‘আমরা আড়ালে থেকে কথা বলতেছি, একে একে সবার মোবাইল কেড়ে নিয়ে নিচ্ছে। আপনারা চিন্তা করিয়েন না, আল্লাহ ভরসা ভাগ্যে যা আছে তাই হবে’। ভারত মহাসাগরে সোমালিয়ার জলদস্যুদের হাতে জিম্মি বাংলাদেশি জাহাজ এমভি আবদুল্লাহর ২৩ নাবিকের মধ্যে আনোয়ারা-কর্ণফুলীর ৪ নাবিকদের তাদের পরিবারের সাথে এটাই ছিলো শেষ যোগাযোগ।
তারা হলেন, আনোয়ারা উপজেলার বৈরাগ ইউনিয়নের উত্তর বন্দর এলাকার মৃত আইয়ুব আলীর ছেলে শামসু উদ্দীন শিমুল (৩৫), গাজী মিয়ার পুত্র সাজ্জাদ হোসেন (৩০), বদলপুরা গ্রামের আক্তার উদ্দীনের পুত্র আসিফুর রহমান (২৪) ও কর্ণফুলী উপজেলার দক্ষিণ শাহমীরপুর গ্রামের মৃত আমীন শরীফের ছেলে নুরু উদ্দীন (৩৫)।
নাবিকদের বাড়ি গিয়ে সরেজমিনে দেখা যায়, স্বজনদের আহাজারিতে তাদের পুরো এলাকা ভারি হয়ে গেছে। চিন্তার ভাজ আর ছেলে ভাইদের ফিরে পাওয়ার শঙ্কা ভর করেছে এসব পরিবারের চোখেমুখে।
জানা যায় গত নভেম্বরের ২৭ তারিখ বাড়ি থেকে শেষ বারের মতো বের হয় আনোয়ারা উপজেলার উত্তর বন্দর গ্রামের মোঃ গাজু মিয়া ও শম্সাদ বেগম দম্পতির ছেলে মোঃ সাজ্জাদ হোসেন (৩০), যাওয়ার একদিন আগেই খালাতো বোনের নাসমিন আক্তার নুপুরের সাথে পারিবারিক ভাবে মোটামুটি বিয়ের কথাবার্তা হয় সাজ্জাদের। তবে কথাবার্তার পূর্ণতা এখন শঙ্কায় পতিত হলো। এমনটি জানিয়ে এবি মো. সাজ্জাদ হোসেনের ছোটো ভাই মোঃ মাকসুদ মিয়া। মাকসুদ মিয়া ছাড়াও সাজ্জাদের আরও তিনটি ভাই রয়েছে। তারা হলেন মোস্তাক মিয়া, মোশাররফ মিয়া ও মারুফ মিয়া।
সাজ্জাদ হোসেনের পিতা গাজু মিয়া জানান, আমি কুলি কাজ করছি, নৌকার মাঝি ছিলাম। অনেক কষ্ট করে ছেলেকে মানুষ করেছি। আমার সোনার টুকরো ছেলেটা এখন কেমন আছে কি অবস্থায় আছে কিছুই বলতে পারছি না। গতকাল (বুধবার) সন্ধ্যা ৬টা
৪৫ মিনিটে ভয়েস দিয়ে আমার ছেলে জানিয়েছিলো “আমরা আড়ালে থেকে কথা বলতেছি, একটু পর মোবাইল নিয়ে নিবে”। সে-ই থেকে আর যোগাযোগ হয়নি। আমার ছেলে ন্যাশনাল মেরিটাইম ইনস্টিটিউটের ১৫তম ব্যাচের ছাত্র। জাহাজে যাওয়ার আগে পরীক্ষার কারণে দীর্ঘদিন বাড়িতে ছিলো সে।
নিজের সন্তানের কথা উল্লেখ করে বদলপুরা গ্রামের আরেক নাবিক আসিফুর রহমানের পিতা আক্তার উদ্দীন বলেন, আমার দুই ছেলে আতিক ও আসিফ দুই জনেই জাহাজে চাকরি করে এক মেয়ে নাজনীন। আসিফ ছিলো দ্বিতীয়। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সে আমাদের জানায় যে, তাদের জাহাজটি দস্যুদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। দস্যুরা ফোন নিয়ে ফেলছে তাঁর সাথে আর যোগাযোগ হবে না। এর পর আজ (বুধবার) আমরা অভিভাবকেরা সবাই কোম্পানির মালিকের কাছে গিয়েছি তারা আমাদের আশ্বাস দিয়েছে যে তারা আমাদের সন্তানদের ফিরিয়ে আনবে।
উপজেলার বৈরাগ ইউনিয়নের সেন্টার এলাকায় আরেক নাবিক শামসু উদ্দীন শিমুল। তিন মেয়ের জনক শামসুদ্দিন গত তিন বছর আগে জাহাজে চাকরি নেন। বছরে ছয় মাস সমুদ্রে থাকেন। অবশিষ্ট ছয় মাস থাকেন বাড়িতে। সর্বশেষ গত ডিসেম্বরে জাহাজে ওঠেন শামসুদ্দিন। জুনের দিকে তাঁর ঘরে ফেরার কথা ছিলো তার। মঙ্গলবার বিকেল চারটার স্বামী (শামসুদ্দিন) সাথে কথা হয় স্ত্রী ফারজানা সুলতানার। এপ্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমার স্বামীর শেষ কথা ছিলো, ‘জাহাজে জলদস্যু উঠতে চেষ্টা করছে, দোয়া করিও, আমাদের জন্য দুশ্চিন্তা করিও না।’ জানিনা তিনি এখন কেমন আছেন। আমার ছোটো ছোটো অবুঝ মেয়েদের চেহেরার দিকে তাকালে বুকটা পেঠে যাচ্ছে।
পর্শ্ববর্তী কর্ণফুলী উপজেলার জাহাজে থাকা আরেকজন নাবিক নুরু উদ্দীনের মা ইসলাম খাতুন জানান, সন্তানের সাথে শেষ কথা হয়েছে কাল সন্ধ্যায়। এসময় ছেলে ফোনে বলে তাদের মোবাইল ফোন কেড়ে নিচ্ছে দস্যুরা। সবাইকে দোয়া করতে বলে। এরপর আর কথা হয়নি। এদিকে সকালে জাহজটির মালিকানা প্রতিষ্ঠান কেএসআরআম অফিসে যোগাযোগ করতে ছেলের স্ত্রী ও স্বজনরা গেছে। এখন শুধু একটাই চাওয়া কলিজার সন্তানকে সুস্থভাবে ফিরে পাওয়া।
এর আগে গতকাল বাংলাশে সময় বেলা দেড়টার দিকে জলদস্যুরা জাহাজ এমভি আবদুল্লাহর নিয়ন্ত্রণ নেয়। চট্টগ্রামের কবির গ্রুপের এই জাহাজ পরিচালনা করছে গ্রুপটির সহযোগী সংস্থা এস আর শিপিং লিমিটেড। ২০১০ সালে গ্রুপটির জাহাজ ‘এমভি জাহান মণি’ ছিনতাই করেছিল সোমালিয়ার জলদস্যুরা। তিন মাসের মাথায় মুক্তিপণ দিয়ে জাহাজটি ছাড়িয়ে এনেছিল কবির গ্রুপ।