলেন, অনেক কষ্ট করে টিকিট সংগ্রহ করেছি। এবার বাড়ি ফিরতে পারলেই বাঁচি। আশা করি বাড়িতে পরিবারের সাথে সুন্দরভাবে ঈদ উদযাপন করে আবার ফিরতে পারব।
এবার ঈদের আগে ও পরে ছুটি থাকায় অনেকেই বাড়ি যাচ্ছেন। ঈদের ছুটি শুরু হলে স্বাভাবিকভাবেই বাস ট্রেনসহ সবখানেই যাত্রীদের চাপ বাড়ে। এজন্য অনেকে আগেভাগেই পরিবারের সদস্যদের বাড়ি পাঠাচ্ছেন। গত শনি-রোববার থেকে অনেকেই চট্টগ্রাম ছেড়েছেন। সোমবারও অনেকে বাড়ি ফিরছেন।
চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনের মাস্টার শফিকুল ইসলাম বলেন, বেশ কয়েকদিন থেকে সব ট্রেনে যাত্রী পরিপূর্ণ। ছাদে কোন যাত্রী উঠতে দেওয়া হচ্ছে না। কোনো অপ্রীতকর ঘটনা যাতে না ঘটে এবং যাত্রীরা যাতে নিরাপদ গন্তব্য পৌঁছাতে পারে সেইজন্য আমরা সতর্ক অবস্থানে আছি।
এদিকে ঈদুল ফিতরের ছুটিতে ফাঁকা বাসা, ব্যাংকসহ বন্ধ বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তায় ১২টি নির্দেশনা দিয়েছে সিএমপি। তাতে বাসার নিরাপত্তায় দরজায় অধিক তালার ব্যবহার করা, নগদ অর্থ বা স্বর্ণালংকার ফাঁকা বাসায় রেখে না যাওয়া, সিসিটিভি ক্যামেরা ও অ্যালার্ম সিস্টেমের মতো প্রতিরোধমূলক ডিজিটাল নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া, অতিরিক্ত নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ করার কথা বলা হয়।
অন্যদিকে, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে প্রতিবছরের ন্যায় এবারও জমিয়তুল ফালাহ জাতীয় মসজিদ ময়দানে ঈদুল ফিতরের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হবে। প্রথম জামাতের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে সকাল ৮টায় এবং দ্বিতীয় জামাত সাড়ে ৮টায়। প্রথম ও প্রধান জামাতে ইমামতি করবেন জমিয়াতুল ফালাহ জাতীয় মসজিদের খতিব হযরতুল আল্লামা সৈয়দ আবু তালেব মোহাম্মদ আলাউদ্দীন আল কাদেরী, দ্বিতীয় জামাতে ইমামতি করবেন পেশ ইমাম হাফেজ মাওলানা আহমদুল হক। লালদীঘি চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন শাহী জামে মসজিদে ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হবে সকাল ৮ টায়।
এছাড়া, নগরীতে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের তত্ত্বাবধানে সকাল ৮ টায় আরও ৮টি মসজিদে ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হবে। মসজিদগুলো হলোÑ হযরত শেখ ফরিদ (রঃ) চশমা ঈদগাহ মসজিদ, সুগন্ধা আবাসিক এলাকা জামে মসজিদ, চকবাজার সিটি কর্পোরেশন জামে মসজিদ, জহুর হকার্স মার্কেট জামে মসজিদ, ক্ষিণ খুলশী (ভিআইপি) আবাসিক এলাকা জামে মসজি, আরেফীন নগর কেন্দ্রীয় কবরস্থান জামে মসজি, সাগরিকা গরু বাজার জামে মসজিদ ও মা আয়েশা সিদ্দিকী চসিক জামে মসজিদ (সাগরিকা জহুর আহমদ চৌধুরী স্টেডিয়াম সংলগ্ন)। এছাড়াও নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড কাউন্সিলরগণের তত্ত্বাবধানে ১টি করে প্রধান ঈদ জামাত স্ব স্ব মসজিদ অথবা ঈদগাহে অনুষ্ঠিত হবে।
বিকালে এক প্রেস বার্তায় ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়ে মেয়র বলেন, এক মাস সিয়াম সাধনা আমাদের ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান ভুলে সাম্যের সমাজ বিনির্মাণের শিক্ষা দেয়। শ্রেণীভেদ আর বৈষম্য ভুলে সমাজকে ঢেলে সাজানোর অনুপ্রেরণা যোগায় রমজান মাস। ঐতিহাসিকভাবেই ঈদ-উল-ফিতর ধর্মীয় ভেদাভেদ ভুলে সব ধর্মের মানুষদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বৃদ্ধির উৎসব হিসেবে স্বীকৃত।
উল্লেখ্য, আজ দুপুর ১২টায় জমিয়াতুল ফালাহ জাতীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে ঈদ জামাতের প্রস্তুতি পরিদর্শন করবেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী।