আসন্ন দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-১ মিরসরাই আসনে নৌকার মনোনীত প্রার্থী মাহবুবুর রহমান রুহেলের মোটর শোডাউন শেষে বাড়ি ফেরার পথে যুবলীগ নেতাকর্মীদের হাতে নৃশংসভাবে খুন হয়েছে এক ছাত্রলীগ কর্মী। নিহত ছাত্রলীগ কর্মীর নাম জুয়েল রাজা (২২)। তিনি মিরসরাইয়ের ১০ নং মিঠানালা ইউনিয়নের হাদিমুছা গ্রামের আলমগীরের ছেলে।
বুধবার (২৯ নভেম্বর) রাত ১১টার দিকে মিঠানালা ইউনিয়নের হাদিমুছা গ্রামের নতুন রাস্তার মোড় এলাকায় এই পরিকল্পিত হত্যার ঘটনা ঘটে। হত্যার ঘটনায় একই এলাকার দায়িত্বশীল যুবলীগ ও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা জড়িত।
এ ঘটনায় নিয়ত জুয়েলের বাবা আলমগীর ৪ জনের নাম উল্লেখ এবং আরও ৪/৫ জনকে অজ্ঞাত আসামি করে মিরসরাই থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। উল্লেখিত চারজন হলেন- মো. ইউনুস, রিয়াদ হোসেন, ফারুক ও আবুল বশর। অভিযুক্ত চারজনের মধ্যে মিঠানলা ইউনিয়ন যুবলীগের সহ-সভাপতি ইউনুসের বাবা আবুল বশর। ওমর ফারুক ইউনুসের খালাতো ভাই। রিয়াদ হোসেন ইউনিয়ন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক।
মিঠানালা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ছাত্রলীগ কর্মী জুয়েল বুধবার বিকালে মোটরসাইকেল যোগে মাহবুবুর রহমান রুহেলের মোটর শোডাউনে অন্যান্য নেতাকর্মীদের সঙ্গে অংশ গ্রহণ করে। শোডাউনটি মিরসরাইয়ের দক্ষিণ সীমান্ত বড়দারগারহাট থেকে শুরু হয়ে সন্ধ্যা ৭টায় উত্তর পশ্চিম প্রান্ত শান্তির হাট এলাকায় মাহবুবুর রহমান রুহেলের নিজ বাড়িতে শেষ হয়। শোডাউন শেষে নেতাকর্মীদের শুভেচ্ছা ও মতবিনিময় চলে রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত। রাতে কয়েকশতাধীক নেতাকর্মীদের জন্য খাবারের আয়োজন করা হয়। খাবার শেষে রাত ১১টা থেকে সাড়ে ১১টার সময় বাড়ি ফেরার পথে বাড়ির এক কিলোমিটার দূরত্বে নতুন রাস্তার মোড় এলাকায় পৌঁছালে আগে থেকে ওঁৎ পেতে থাকা যুবলীগ নেতা ইউনুস (৩৫), রিয়াদ হোসেন (২৬) ও ছাত্রলীগ কর্মী ফারুকসহ (২৬) ১০ থেকে ১২ জন তার পথরোধ করে বাকবিতণ্ডায় জড়ায়। পরে একপর্যায়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে পায়ের রগ কেটে এবং এলোপাতাড়ি কুপিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে পালিয়ে যায়। এ সময় স্থানীয় অর্ধশতাধিক দোকানদার ও সাধারণ মানুষ এগিয়ে আসলেও কেউ হত্যাকারীদের নিবৃত করার সাহস পায়নি।
স্থানীয় সূত্রে আরও জানা যায়, ইউনিয়ন যুবলীগের সহ-সভাপতি ইউনুসের সাথে নিহত জুয়েলের মাটি, বালি ও মাদক ব্যবসা নিয়ে ঝামেলা ছিল। কিছুদিন আগে এ সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে তাদের দুজনের মধ্যে মারামারি ঘটনাও ঘটে। এতে ইউনুস মারাত্মক আহত হয়। ওই ঘটনায় মিরসরাই থানায় জুয়েলের বিরুদ্ধে মামলা করলে থানা পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে।
জানা যায়, গত ২২ নভেম্বর ইউনিয়ন শ্রমিক লীগের নির্বাচন নিয়ে তাদের দুজনের মধ্যে আবার শত্রুতা মাথাচড়া দিয়ে ওঠে। দুই প্রার্থী নিয়ে তাদের দুজনের মধ্যে বাকবিতণ্ডা ও ধাক্কাধাক্কির ঘটনাও ঘটে।
মিঠানালা ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি আবু নোমান বলেন, ‘নিহত জিয়াউল হাসান ছাত্রলীগের কর্মী ছিল। ইউনুস ও রিয়াদ যুবলীগের রাজনীতি করত। খুনের ঘটনাটি আমাদের জন্য খুবই বেদনাদায়ক।’
জানতে চাইলে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি এ.কে খান বলেন, রাজনৈতিক মতবিরোধ থাকতে পারে, ব্যবসায়িক ভুল বোঝাবুঝি থাকতে পারে, তাই বলে এভাবে নিজ দলের একজন কর্মীকে হত্যা করতে হবে? এটা মানা যায় না। দোষীদের উপযুক্ত শাস্তি হওয়া উচিত।
জুয়েলের বাবা আলমগীর রাজা বলেন, আমার ছেলের সাথে ইউনুসের বিরোধ দীর্ঘদিনের। যার কারণে আমার ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার প্রস্তুতিও নিচ্ছিলাম। কিন্তু তারা আমার ছেলেকে পৃথিবী থেকে বিদায় করে দিল। আমি তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চািই।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মিরসরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কবির হোসেন বলেন, প্রাথমিক তথ্য-উপাত্ত ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য মতে জানা যায়, ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকে এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি ঘটেছে। আমরা জুয়েলের লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়েছি।
তিনি আরও বলেন, নিহতের পরিবার ৪ জনের নাম উল্লেখ করে ও আরও ৩/৪ জনকে অজ্ঞাত আসামি করে মিরসরাই থানায় একটি মামলা করেছে। উল্লেখিত, ৪ আসামি হলো- মো. ইউনুস, রিয়াদ, ফারুক ও আবুল বশর।
আজ বৃহস্পতিবার (৩০ নভেম্বর) বাদ আসর নিজ বাড়িতে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। জানাজায় ওয়ার্ড, ইউনিয়ন ও উপজেলা আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগসহ অঙ্গ সংগঠনের অনেক নেতাকর্মী উপস্থিত থাকলেও উপজেলা আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের শীর্ষস্থানীয় কোনো নেতাকর্মীকে দেখা যায়নি।
এ বিষয়ে পতিক্রিয়া জানতে ইঞ্জিনিয়ার মাহবুবুর রহমান রুহেলকে একাধিকবার ফোন করেও পাওয়া যায়নি।