চট্টগ্রাম পাসপোর্ট অফিসে পরিবর্তনের হাওয়া
পাসপোর্ট অফিস জনভোগান্তির সরকারি সেবামূলক একটি সংস্থা। ভোগান্তি এড়াতে বেশিরভাগ সেবাগ্রহীতা দালালের (পাসপোর্ট অফিস কেন্দ্রিক গড়ে ওঠা একটি চক্র) শরনাপন্ন হয়। হাতের লেখা ও এমআরপি (মেশিন রিডেবল) পাসপোর্টের ফরম পূরণ থেকে শুরু করে সরবরাহ পর্যন্ত সবকিছু দালালই করে দিয়েছেন। সেবাগ্রহীতাদের ধারণা পাসপোর্ট অফিসকেন্দ্রিক গড়ে ওঠা এসব চক্রের পাশাপাশি ট্রাভেল এজেন্সির লোকদের সাথে পাসপোর্ট অফিসের কর্মচারিদের আর্থিক লেনদেনের সুসম্পর্ক রয়েছে। তাদের মাধ্যমে পাসপোর্টের আবেদন করলে নির্ধারিত সময়ের আগে মিলে যায় কাংখিত পাসপোর্ট।
দীর্ঘ সময় ধরে লাইনে অপেক্ষা করেও পসপোর্ট আবেদন দাখিল করতে না পারা, আবেদন দাখিল করলেও সরবরাহে বিলম্বে, দালালের সাথে আর্থিক সমঝোতার বিষয়টি নিশ্চিত করা গেলে লাইনে দাঁড়ানোর ঝক্কি-ঝামেলার মুখোমুখি না হয়ে পাসপোর্টের আবেদন দাখিল এবং একই পন্থা অবলম্বন করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে পাসপোর্ট হাতে পাওয়া-এ ধরণের নানা অভিযোগ সেবাগ্রহীতাদের। চট্টগ্রামের দুই পাসপোর্ট অফিসের সেই চিরচেনা রূপ এখন পাল্টে গেছে। সবকিছুতে পরিবর্তনের ছোঁয়া। নেই পাসপোর্ট অফিসকেন্দ্রিক গড়ে ওঠা দালালদের হাঁকডাক, সেবাগ্রহীতাদের হয়রানির চিত্র।
তিন-চার বছর আগের চিরচেনা এসব চিত্র এখন প্রায় অদৃশ্য। সকাল নয়টায় অফিসের কর্মঘন্টা শুরুর অনেক আগে পাসপোর্টের আবেদন দাখিলের জন্য সেবাগ্রহীতাদের দীর্ঘ লাইন। বিশেষ বিবেচনায় বীর মুক্তিযোদ্ধা, বয়স্ক নারী-পুরুষ, শিশুসহ বয়স্ক মহিলারা উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের সাথে সরাসরি সাক্ষাত করে পাসপোর্টের আবেদন দাখিল, ফিঙ্গার প্রিন্টসহ যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা সেরে নিচ্ছেন। ই-পাসপোর্ট হাতে নিয়ে অনেকে আনন্দচিত্তে বইড় ফিরছেন। চট্টগ্রামের মনসুরাবাদ বিভাগীয় পাসপোর্ট ও ভিসা অফিস এবং পাঁচলাইশের আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের ভেতরে-বাইরের চিত্র সরেজমিনে পরিদর্শন ও সেবাগ্রহীতাদের সাথে আলাপচারিতায় এ তথ্য ওঠে এসেছে।
গত ২২ ও ২৩ জানুয়ারি পৃথক দুদিনে সকালে মনসুরাবাদ ও পাঁচলাইশ পাসপোর্ট অফিস সরেজমিনে দেখা গেছে, আবেদন জমা দেয়ার জন্য দীর্ঘ লাইন। দুপুর ২টার দিকেও দীর্ঘ লাইনের চিত্র। চট্টগ্রামের হাটহাজারী থেকে দুপুর ১২টায় সাধারণ ক্যাটাগরীর ই-পাসপোর্ট করতে এক দূরাত্মীয়কে নিয়ে মনসুরাবাদ পাসপোর্ট অফিসে এসেছিলেন বয়স্ক সেলিনা আক্তার। তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, কয়েকমাস