দালালে জিম্মি বিআরটিএ

 

সুনির্দিষ্টভাবে সমাধানের ব্যবস্থা করতে হবে
-মোজাম্মেল হক চৌধুরী, মহাসচিব, যাত্রী কল্যাণ সমিতি

বিআরটিএতে দুর্নীতির আশঙ্কা থেকোই যায়
ইফতেখারুজ্জামান, নির্বাহী পরিচালক, টিআইবি

 

‘দালাল, টাউট, প্রতারক হতে সাবধান’ বাংলাদেশ সড়ক পবিরবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) গেট দিয়ে প্রবেশ করতেই এমন সতর্কবার্তা দিলেও থামছে না দালাদের দৌরাত্ম্য। কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশেই এ চক্র গড়ে উঠেছে। আর এ দালালচক্রই নিয়ন্ত্রণ করছে মিরপুর বিআরটিএ কার্যালয়। দালাল-কর্মকর্তারা মিলে প্রতি মাসে অবৈধভাবে হাতিয়ে নিচ্ছেন কোটি টাকা।
জানা গেছে, বিআরটিএ কার্যালয়ে স্বাভাবিকভাবে সেবা মেলে না। দালালদের টাকা দিলেই মেলে সেবা। সবধরনের গাড়ির ড্রাইভিং লাইসেন্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হলেও টাকার বিনিময়ে মিলছে লাইসেন্স। এই অসাধ্য কাজটি সম্ভব করেন দালালরা। এ ছাড়াও গাড়ির লাইসেন্স, মালিকানা হস্তান্তর, ফিটনেস সার্টিফিকেট ও গাড়ির নিবন্ধনসহ যে কোনো কাগজপত্র সম্পাদন সাধারণ প্রক্রিয়ায় সহজেই সম্পন্ন করতে পারেন না সেবাগ্রহীতারা। দালালদের কাছে দায়িত্ব দিলে কোনো ঝামেলা পোহাতে হয় না।
সূত্র বলছে, বনশ্রীর বাসিন্দা রবিউল ইসলাম গত সাত মাসে হাতে পাননি ডিজিটাল নম্বর প্লেট। দালালকে টাকা দিলে এক ঘন্টায় পাওয়া যায় ডিজিটাল নম্বর প্লেট। ডিজিটাল নম্বর প্লেট বসাতে স্টিলের প্লেটটি ১৫শ থেকে ১৮শ টাকা পর্যন্ত গুনতে হচ্ছে।
দুদক সূত্র বলছে, গতকাল রোববার সকালে মিরপুর বিআরটিএ অফিসে গ্রাহক হয়রানি ও দালালদের দৌরাত্ম্যের অভিযোগ পেয়ে অভিযান চালায় দুদকের সহকারী পরিচালক মো. মেহেদী মুসা জেবিন এবং সহকারী পরিচালক মো. মাহমুদুল হাসান ভূঁইয়া দুই সদস্যের একটি এনফোর্সমেন্ট টিম। এ সময় এনফোর্সমেন্ট টিম ছদ্মবেশে গ্রাহক হিসেবে সেবা নিতে চাইলে দালালদের আনাগোনার সত্যতা পেয়েছেন। এছাড়া একাধিক দালাল তাদের পরিচিত বিআরটিএ সংশ্লিষ্টদের দ্বারা কাজ করিয়ে দেয়ার আশ্বাস দেন। দুদকের ওই টিমের কাছে হাতেনাতে ধরা পড়েন দালালদের এক সদস্য বাবু রায় নামে একজন দালালকে হাতেনাতে ধরে এবং বিআরটিএ এর পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) মোহাম্মদ শহীদুল্লাহকে তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার অনুরোধ করেন। অভিযান শেষে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে দালালকে সোপর্দ করা হয়। নির্বাহী ম্যাজিস্টেট দালালকে ১৫ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেন। পরে সার্কেল পরিচালক সংশ্লিষ্ট শাখাসমূহের কর্মকর্তাগণকে বহিরাগত দালাল প্রবেশের বিষয়ে সতর্ক করেন। দালাল ও তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) মো. আকতারুল ইসলাম এ তথ্য জানান।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বিআরটিএ অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশে তৈরি হয় গাড়ির ড্রাইভিং লাইসের্ন্স। বাইরে থেকে দালালরা নিয়ন্ত্রণ করে বিআরটিএ অফিস। দালাল ছাড়া লাইসেন্স করতে গেলে পড়তে হয় হয়রানিতে। সূত্রমতে, প্রায় প্রতিদিনই একটি নির্দিষ্ট সময়ে দালালের মাধ্যমে ঘুষের ফাইল জমা নেয়া হয়। সাধারণত শেষ বিকেলে বিআরটিএ অফিসের কিছু অসাধু কর্মকর্তাদের মধ্যে চলে অবৈধ কার্যক্রম। দালালের কাছ থেকে আদায় করা ঘুষের টাকা ভাগ-বাটোয়ারা হয়। এজন্য অফিস সময়ের পরও কর্মকর্তাদের অনেকে অফিসেই বসে থাকেন। লেনদেন বুঝে নিয়ে কেউ কেউ বাসার উদ্দেশে গাড়িতে ওঠেন রাত ৮টার পর।
সূত্র আরো জানায়, ড্রাইভিং লাইসেন্স কিংবা গাড়ির অফিসে প্রতিদিন ১ হাজার আবেদন জমা পড়ে। এর মধ্যে বেশির ভাগ আবেদন জমা হয় ঘুষ চ্যানেলে। আবেদন প্রতি ন্যূনতম ঘুষ নেয়া হয় ৫ হাজার টাকা। এ হিসাবে দৈনিক ঘুষের পরিমাণ দাঁড়ায় নিদেন পক্ষে ৫০ লাখ টাকা। মাসে আসে প্রায় ১১ কোটি টাকার বেশি।
ভুক্তভোগী মনির হোসেন বলেন, টাকা খরচ করিনি বলে ৭ মাস পর ড্রাইভিং লাইসের্ন্স পেয়েছি। টাকা খরচ করলে এই ভোগান্তি হতো না। আমার সব ঠিকঠাক থাকার পরেও পদে পদে ভোগান্তির স্বীকার হয়েছি। তবুও বাড়তি টাকা খরচ করি নাই। কর্মকর্তাদের জানিয়েও কোনো লাভ হয়নি। যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, বিআরটিএর সার্কেল অফিসের হেল্প ডেস্কগুলো থেকে প্রত্যেকের সমস্যা সুনির্দিষ্টভাবে সমাধানের ব্যবস্থা করতে হবে। তা হচ্ছে না দেখেই দালালরা সুযোগ নিচ্ছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বিআরটিএর প্রশাসনিক ব্যর্থতা। তাই বিপুল মানুষের হয়রানি, ক্ষতির দায় তাদের নিতে হবে। এর বাইরে সরকারি কেনাকেটা ঠিকাদার নিয়োগের দীর্ঘসূত্রতার বিষয়ও আছে। ফলে এতে যোগসাজশের মাধ্যমে দুর্নীতির আশঙ্কা থেকেই যায়। পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেয়ার চেষ্টার কারণে এভাবে মানুষ দুর্ভোগে পড়েছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা দরকার।