বিএনপি-জামায়াতের গাঁটছড়া স্থগিত!

# বিএনপির ডানপন্থি নেতাদের চেষ্টা ব্যার্থ
# ৭ জানুয়ারির পর যুগপৎ ভাঙনের সম্ভাবনা
# মানুষ দেখতে চায় সব বিরোধী দল এক হচ্ছে
-সাইফুল হক, সাধারণ সম্পাদক, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি

বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের মতে, ‘সরকার পতনের আন্দোলন বর্তমানে চূড়ান্ত পর্যায়ে। ধৈর্য্য ধরে আর কিছুটা সময় চালিয়ে গেলে শিগগিরই সফলতা আসবে।’ লক্ষ্য অর্জনে বিএনপি নানা হিসেব-নিকেষ করছে। পরিকল্পনার ধারাবাহিকতায় আলোচনায় আসে জামায়াত ইসলামীর নাম।
চলমান সরকারবিরোধী আন্দোলনে জামায়াত সমমনা দল হিসেবে বিএনপির কর্মসূচিকে অনুসরণ করলেও দলটি জোটে ছিল না। এর মধ্যে আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করতে জামায়াততে সঙ্গে নিয়ে নতুন মঞ্চ বা জোট করার গুঞ্জন শুরু হয়। যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দল ও জোটগুলোর সঙ্গে বিএনপির পক্ষ থেকে এ নিয়ে আলোচনাও হয়। জোটবদ্ধ হওয়ার সিদ্ধান্ত প্রায় চূড়ান্ত বলে শোনা গেলেও হঠাৎ খবর এলো আপাতত জামায়াতের সঙ্গে কোনও আনুষ্ঠানিক সম্পর্কে যাচ্ছে না বিএনপি। দলটি যেভাবে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারবিরোধী শক্তিকে অনুসরণ করে আন্দোলনে অবদান রাখছে, তেমনই চলবে তাদের কর্মকাণ্ড। আন্দোলনের শরিকদের মনরক্ষা করতেই জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক পুন:স্থাপন কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
সূত্র মতে, জামায়াত ইসলামীর সঙ্গে বিএনপির দীর্ঘ দিনের সম্পর্ক। মাঝে একজোটে থাকা-না থাকা নিয়ে নীরবতার পর গত বছর ডিসেম্বরে আনুষ্ঠানিক বিচ্ছেদ ঘটে। এরপরও বিএনপির সঙ্গে আন্দোলনের শরিক দল হিসেবে থাকায় ঐক্যমত হয় দুই দল। তবে, বিপদে বিএনপিকে পাশে না পাওয়া- এমন অভিযোগে এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে একেবারে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় যোগাযোগ।
মাঝে সরকারের ওপর বৈদেশিক চাপ ও বিএনপির আন্দোলন জমে উঠলে দ্বিমুখি চাপে পড়ে সরকার। যুদ্ধাপরাধের তকমা থাকা জামায়াতের নেতা-কর্মীরা বিগত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে সরকারের টার্গেটে। কিন্তু দ্বিমুখি চাপে থাকা সরকার চলতি বছর জামায়াতকে কর্মসূচি পালনে অনুমতি দেয়। এর মধ্য দিয়ে ফের রাজনীতিতে সরব হয় দীর্ঘ দিন কোণঠাসা হয়ে থাকা ধর্মভিত্তিক দলটি।
২৮ অক্টোবরের সপ্তাহ দুয়েক আগে থেকে বিএনপির দেয়া কর্মসূচির সঙ্গে মিল রেখে পৃথকভাবে একই কর্মসূচি পালন করতে থাকে জামায়াত। ওই দিন বিএনপি অনুমতি নেয়া মহাসমাবেশে পুলিশের সঙ্গে সংঘাতে জড়ায়। অন্যদিকে, পুলিশের অনুমতি না পেয়েও জামায়াত বিশাল জমায়েত ঘটায় ঢাকার মতিঝিলে। ২৮ অক্টোবরের পর বিএনপির চলমান আন্দোলনে জামায়াতকে যুক্ত করা নিয়ে দুই পক্ষে আলোচনা হয়।
সূত্রে জানা গেছে, বিএনপির অধিকাংশ দায়িত্বশীল নেতা মামলায় কারাগারে। এক-দু’ জন আছেন পলাতক বা দেশের বাইরে। এই সুযোগে দলটির জামায়াত ঘেষা কয়েকজন নেতা হাইকমান্ডে যোগাযোগ করে। তারা হাইকমান্ডকে বোঝায় আন্দোলনের চূড়ান্ত সফলতা পেতে জামায়াতকে সঙ্গী হিসেবে দরকার। আলোচনায় খুব দ্রুত এগিয়ে যায়। তবে জামায়াতের সঙ্গে এক মঞ্চে দাঁড়াতে আপত্তি জানায় যুগপৎ আন্দোলনের শরিক অনেকগুলো দল। বিশেষ গণতন্ত্র মঞ্চের ৬টি দলের মধ্যে ৫টিই জামায়াতকে আন্দোলনের সঙ্গী করতে রাজি নয়। শোনা যাচ্ছিল, বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব সিদ্ধান্তের অনড়। আন্দোলনের শরিক-জোট-মিত্র যে যেই অবস্থায় আছে, সেভাবে রেখেই জামায়াতকে নিয়ে পৃথক মঞ্চ ঘোষণা করবে বিএনপি।
