চট্টগ্রাম বন্দরে আটকে আছে ভোগ্যপণ্যের ৩ জাহাজ

ডলার সংকটে আমদানিতে ভাটা, মূল্যবৃদ্ধির শংকা

ভোজ্যতেল, চিনি, ডালসহ সব ধরণের ভোগ্যপণ্যের আমদানি কমেছে। ডলার সংকট উত্তরণে আমদানির ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিধি-নিষেধ আরোপের কারণে এলসি (ঋণপত্র) খুলছে না আমদানিকারকরা। আর এলসি না খোলায় কমেছে ভোগ্যপণ্যের আমদানি। কর্পোরেট হাউসগুলো ডলারের উচ্চ হারে ভোগ্যপণ্য আমদানিতে এগিয়ে আসলেও ক্ষুদ্র ও মাঝারী ব্যবসায়ীরা আমদানিতে অনীহা। আমদানিতে বিশেষ সুবিধা না পেলে আগামি রমজানে ভোক্তা পর্যায়ে এর প্রভাব পড়ার আশংকা করছেন ক্ষুত্র ও মাঝারী পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা।

এদিকে চট্টগ্রাম বন্দরে নোঙর করেছে ভোগ্যপণ্যের তিনটি জাহাজ। চুক্তি অনুযায়ি ব্যাংক ডলারে রফতানিকারককে পণ্যমূল্য পরিশোধ করতে না পারায় জাহাজ থেকে ভোগ্যপণ্য খালাসে অনুমতি পাচ্ছে না আমদানিকারক। এসব কারণে আগামি রমজানে ভোগ্যপণ্যের সংকট ও দাম বৃদ্ধির শংকা করছেন ব্যবসায়ীরা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থনৈতিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের  প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) পণ্য আমদানির জন্য ব্যবসায়ীরা ৬৩৯ কোটি ডলারের এলসি খুলেছে। গত বছরের (২০২১-২০২২) একই সময়ের তুলনায় এলসি খোলার হার কমেছে ২৬ দশমিক ৫০ শতাংশ। আগস্টে এলসির পরিমাণ ছিল ৬৬২ কোটি ডলার। পরের মাসে (সেপ্টেম্বর) খোলা হয় ৬৫১ কোটি ডলারের এলসি। অক্টোবরে পণ্য আমদানিতে এলসি খোলার ক্ষেত্রে বড় ধরণের ধাক্কা লাগে। এ মাসে এলসি কমে ৪৭৪ কোটি ডলারে দাঁড়ায়। নভেম্বরে আগের মাসের তুলনায় ৭২ কোটি ডলার কমে দাড়াঁয় ৪০২ কোটি ডলারে। বিদায়ী মাসে এলসি খোলার প্রবৃদ্ধি কিছুটা বৃদ্ধি পেয়ে ৪১১ কোটি ডলার দাঁড়িয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অপর এক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে দ্বিতীয় প্রান্তিকে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) অপরিশোধিত সয়াবিন তেল আমদানিতে এলসির প্রবৃদ্ধি আগের বছরের চেয়ে ৪৭ শতাংশ কমেছে। অপরিশোধিত পাম তেলে ৯৯ শতাংশ কমেছে এলসি। এছাড়া চিনি আমদানিতে আগের বছরের চেয়ে ২৮ শতাংশ, সয়াবিন বীজে ৮৩ শতাংশ এবং খেজুর আমদানিতে এলসির পরিমাণ কমেছে ৩০ শতাংশ। ডলারের দাম ৮৬ টাকা থেকে বেড়ে ১০৭  টাকায় ছুঁয়েছে। অনেক বাণিজ্যিক ব্যাংক ১০৭ টাকায়ও ডলার দিতে পারছে না। ডলারের উর্দ্ধমূখী আচরণ আর এলসি খোলার ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর গড়িমসির কারণে ক্ষুদ্র ও মাঝারী পর্যায়ের আমদানিকারকরা এলসি খুলতে পারছে না।

এদিকে চট্টগ্রাম বন্দরের বার্থিং তালিকা পর্যালোচনায় দেখা গেছে, বন্দরে চিনি ও ভোজ্যতেলবাহী তিনটি জাহাজ নোঙর করেছে। রমজানকে সামনে রেখে ভোগ্যপণ্যের বাড়তি চাহিদার কথা বিবেচনা করে এসব পণ্য আমদানি করা হয়েছে। মেঘনা গ্রæপ ও এস আলম গ্রপ এসব ভোগ্যপণ্যের আমদানিরকারক। দুটি পণ্যের পরিমাণ প্রায় ৫৫ হাজার মেট্রিক টন। আমদানি খরচ পড়েছে প্রায় ৩ কোটি ৫২ লাখ মার্কিন ডলার। আমদানিকারক এলসির বিপরীতে সমুদয় অর্থ সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে পরিশোধ করলেও ব্যাংক রফতানিকারককে ডলারে মূল্য পরিশোধ করতে পারছে না। যার কারণে তিনটি জাহাজের তেল ও চিনি খালাস করতে পারছে না আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান।

