টাকায় মেলে ড্রাইভিং লাইসেন্স

বাইরে কেউ টাকা নিলে আমরা দায়ী না
– মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ,্ পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) বিআরটিএ

এই টাকা অনেক দূর যাচ্ছে
-অধ্যাপক শাসমুল হক, বুয়েট

টাকা লেনদেনের প্রমান মিলেছে
-মো. আকতারুল ইসলাম, উপপরিচালক (জনসংযোগ), দুদক

বিআরটিএ অফিসকে দালালমুক্ত করতে অনলাইনে আবেদন করা ও ফি জমা দেওয়াসহ নানা উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। কিন্তু অসাধু কর্মকর্তাদের কারণে কোনোভাবেই দালালমুক্ত হচ্ছে না মিরপুর বিআরটিএ অফিস। মানুষের ভোগান্তি আগের মতোই রয়ে গেছে। দালাল ছাড়া কোনোভাবেই ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে পারছে না গ্রাহকরা। দালাল ধরতে গিয়ে সরকার নির্ধারিত ফি-এর চেয়ে দ্বিগুণ বা তিনগুণ টাকা দিতে হচ্ছে।
জানা গেছে, মোটরসাইকেলের অপেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্সের সরকারি ফি সাড়ে ৪ হাজার টাকা হলেও গুনতে হয় প্রায় ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা। তবে কর্তৃপক্ষের দাবি অফিসের বাইরে কেউ কাউকে অতিরিক্ত টাকা দিলে সে দায়ভার বিআরটিএ অফিসের না। গতকাল বৃহস্পতিবার গ্রাহক হয়রানি ও ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ হাতেনাতে দালালা চক্রের ৪ সদস্যকে আটক করেন দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ওই চার সদস্যরদের মধ্যে একজন দালাল, দুজন আনসার সদস্য ও বিআরটিএতে কর্মরত একজন সিএনএস কর্মী রয়েছে। শুধু আনসার সদস্যই নয়, এই চক্রের সদস্য বিআরটিএ কর্মকর্তারাও। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ভ্রাম্যমাণ আদালত দালাল ও সিএনএস কর্মীকে দুই মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেন এবং অভিযুক্ত দুই জন আনসার সদস্যের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
দুদক সূত্রে আরও জানা যায়, হাতেনাতে আটকদের ফোনে বিভিন্ন অ্যাপে বিভিন্ন সেবাগ্রহীতার সঙ্গে অস্বাভাবিক আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া যায়। এনফোর্সমেন্ট টিম তাদেরকে পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ্’র কাছে উপস্থিত করলে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে উক্ত দালাল ও সিএনএস কর্মীকে দুই মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয় এবং অভিযুক্ত ২ জন আনসার সদস্যের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য তাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়। পরে টিম বিআরটিএর চেয়ারম্যানের কাছে অভিযানে প্রাপ্ত তথ্যাবলি তুলে ধরলে তিনি দুদকের এ অভিযানকে স্বাগত জানিয়ে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং দপ্তরগুলোকে জনবান্ধব করার আশ্বাস প্রদান করেন। এর আগে একই অফিসে গ্রাহক হয়রানি ও দালালদের দৌরাত্ম্যের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ২৮ জানুয়ারি দুদক প্রধান কার্যালয় থেকে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছিল। এ সময় এনফোর্সমেন্ট টিম একজন দালালকে হাতেনাতে ধরেছিল এবং নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তাকে ১৫ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছিল।
