ডিপিডিসির এমডি হতে মরিয়া সেই মাহবুব!
# চাকরিকালেই নিয়েছেন কানাডার নাগরিকত্ব # এমডি পদে নিয়োগ পেতে লেনদেনের অভিযোগ
বশির হোসেন খান:
ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ডিপিডিসি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পদ থেকে গত ১০ জানুয়ারি অবসরে গেছেন প্রকৌশলী বিকাশ দেওয়ান। এরপরই আলোচনা চলছে কে হচ্ছেন পরবর্তী এমডি? কয়েকটি নাম নিয়ে গুঞ্জন চললেও শোনা যাচ্ছে, এদের মধ্যে নানা কারণে বিতর্কিত ব্যক্তিরা যে কোন মূল্যে এমডির চেয়ারে বসতে টাকার বস্তা নিয়ে নেমেছেন কর্তৃপক্ষকে ম্যানেজ করতে। তাদের মধ্যে অন্যতম মো. মাহবুবুর রহমান। তিনি ডিপিডিসি’র সাবেক প্রধান প্রকৌশলী ও জিটুজি প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) হিসেবে কাজ করেছেন। ডিপিডিসিতে কর্মরত থাকাকালে প্রকৌশলী মাহবুবের দুর্নীতি ও লুটপাটের বিষয়টি ছিল ওপেন সিক্রেট। ভুতুড়ে বিলসহ নানা কারণে ছিলেন আলোচনা সমালোচনার তুঙ্গে। এর আগে প্রতিষ্ঠানটির প্রকিউরমেন্ট বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ক্রয় সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয় তিনিই দেখতেন।
অভিযোগ আছে, ওই সময় মাহবুবুর রহমানের তত্ত্বাবধানে গড়ে ওঠে শক্তিশালী দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেট। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে তিনি টেন্ডার বাণিজ্যসহ তার সব অনিয়ম-দুর্নীতি করিয়েছেন। গড়ে তুলেছেন অর্থ সম্পদের পাহাড়। নিয়েছেন কানাডার নাগরিকত্ব। দ্বৈত নাগরিক হয়েও এবার তিনি ডিপিডিসির এমডি হিসেবে নিয়োগ পেতে শুরু করেছেন দৌড়ঝাপ।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের মতে, ডিপিডিসির ইতিহাসে একই দায়িত্বে দ্বিতীয়বারের মতো থেকে মাহবুবুর রহমান নজির সৃষ্টি করেছেন। শুধু তাই নয়, দুই মেয়াদ মিলিয়ে তিনিই সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে একই পদে ছিলেন। এতে করে সংস্থায় মাহবুবের আধিপত্য বেড়েছে। তিনি ২০১৯ সালে ডিপিডিসিতে কর্মরত থাকাকালে বছরখানেক কানাডায় অবস্থান করেও পুনরায় তিনি যোগদান করে নির্দ্বিধায় চাকরিতে বহাল হন।
অভিযোগে জানা গেছে, মাহবুবুর রহমান একই সঙ্গে বাংলাদেশ ও কানাডার নাগরিক। দ্বৈত নাগরিক হয়েও সরকারি চাকরিতে থাকা বাংলাদেশের আইন পরিপন্থি। তার কানাডার পাসপোর্ট নম্বর অএ-০৬২২০৮। শুধু মাহবুবুর রহমান নন, তার স্ত্রী-সন্তান সবাই কানাডার নাগরিক। পরিবারের সদস্যরা কানাডায় বিলাসবহুল জীবন যাপন করেন। ২০১৯ সালের প্রায় পুরোটাই তিনি কানাডায় ভোগ বিলাসী জীবনে মত্ত ছিলেন। সন্তানেরা সেখানের শিক্ষালয়ে পড়াশোনা করেন। আইনে বলা আছে, চাকরিতে বহাল থাকতে সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কেউ দ্বৈত নাগরিকত্ব নিতে পারবেন না।
এ ব্যাপারে একজন আইনজীবী প্রতিকার চেয়ে ওই সময়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বরাবর লিগ্যাল নোটিশ পাঠায়। যেখানে প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমানের বিরুদ্ধে সরকারি চাকরি আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ারও অনুরোধ করা হয়েছিল। কিন্তু, প্রকৌশলী মাহবুবের বিরুদ্ধে এমন গুরুতর অভিযোগ প্রমাণসহ উত্থাপনের পরেও অজ্ঞাত কারণে তদন্ত সামনে এগোয়নি।