চট্টগ্রাম বন্দর ও কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে ‘এম টি সুপার ফরটি’ নামীয় জাহাজটি গত ২৫ নভেম্বর মালয়েশিয়া থেকে ১২ হাজার টন পামওয়েল চট্টগ্রাম বন্দরের বহিনোর্ঙরে পৌঁছায়। এস আলম গ্রæপ এর আমদানিকারক। কিন্তু এখনও পর্যন্ত আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান পণ্য খালাস করতে পারেনি। মেঘনা গ্রæপ ৬০ হাজার ৫০০ মেট্রেক টন আমদানির জন্য এলসি খোলে। গত ৫ জানুয়ারি ‘এম ভি কমন এটলাস’ নামের জাহাজটি চিনি নিয়ে বহির্নোঙরে ভীড়ে। জাহাজটি থেকে ২৩ হাজার ৬৫০ টন চিনি খালাস হয়েছে কিন্তু ব্যাংক ডলার সংকটের কারণে আমদানি মূল্য শোধ না করায় খালাস বন্ধ রয়েছে। ব্রাজিল থেকে ‘এম টি সোগান’ নামে অপর জাহাজে করে অরিশোধিত সয়াবিন তেল আমদানি করেছে মেঘনা গ্রæপ। চট্টগ্রাম বন্দরের জলসীমা নোঙর করেছে গত ৬ জানুয়ারি।  এটিও আটকে আছে। নির্দিষ্ট সময়ে পণ্য খালাস করতে না পারার কারণে আমদানিকারককে প্রতিদিন জরিমানা গুণতে হচ্ছে। প্রতিদিন জাহাজ ভাড়া বাবদ জরিমানার পরিমাণ ৩৮ হাজার থেকে ৪০ হাজার মার্কিন ডলার। এছাড়া রয়েছে বন্দরের পেনাল্টি।

আমদানিকারকদের সাথে আলাপকালে জানা যায়, জাহাজ থেকে যতদিন পর্যন্ত পণ্য খালাস করা শেষ হবে না ততদিন পর্যন্ত আমদানিকারককে জরিমানা দিতে হবে। তারা বলছেন, আমদানিকৃত পণ্য খালাস করতে না করার বাজারে পণ্যের সংকট দেখা যাবে, বাড়বে খরচও।

খাতুনগঞ্জের এটিআর ট্রেডিংয়ের মালিক নুরুল আলম এ প্রতিবেদককে বলেন, নিয়ম অনুযায়ী ব্যাংক রফতানিকারককে মার্কিন ডলারে আমদানিকৃত পণ্যের দাম পরিশোধ করে থাকে। কিন্তু ডলার সংকটের কারণে ব্যাংক মূল্য পরিশোধ করতে পারছে না। যার কারণে বিদেশি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান জাহাজ থেকে পণ্য খালাস করার অনুমতি দিচ্ছে না। তিনি বলেন, পণ্য খালাসে বিলম্বজনিত কারণে জাহাজ ভাড়া বাবদ আমদানিকারককে বাড়তি ক্ষতিপূরণ গুণতে হবে। এটি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের জন্য বাড়তি বোঝা। এতে পাইকারী ও খুচড়া পর্যায়ে জিনিষপত্রের দাম বাড়বে। এর প্রভাব পড়বে ভোক্তা পর্যায়ে।

চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাষ্ট্রির প্রেসিডেন্ট মাহবুব আলম বলেন, আমদানিকারকরা ভোগ্যপণ আমদানিতে এলসি খুলতে চাইলেও অনেক ব্যাংক ডলার সংকটের কারণ দেখিয়ে এলসি খুলতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। আবার অনেক আমদানিকারক উচ্চমূল্যের ডলারে পণ্যের এলসি খুলতে আগ্রহী নয়। এক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবে তারা লাভ-লোকসানের হিসাব কষছে। তিনি বলেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, করোনা পরিস্থিতি, ডলারের মূল্য বৃদ্ধি সর্বোপুরি বৈশি^ক অর্থনীতির নেতিবাচক প্রভাব বাংলাদেশেও বিরাজ করছে।

প্রসঙ্গত, ডলার সংকট ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের টান পড়লে সরকার আমদানির  লাগাম টেনে  ধরে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সর্বপ্রথম গত বছরের ১৭ এপ্রিল অত্যাবশ্যকীয় ভোগ্যপণ্য, জীবন রক্ষাকারী ওষুধ ও রফতানিমূখী শিল্পের কাঁচামাল ছাড়া অন্য পণ্য আমদানিতে কড়াকড়ি আরোপ করে। তিন সপ্তাহ পর কেন্দ্রীয় ব্যাংক আমদানির লাগাম টানতে আরেকটি পরিপত্র জারি করে। সর্বশেষ গেল বছরের ৫ জুলাই আরও একবার বিলাসবহুল পণ্যসহ বেশ কিছু পণ্য আমদানির ওপর বিধি-নিষেধ আরোপ করে।