আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে দেশে বর্তমানে বিরোধী রাজনৈতিক মোর্চা মাঠ সর গরম করে রাখলেও ভিতরে ভিতরে অন্য রকম খেলার কথা শুনা যাচ্ছে। বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার ও বিরোধী দল বিএনপির মধ্যে তলে তলে একটা আপোষ বা সমঝোতার বিষয় এখন রাজনৈতিক সচেতন মহলে আলোচিত হচ্ছে। কেবল আসন নিয়ে দর কষাকষিই বাকী। সেটাও সময় সাপেক্ষ বলে মনে করছেন অনেকে।
এর অন্যতম কারণ প্রধান দুই রাজনৈতিক শক্তি এবং বামধারার দল সমূহ , কেউই চাইছে না রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে আরেকটি এক এগারো মতো পরিস্থিতি তৈরি হোক। রাজনৈতিক নেৃতৃত্বের সংঘাত বা কাদা ছোঁড়াছুড়ির সুযোগ নিয়ে কোন অরাজনৈতিক শক্তি ক্ষমতায় আসুক।
চলতি বছরের শেষের দিকে অথবা আগামী বছরের (২০২৪) প্রথমার্ধে অনুষ্ঠিত হবে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। আসন্ন এই নির্বাচনকে সামনে রেখেই মূলত এই দুই প্রধান রাজনৈতিক দলে বইছে নতুন মেরুকরণ। আওয়ামী লীগ তার মিত্র শক্তিদের নিয়ে আরেক দফা ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য ঘর গোছাচ্ছে। অপরদিকে প্রধান বিরোধী দল বিএনপিও একই উদ্দেশ্যে দীর্ঘদিন পরে গা ঝাড়া দিয়ে মাঠে নেমেছে। ইতোমধ্যে তারা দল নিরপেক্ষ তত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত করার জন্য রাজধানী ঢাকাসহ দেশের সবকটি বিভাগীয় শহরে বড় বড় সমাবেশ করেছে। সরকারী দলও বিএনপির সমাবেশগুলোর বিরুদ্ধে পাল্টা সমাবেশের মাধ্যমে শো ডাউন করেছে।
ওই সমাবেশগুলো থেকে দুই দলেরই শীর্ষ নেতারা পরস্পরের বিরুদ্ধে যথারীতি বিষেধাগার অব্যাহত রেখেছে। সর্বত্রই মার মার কাট কাট অবস্থা। বিএনপির সমাবেশ নিয়ে দ্বিমুখী, ত্রিমূখী (আইন শৃঙ্খলা বাহিনীসহ) সংঘর্ষও কম হয়নি। সারাদেশে আহত ও নিহতের অনেক ঘটনাও ঘটেছে। বিএনপির মহাসচিব মীর্জা ফকরুল ইসলাম আলমগীরসহ অনেক শীর্ষ নেতা গ্রেফতারও হয়েছেন।
আপাতঃ দৃষ্টিতে দেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক দল স্পষ্টই মূখোমূখী অবস্থানে চলে গেছে। কিন্ত প্রকাশ্যে যেটা ঘটছে, সেটাই কি প্রকৃত চিত্র, এই প্রশ্ন এখন রাজনৈতিক সচেতন মহলের। তার মনে করছেন, বর্তমানে মাঠে ময়দানে যা কিছু দৃশ্যমান – সেগুলোই রাজনীতির প্রকৃত চিত্র নয়। নির্বাচনকে সামনে রেখে মূলত উভয় শক্তিই মাঠ গরম করছে মাত্র। ভিতরে ভিতরে একটা সমঝোতা প্রায় চূড়ান্ত। কেবল সংসদীয় আসন নিয়ে দর কষাকষির বিষয়টি ঝুলে আছে। এখন ৬০/৪০, আবার ৫৫/৪৫ অর্থাৎ ক্ষমতাসীন এবং বিরোধী দলে এমন আসন ভাগাভাগির সম্ভাবনার বিষয়ও উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না। এই বিষয়টিকে নিয়ে মাঠে হাঁড়ি ভাঙ্গার অবস্থা তৈরী করেছেন সিপিবি নেতা কমরেড মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে তিনি দুই প্রধান দলের এই আসন ভাগের বিষয়টি তুলে ধরেছেন।
রাজণেতিক সচেতন মহলের মতে, তিন তিনবারে প্রায় ১৪ বছরেরও অধিক সময় ক্ষমতার বাইরে থেকে বিএনপির একটি বড় অংশ এই মূহুর্তে কথিত দর কষাকষির মাধ্যমে নির্বাচনে যেতে মরিয়া। এর অন্যতম কারণ, দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থেকে নেতা কর্মীদের মাঝে এক ধরনের হতাশা চলে এসেছে। তাই নির্বাচনে অংশ গ্রহনের পাশাপাশি তারা তাদের আন্দোলন সংগ্রামও চালিয়ে যেতে চায়। এছাড়া দলের চেয়ার পারসন বেগম খালেদা জিয়ার বয়স হয়েছে, দীর্ঘদিন যাবৎ রোগাক্রান্ত । মামলা মাথায় নিয়ে তিনি বর্তমানে জামিনে রয়েছেন এবং সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক জিয়াও মামলা মোকাদ্দমায় জড়িয়ে বিদেশে অবস্থান করছেন। এই অবস্থায় নির্বাচনে অংশ না নিলে রাজনীতির মাঠ থেকে তাদের ছিটকে পড়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছে না।
