কিশোর গ্যাং নাম শুনলে আঁতকে উঠে যেকোনো বয়সের মানুষ। কম বয়সে অপরাধে জড়িয়ে পড়ে প্রায় ছুরি-ছিনতাইসহ খুনের মতো ঘটনাও ঘটাচ্ছে তারা। চট্টগ্রামে প্রায় ১০০ কিশোর গ্যাং সক্রিয়। যার মধ্যে নগরীতে ৫০ এর অধিক এবং বিভিন্ন উপজেলায় রয়েছে আরও প্রায় ৫০টি কিশোর গ্যাং। এরা বিভিন্ন নাম দিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যেমেও সক্রিয়। ডট গ্যাং, টিন স্কোয়াড এবং গ্যাং হোতাদের নামের প্রথম অংশ দিয়ে পরিচিত ও স্ব-স্ব এলাকার বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত তারা। তারা মূলত আধিপত্য বিস্তার, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং এমনকি হত্যার মতো ঘটনায়ও জড়িয়ে পড়ছে। এদরে অনেকেই ইয়াবা-ফেনসিডিলসহ নানা মাদকদ্রব্য সেবন করছে। এমনকি আধিপত্য বিস্তারেও ব্যবহার করছে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র। গত ৪৫ দিনে ৬ কিশোর গ্যাং প্রধানসহ ৪২ জন ধরা পড়েছে র্যাব ও পুলিশের জালে। অপরাধ নির্মূলে কিশোর গ্যাংয়ের প্রধানহোতাসহ সদস্যরা নজরদারীতে আছে বলে জানান র্যাব-৭ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মাহবুব আলম। অন্যদিকে, নগরীতে কিশোর গ্যাং অপরাধে জড়িয়ে পড়লে কোনো ছাড় নেই বলে জানান সিএমপির অতি. পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম এন্ড অপারেশনস্) প্রকৌশলী আবদুল মান্নান মিয়া।
গতকাল বৃহস্পতিবার বিকালে দৈনিক দেশ বর্তমানকে র্যাবের এই অধিনায়ক বলেন, অন্যান্য জেলার মতো চট্টগ্রাম মহানগরী ও জেলায় কিশোর গ্যাং এর আধিপত্য রয়েছে। যেখানে মহানগর ও জেলায় প্রায় ১০০ কিশোর গ্যাং সক্রিয়। এর মধ্যে মহানগরীতে ৫০ এর অধিক এবং নগরীর বাইরে বাঁশখালী, আনোয়ারা, সাতকানিয়া, লোহাগাড়াসহ বিভিন্ন উপজেলায় আরও প্রায় ৫০টি গ্রুপ সক্রিয়। বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে কিশোররা ক্রমেই অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছে। অধিকাংশ কিশোর গ্যাং গড়ে ওঠার পেছনে স্থানীয় এলাকার একটি চক্রের মদদ রয়েছে। হিরোইজম প্রকাশ করতেও পাড়া-মহল্লায় কিশোর গ্যাং গড়ে ওঠার অন্যতম কারণ। ইতোমধ্যে নানা অনিয়ম ও বিভিন্ন অভিযোগের ভিত্তিতে এদের মধ্যে অনেককেই গ্রেফতার করেছি। বাকি কিশোর গ্যাংয়ের ওপর নজরদারি রাখা হয়েছে।
র্যাব অধিনায়ক আরও বলেন, র্যাবের প্রাথমিক তদন্তে আরও কিছু কিশোর গ্যাং এর সঙ্গে তথাকথিত কিছু বড় ভাইদের বিষয়ে অনেক তথ্য রয়েছে। এদের সংশ্লিষ্টতা যাচাই-বাছাই চলছে। অপরাধের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগ কিংবা প্রমাণ পেলে কেউ ছাড় পাবে না বলে জানান তিনি।
একই বিষয়ে সিএমপির অতি. পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম এন্ড অপারেশনস্) প্রকৌশলী আবদুল মান্নান মিয়া দৈনিক দেশ বর্তমানকে বলেন, চট্টগ্রাম নগরীতে অপরাধের সঙ্গে জড়িত কেউ পার পাবে না। সক্রিয় কোনো কিশোর গ্যাং অপরাধের সাথে জড়িত থাকার বিষয়ে অভিযোগ পেলে সঙ্গে সঙ্গে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নগর পুলিশ অপরাধ ধমনে সর্তক রয়েছে বলেও জানান তিনি।