আগে স্বামী মারা গেছেন। কোনো সন্তান নেই। তাই বাসার এক দূরাত্মীয়কে নিয়ে এসেছি পাসর্পোটের আবেদন দাখিল করতে। দীর্ঘ লাইন দেখে তিনি এক পুলিশ সদস্যের সাথে কথা বলেন। ওই পুলিশ অফিসের ডাইরেক্টরের সাথে যোগাযোগের পরামর্শ দেন। তার কথামতো ডাইরেক্টরের সাথে সাক্ষাত করে আবেদন দাখিল করি। বললেন, কোনো ঝামেলায় পড়তে হয়নি।
একই অফিসে পাসপোর্ট নিতে এসেছিলেন বাঁশখালীর আবদুল আজিজ। অফিস থেকে পাসপোর্ট নিয়ে বের হতে এ প্রতিবেদকের মুখোমুখি হন। তিনি জানান, বাবার পাসপোর্ট ডেলিভারী নেওয়ার জন্য ১৯ জানুয়ারি মোবাইলে ম্যাসেজ পায়। বাবার অসুস্থতার কারণে তিনি নিজে ২২ জানুয়ারি এসেছেন পাসপোর্ট ডেলিভারী নিতে। নিজের এনআইডিসহ ডাইরেক্টর স্যারের দেখা করে বাবার পাসপোর্ট সংগ্রহ করেন-যোগ করলেন এ ব্যক্তি।
পাঁচলাইশ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে এসেছিলেন চকবাজার এলাকার বাসিন্দা সানুম নাসিফা আলী। এমআরপি পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২০ এর সেপ্টেম্বরে। এমআরপি থেকে ই-পাসপোর্টে রূপান্তরের জন্য অনলাইনে আবেদন করলেও দাখিলের সময় কি ডকুমেন্টস লাগবে তা বিভিন্নজন ভিন্ন ভিন্ন মত দেন। এ বিষয়ে পরিচিত এক আত্মীয় সরাসরি উপপরিচালক কিংবা সহকারি পরিচালকের সাথে কথা বলার পরামর্শ দেন। ওই আত্মীয়ের কথামতো ২৩ জানুয়ারি সহকারি পরিচালকের সাথে সাক্ষাত করি। তিনি বিভিন্ন ডকুমেন্টমস দেখে আবেদন দাখিলের প্রক্রিয়া সম্পন্নের জন্য আমাকে সহয়তা করেছেন। এক্ষেত্রে কোনো জটিলতা কিংবা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়নি। কিন্তু তার সাথে সাক্ষাতের আগ পর্যন্ত পুরো বিষয়টি জটিল মনে হচ্ছিলো।
এদিকে দুই পাসপোর্ট অফিসের উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের সাথে আলাপকালে জানা যায়, দুই অফিসে গড়ে প্রায় ১৩শত আবেদন জমা পড়ছে। এরমধ্যে প্রায় ৮৫০টি আবেদন জমা পড়ছে মনসুরাবাদ অফিসে। প্রতিদিন বিতরণ হচ্ছে প্রায় ১২শত। এরমধ্যে ৮০০ এর মতো বিতরণ করা হচ্ছে মনসুরাবাদ বিভাগীয় অফিস থেকে। মনসুরাবাদ বিভাগীয় পাসপোর্ট ও ভিসা অফিসের পরিচালক মো. আবু সাইদ’র সাথে কথা বলে জানা যায়, বিদায়ী বছরে মনসুরাবাদ অফিসে পাসপোর্টর জন্য আবেদন জমা পড়েছে এক লাখ ৮০ হাজার ২০০টি। একই সময়ে বিতরণ হয়েছে এক লাখ ৬৭ হাজারটি। এরমধ্যে ৯৫ শতাংশ ই-পাসপোর্ট। এর আগের বছর (২০২১) ই-পাসপোর্ট ও এমআরপি মিলে আবেদনের সংখ্যা ছিলো এক লাখ ২১ হাজার ৩০০টি। একই সময়ে পাসপোর্ট বিতরণ হয়েছে এক লাখ ১৯ হাজার ৫০০টি। গাণিতিক হিসেবে ২০২১ সালের তুলনায় ২০২২ সালে ৫৮ হাজার ৯০০টি বেশি আবেদন জমা পড়ে এবং একই সময়ে বিতরণ বেড়েছে প্রায় ৪৮ হাজার। এ অফিসে প্রত্যেককে গড়ে ১২০ থেকে ১৩০টি পাসপোর্ট আবেদন তালিকাভূক্তির কাজ করতে হচ্ছে। অনেক সময় এ সংখ্যা ১৫০টিও অতিক্রম করছে। চট্টগ্রামের মুনসুরাবাদে ২০২০ এর ২৩ মার্চ ই-পাসপোর্টের কার্যক্রম শুরু হলেও পাঁচলাইশে শুরু হয় একই বছরের ২৮ জুন।
পাঁচলাইশ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস সূত্রে জানা যায়, এখানে শুধুমাত্র ই-পাসপোর্টের আবেদন জমা নেওয়া হচ্ছে। বিদায়ী বছরে ই-পাসপোর্টর জন্য আবেদন জমা পড়েছে এক লাখ ১৫ হাজার ৯০০টি। একই সময়ে সরবরাহ করা হয়েছে এক লাখ ১১ হাজার ২০০টি। অন্যদিকে ২০২১ সালে ই-পাসপোর্টর জন্য আবেদন জমা পড়ে নয় হাজার ৮৫৮টি এবং বিতরণ করা হয় সাত হাজার ৯৬৩টি। অর্থাৎ ২০২১ সালের ২০২২ সালে তুলনায় প্রায় ১২ গুণ বেশি ই-পাসপোর্টর আবেদন জমা পড়ে এবং ১৪ গুণ বেশি বিতরণ করা হয়। পাঁচলাইশ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের উপপরিচালক এ প্রতিবেদককে টেলিফোনে জানান, গড়ে প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৪৫০টি পাসপোর্টের আবেদন জমা পড়ছে এবং সরবরাহ করা হচ্ছে প্রায় ৩০০ থেকে সাড়ে ৩০০ এর মতো।
পাসপোর্টের আবেদন প্রক্রিয়াসহ নানা বিষয়ে কথা হয় মনসুরাবাদ বিভাগীয় পাসপোর্ট ও ভিসা অফিসের পরিচালক মো. আবু সাইদ এবং পাঁচলাইশ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের উপপরিচালক তারিক সালমানের সাথে। এ দুই শীর্ষ কর্মকর্তা অভিন্নভাবে বলেন, পুলিশ রিপোর্ট আসামাত্রই পাসপোর্ট প্রিন্টের জন্য ঢাকায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। মনসুরাবাদ বিভাগীয় অফিসের পরিচালক এ প্রতিবেদককে বলেন, এনআইডির সাথে আবেদনের তথ্যের গরমিল না থাকলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পাসপোর্ট পেয়ে যাচ্ছে আবেদনকারীরা। রোহিঙ্গাদের নামে পাসপোর্ট ইস্যু বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি জানান, এ পর্যন্ত ১০ জন রোহিঙ্গাকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। তাদের নামে মামলাও দায়ের করা হয়েছে। আবেদনের সময় তাদের কথাবার্তায় গরমিল পরিলক্ষিত হওয়ায় রোহিঙ্গা হিসেবে শনাক্ত করি। অপর এক প্রশ্নের জবাবে আবু সাইদ জানান, বেশকিছু পাসপোর্ট এখনো সরবরাহ করা যায় নি। যারা ইস্যুকৃত পাসপোর্ট এখনো নেয়নি তাদেরকে টেলিফোন করা হয়, স্থায়ী ঠিকানায় চিঠি লিখে পাসপোর্ট ডেলিভারী নেওয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়।