ভুক্তভোগীরা জানান, সবকিছু ঠিকঠাক থাকলেও দালাল ছাড়া সেবা নিতে গেলে ঘুরতে হয় মাসের পর মাস, বছরের পর বছর। অনলাইনে আবেদনের পর পরীক্ষার জন্য তারিখ দেয়া হয়। দালাল না ধরলে বা অফিসের কর্মচারীদের অতিরিক্ত টাকা না দিলে সেই পরীক্ষায় ফেল করিয়ে দেয়া হয়। কখনো পরীক্ষার তারিখ কয়েক মাস পরে ফেলা হয়। অন্যদিকে দালালকে টাকা দিলে পরীক্ষার দিন শুধু সশরীরে উপস্থিত হলেই হয়। কোনোরকম হয়রানি ছাড়াই মেলে ড্রাইভিং লাইসেন্স ও মোটরযানের নিবন্ধন।
মিরপুর বিআরটিএ অফিস সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিন গাড়ি নিবন্ধন করা হয় ১২০০ জন। আর ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য পরীক্ষা দিচ্ছেন ৪০০ জন। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন ১২০ জন।
সরেজমিনে মিরপুর বিআরটিএ অফিসের বাইরে দেখা গেছে দালালদের ভিড়। মোটরসাইকেল লাইসেন্সের কথা শুনে আগ্রহ বাড়িয়ে এক দালাল বলছে টাকা দেন ১ মাসে কাজ করে দিচ্ছি। টাকা দেবেন না কত বছর পর হবে তার কোনো সীমা নেই।
পরিচয় গোপন রেখে লাইসেন্স করার বিষয়ে অফিসের সামনে কথা হয় রহিম নামে এক দালালের সঙ্গে। তিনি বলেন, অনলাইন করেন, ব্যাংক ফি দেন আর যত পরীক্ষাই দেন, ১২ হাজার টাকা ছাড়া লাইসেন্সের দেখা মিলবে না। লাইসেন্স করতে চাইলে টাকা-পয়সা নিয়ে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কোথায় কী করতে হবে সব আমার দায়িত্ব। আপনাকে শুধু ডাকলে চলে আসবেন সেদিন।
বাড্ডা এলাকার রনি হাওলাদার বলেন, দালাল না ধরে অফিসের পিয়নকে ধরেন কম টাকায় কাজ হবে। আবেদন করেন। করেই কিছু টাকা দেবেন, আপনার পরীক্ষার তারিখ তাড়াতাড়ি করে দেবে। আমারটা পেশাদার লাইসেন্স, এক দালাল ১৫ হাজার টাকা চেয়েছে। পরে অফিসের পিয়নকে ধরে ১০ হাজার টাকায় করেছি। আপনি কাউকে মাধ্যম না ধরলে আপনার ফাইল অফিসে খুঁজেই পাবেন না।
এ বিষয়ে মিরপুর বিআরটিএ পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ্ বলেন, আমরা তো সবসময় মানুষকে সেবা দিচ্ছি। যারা যে সেবা নিতে আসছেন তাদের সেই সেবাই দিচ্ছি। অফিসের বাইরে কেউ টাকা নিয়ে থাকলে তো আর অফিস দায়ী না। গ্রাহক চাইলে নিজেরাই অনলাইন থেকে নিজের ড্রাইভিং লাইসেন্স ডাউনলোড করে নিতে পারবেন।
এ ব্যাপারে দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) মো. আকতারুল ইসলাম বলেন, মিরপুর বিআরটিএ, ঢাকা মেট্রো সার্কেল-১ অফিসে বিভিন্ন সেবা দিতে গ্রাহক হয়রানি ও দালালদের দৌরাত্ম্যের অভিযোগে এনফোর্সমেন্ট টিম অভিযান পরিচালনা করে। দুদক প্রধান কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক রণজিৎ কুমার কর্মকারের নেতৃত্বে সহকারী পরিচালক আল-আমিন, মো. জাকিউল আলম ও মো. মেহেদী মুসা জেবিন-এর সমন্বয়ে গঠিত চার সদস্যের একটি এনফোর্সমেন্ট টিম এ অভিযানে অংশ নেয়। এনফোর্সমেন্ট টিম ছদ্মবেশে গ্রাহক হিসেবে সেবা নিতে গেলে উক্ত দপ্তরে দালালদের আনাগোনা দেখতে পায়। এ সময় একজন দালাল, দুই জন দায়িত্বরত আনসার সদস্য ও বিআরটিএতে কর্মরত একজন সিএনএস কর্মীকে হাতেনাতে ধরে দুদক টিম।
এ বিষয় বুয়েটের অধ্যাপক শাসমুল হক বলেন, এই যে প্রক্রিয়াটা এটা কর্তৃপক্ষ দেখে না দেখার ভান করছে। কারা এই টাকা লেনদেন করছে, এটা সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা যায়। একটা সিসি ক্যামেরার মাধ্যমেই জানা যায়। যদি এটা জানানো না হয়, তবে বুঝতে হবে এই টাকা অনেক দূর যাচ্ছে।