লিগ্যাল নোটিশ প্রাপ্তির পর ডিপিডিসি তাদের আইনি উপদেষ্টা প্রতিষ্ঠান শেখ অ্যান্ড চৌধুরীর (ব্যারিস্টারস, অ্যাডভোকেট) মতামত চাইলে ব্যারিস্টার মোহাম্মদ মেহেদী হাসান চৌধুরীর স্বাক্ষরিত তাদের প্রতিষ্ঠানের প্যাডে ২০২১ সালের ১৩ জানুয়ারি লিখিত ৭ পৃষ্ঠার একটি মতামত দেন। এতে তিনি উল্লেখ করেন, আপাতত বলবৎ অন্য কোনো আইনে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, কোনো সরকারি কর্মচারি বিদেশি কোনো রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব গ্রহণ করিতে পারিবেন না। কোনো কর্মচারী উপ-ধারা (১) এর বিধান লঙ্ঘন করিয়া বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব গ্রহণ করিলে সরকার বা ক্ষেত্রমত নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট কর্মচারিকে কারণ দর্শাইবার যুক্তিসংগত সুযোগ প্রদান করিয়া তাহার চাকরি অবসানের আদেশ প্রদান করিতে পারিবেন। এছাড়া উপ-ধারা (২) এর অধীন আদেশ প্রদানের ক্ষেত্রে কোনো বিভাগীয় কার্যধারা রুজু করিবার প্রয়োজন হইবে না। উপ-ধারা (২) এর অধীন প্রদত্ত আদেশ চূড়ান্ত হইবে। মতামতের ২ নম্বর দফায় প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমানের বিরুদ্ধে ডিপিডিসিকে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে বলা হয়। পাশাপাশি অন্যান্য দফাগুলোতেও দেয়া হয় আইনি অনেক উদ্ধৃতি ও রেফারেন্স। কিন্তু অদৃশ্য কারণে প্রকৌশলী মাহবুবকে সব অনিয়ম থেকে তৎকালীন সময়ে দায়মুক্তি দেয়া হয়।
শুধু তাই নয়, দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়েই তিনি ডিপিডিসি’র প্রায় ২১ হাজার কোটি টাকার মেগা প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। বহু অভিযোগ মাথায় নিয়েই তিনি ২০২২ সালের ১০ জানুয়ারি অবসরে গেছেন। এবার তিনি ডিপিডিসির এমডি হতে আবেদন করলে এ নিয়ে শুরু হয় আলোচনা। ইতোমধ্যে তিনি পেয়েছেন নিয়োগ পরীক্ষায় অংশগ্রহণেরও ডাক। আজ সোমবার তার ভাইভায় অংশ নেয়ার কথা রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিপিডিসি এক কর্মকর্তা বলেন, ডিপিডিসির এমডি হিসেবে নিয়োগ পেতে প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান মাসখানেক আগেই বাংলাদেশে এসেছেন। এসেই তিনি বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে নিয়োগের ব্যাপারে যোগাযোগ করেন। নানা দেন-দরবারের পর ওই কর্মকর্তা তাকে অনেকটাই আশ্বস্ত করেন এবং ইতোমধ্যে তার সঙ্গে লেনদেনও শুরু হয়েছে বলে সূত্রের দাবি। যার ফলে দ্বৈত নাগরিক হয়েও তিনি এমডি পদে নিয়োগ পরীক্ষায় ডাক পেয়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব (বিদ্যুৎ বিভাগ) মো. হাবিবুর রহমান ফোন রিসিপ করে সাংবাদিক শুনে সংযোগ কেটে দেন। এ ব্যাপারে প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমানকে ফোন করে পাওয়া যায়নি।