রাজনৈতিক সচেতন মহলের মতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতারা প্রতিদিন যেভাবে একে অপরের বিরুদ্ধে বিষোদগার করে,তার অন্তরালে চলছে অন্য খেলা। এনিয়ে মিডিয়ায় নানা মুখরোচক খবরের জন্ম দিচ্ছে। পত্রিকার পাতা উল্টালে দু’দলের নেতাদের পরস্পরের বিরুদ্ধে কুৎসা, কটূক্তি, ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের হুল ফোটানো বক্তব্য চোখে পড়ে। টেলিভিশনের পর্দায়ও প্রতিদিন একই দৃশ্য অভিনীত হতে দেখা যায়।
২০২৪ সালে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনকে ঘিরে দু’দলের এমন যুদ্ধংদেহী মনোভাব। বিএনপি নেতারা বলছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হতে পারে না। তাই তাঁরা নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য দাবি জানাচ্ছেন। দেশে যে নির্বাচন কমিশন আছে, তার ওপরও তাঁরা আস্থা রাখতে পারছেন না। তাঁরা তত্ত্ববধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল করতে বলছেন। পক্ষান্তরে আওয়ামী লীগের বক্তব্য হচ্ছে, তত্ত্বরধায়ক সরকার পদ্ধতি সাংবিধানিকভাবে বাদ দেয়া হয়েছে। তাকে আবার ফিরিয়ে আনার সুযোগ নেই। দলীয় সরকারের অধীনেই নির্বাচন হবে। নির্বাচন কমিশনই নির্বাচন পরিচালনা করবে।
কিন্তু এহ বাহ্য। ভিতরের ব্যাপার নাকি অন্যকিছু। ওপরে বাকযুদ্ধে লিপ্ত হলেও তলে তলে সমাঝোতার প্রক্রিয়াও কার্যকর রয়েছে উভয় দলের মধ্যে। পর্দার অন্তরালে দু’পক্ষের মধ্যে তৃতীয় কোন পক্ষের মধ্যস্থতায় অনানুষ্ঠানিক আলোচনাও চালু রয়েছে। বাইরে থেকে যতটা মারমুখী মনে হচ্ছে, ভেতরে তারা ততটা নয়। আসন ভাগাভাগির ভিত্তিতে বিএনপির সঙ্গে সমঝোতায় উপনীত হওয়ার জন্য আওয়ামী লীগের নীতি নির্ধারক মহল উদগ্রীব। সম্ভবত পঞ্চাশ, চল্লিশ ভাগ আসন নিয়ে এমন দর কষাকষি হচ্ছে। সিপিবি নেতা মুজাহিদুর ইসলাম সেলিম সম্প্রীতি ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে এমন মন্তব্য করেছেন।
কূটনীতিকরা এখনো আসরে অবতীর্ণ হননি। তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রতি তাঁরা যে সতর্ক দৃষ্টি রেখেছেন, তার লক্ষণ ইতিমধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। জাপান, আমেরিকার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মন্তব্য মিডিয়ায় এসেছে। যাতে স্পষ্টত ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে ক্ষমতাসীন মহল। বিশেষ করে পররাষ্ট্র মন্ত্রী এ কে এম আবদুল মোমেন তাঁর বিরক্তি চাপা না রেখেই তার প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।
গত নির্বাচনের পর থেকে বিএনপি অনেকদিন চুপচাপই ছিলো। গত বছর থেকে বিএনপি আড়ামোড়া ভেঙে গা ঝাড়া দিয়ে ওঠে। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কর্মসূচি দিয়ে আস্তে আস্তে মাঠ গরম করার চেষ্টা চালায়। দেয়ালে পিঠ ঠেকে যায় তাদের। ততদিনে বিএনপির অনেক ঝড়-ঝাপেটা বয়ে যায়।
দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা হলে তিনি গ্রেফতার হন। ইতিমধ্যে তাঁর সাজা হয়। অনেকদিন জেলে থাকার পর অসুস্থ হয়ে পরায় এখন তাঁকে বাসায় থাকার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিরুদ্ধেও মামলা হলে তিনি বিদেশে চলে যান। এমনি পরিস্থিতিতে বিএনপি ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা চালাচ্ছে। ছোট কর্মসূচির সাফল্যে বিএনপি নেতৃবৃন্দ উৎসাহিত হয়ে ওঠেন এবং ক্রমশ বড় কর্মসূচি দিতে থাকেন। ইতিমধ্যে তাদের দু’তিনটি বৃহৎ কর্মসূচি জনসমর্থন লাভে সক্ষম হয়। কর্মসূচির পাশাপাশি বিএনপি নেতৃবৃন্দ সমানে বক্তৃতা বিবৃতি দিয়ে চলেছেন। আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ বলছেন দেশে গণতন্ত্র না থাকলে বিএনপি এভাবে সরকারের সমালোচনা করতে পারতো না।