কিন্তু, জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে সমন্বিত একটি মঞ্চ বা ব্যানার গঠনের কার্যক্রম পিছিয়ে দিয়েছে বিএনপি। দলের ভেতরে ও বাইরে থেকে ব্যাপক নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া আসায় আপাতত প্রক্রিয়াটি স্থগিত বলে দাবি করেছেন দলের স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য। ওই নেতা জানান, রাজনৈতিক পরিস্থিতির কোনও পরিবর্তন না হলে এই প্রক্রিয়াটি আর না-ও এগোতে পারে। আপাতত যুগপৎ ধারায় সরকারবিরোধী কর্মসূচি দেয়াই লক্ষ্য বিএনপির।
অন্যদিকে, বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে থাকা দলের নেতারা মনে করেন, বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে জামায়াত যোগাযোগ স্থাপন করেছে এবং এক মঞ্চ গড়ার দিকে উভয়পক্ষের শীর্ষ একাধিক নেতা তৎপর। ফলে, যেকোনও সময়ই তাদের একসঙ্গে দেখা যেতে পারে।
গণতন্ত্র মঞ্চের প্রভাবশালী দুই নেতা বলেন, নির্বাচনের আগে যুগপৎ ধারায় কোনও পরিবর্তন আসছে না। তবে নির্বাচনের পর কী হবে, তা নিয়ে মঞ্চের কোনও দায় নেই। বিএনপি জামায়াতকে সঙ্গে নিলে স্বাভাবিকভাবেই গণতন্ত্র মঞ্চসহ আরও বেশ কয়েকটি দল যুগপৎ থেকে বেরিয়ে যাবে।
এদিকে, গণতন্ত্র মঞ্চের অপর একটি সূত্র জানায়, বিএনপির স্থায়ী কমিটি, গণতন্ত্র মঞ্চসহ অন্যান্য বিরোধী দলের নেতাদের সঙ্গে কর্মসূচি নিয়ে, কৌশল নিয়ে আলোচনা হলেও বিষয়বহির্ভূত সিদ্ধান্ত আসছে। একতরফা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে জানানো হচ্ছে। যে কারণে নির্বাচনের আগে আন্দোলনের স্বার্থে মঞ্চের অবস্থান তুলনামূলক উদার থাকলেও এর প্রভাব পড়তে পারে যুগপৎ কর্মসূচিতে। সূত্রের মতে, ৭ জানুয়ারি নির্বাচনের পর আর যুগপৎ আন্দোলন অব্যাহত না-ও হতে পারে।
বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, মহাসচিব মির্জা ফখরুল, স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, মিডিয়া সেলের প্রধান জহির উদ্দিন স্বপন কারাগারে এবং ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু দেশের বাইরে। এই সুযোগে দলের ডানপন্থি অংশটি এখন হাইকমান্ডের সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভূমিকা রাখছে। সে কারণে স্থায়ী কমিটিতে বা অন্যান্য জোটের সঙ্গে আলাপ হলেও তার কোনও প্রভাব সিদ্ধান্তে প্রতিফলিত হয় না। সবশেষ জামায়াতকে যুক্ত করার চেষ্টাটিও ডানপন্থি অংশের বলে দাবি করে সূত্র।
অপরদিকে, জামায়াত ইস্যুতে বিএনপির হাইকমান্ডের সঙ্গে গণঅধিকার পরিষদ, ১২ দলীয় জোট, গণফোরাম-পিপলস পার্টি সায় দিয়েছে। তবে অন্য দলগুলো নেতিবাচক অবস্থান নেয়। এমনকি গণতন্ত্র মঞ্চের মাত্র একজন নেতা প্রক্রিয়াটির পক্ষে সায় দিয়েছেন।
এ প্রসঙ্গে গণতন্ত্র মঞ্চের অন্যতম নেতা, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, ‘সব বিরোধী দলের রাজপথে থাকার মধ্য দিয়ে ঐক্য গড়ে উঠেছে। গণতন্ত্র মঞ্চ রাজপথের ঐক্যকে ধরে রাখবে। আমরা স্ব-স্ব ও যুগপতের অবস্থান থেকে আন্দোলন জোরদার এবং আরও সমন্বয় ও সংহতি গড়ে তুলতে চাই, যেন মানুষের আস্থা ফেরানো যায়। মানুষ দেখতে চায় সব বিরোধী দল এক হচ্ছে। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোকে নানা বিষয় বিবেচনায় রাখতে হয়।’