এদিকে গত বুধবার চট্টগ্রাম মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে ৫টি কিশোর গ্যাং গ্রুপের প্রধানসহ ২৫ জন সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব। নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ এলাকা থেকে নুরু গ্রুপের সদস্য রাকিব উদ্দিন তামিমসহ ৬ জনকে, আমিন কলোনি এলাকা থেকে রশিদ গ্রুপের প্রধান হারুনুুর রশিদ, আকবর টিলা পূর্বাঞ্চল হাউজিং সোসাইটি এলাকা থেকে রুবেল গ্রুপের প্রধান রবিউল আওয়াল রুবেলসহ ৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে বাকলিয়া থানার এক্সেস রোড এলাকা থেকে ইউসুফ গ্রুপের প্রধান ইউসুুফসহ ৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর পাহাড়তলীর সাগরিকা মোড় এলাকা থেকে সাদ্দাম গ্রুপের প্রধান রকিবুল হোসেন ওরফে সাদ্দামসহ ৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারকৃতরা হল- মো. রাকিব উদ্দিন তামিম (১৯), মো. আহাদ আলীফ (১৯), গোপাল ত্রিপুরা (২২), আবরার হান্নান (১৯), মোহাম্মদ জুবাইরুল ইসলাম (২০), সুব্রত বড়ুয়া (২১), মো. হারুনুর রশিদ (২১), মো. রবিউল আওয়াল রুবেল (২৩), মো. মুন্না (২২), মেহেদী হাসান মুন্না (২০), মো. মনির (২০), ফারহাদ (২৪), আসিফ (২২), রাশেদ ওরফে রাসেল (২০), মো. ইউসুফ (২১), এমরান হোসেন বাবলু (২৩), মো. জামাল উদ্দিন (৩৮), মো. সাখাওয়াত হোসেন শাকিল (২৪), মো. মনির উদ্দিন (২৫), মো. রকিবুল হোসেন ওরফে সাদ্দাম (২৬), মো. সাব্বির হোসেন (২০), মো. আলা উদ্দিন (২০), মো. মাসুদুুর রহমান অপু (২৬), রায়হান (২২) ও জাকির হোসেন (৩০)। একই দিন চট্টগ্রামের বাইরে ফেনী থেকে থেকে এসডিকে গ্রুপের প্রধান মো. রাব্বিসহ ৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। মো. রাব্বি (২০), মো. তৌহিদুল ওরফে সাগর (১৭), মো. ফখরুল (২০), কেও গ্রেফতার করে র্যাব।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আটককৃতরা বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয়ভাবে রাস্তায় সংঘবদ্ধ হয়ে মারামারি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, প্রভাব বিস্তার করাসহ বিভিন্ন অপকর্মে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে বলে জানান র্যাব। এদের মধ্যে অনেকের বিভিন্ন থানায় থানায় চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই এবং নাশকতা সংক্রান্ত বেশ কয়েকটি মামলা রয়েছে বলে নিশ্চিত করে র্যাব।
এর আগে গেল ১৪ জানুয়ারি বায়েজিদ বোস্তামী থানার হিলভিউ এলাকায় প্রকাশ্যে দিবালোকে অস্ত্রের মহড়া দিয়ে উত্তপ্ত করায় ১৭ কিশোর গ্যাং সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে নগর পুলিশ। ওই সময় তাদের থেকে ১টি খেলনার পিস্তল এবং দেশীয় তৈরি ধারালো কিরিচ উদ্ধার করা হয়। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন- সাব্বির হোসেন শাওন (২১) ও মো. শাকিল হোসেন প্রকাশ রনি (২৪) মো. ইমরান (২৭), মো. নজরুল, ইসমাইল উদ্দিন আকাশ (২৫), মো. হাসান (২৬), মো. সজিব (২৩), ইয়াসিন রায়হান হৃদয় প্রকাশ বাবু (২৪), মো. রমজান (২২), , মো. হাবিব (৩৯), ইমরান হোসেন (৩০), মো. ইমন (২২), আরিফুল ইসলাম (৩০), মোঃ মানিক (৩৫), মো. সুমন (২৯), মো. মনির হোসেন (২৪) ও মো. রাসেল (২২)।
গ্রেপ্তারের বিষয়ে বায়েজিদ বোস্তামী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সঞ্জয় কুমার সিনহা বলেন, গ্রেপ্তারকৃতরা এলাকার ত্রাস হিসেবে পরিচিত। তারা বিভিন্ন সময় প্রকাশ্যে দিবালোকে অস্ত্রের মহড়া দিয়ে এলাকায় রাজত্ব করত। এদের আদালতের মাধ্যেমে কারাগারে প্রেরণ করা হয়েছে।