বিদ্যালয়ের বার্ষিক পাঠ পরিকল্পনাকে ভাগ করে মাসিক, সাপ্তাহিক এবং দৈনন্দিন ক্লাস রুটিন তৈরি করা হয়। তারপর শিক্ষকরা ভর্তিকৃত সব শিশুকে এক বছরের পাঠ্যবিষয় শিক্ষা দিয়ে একটি করে শ্রেণি পাস করিয়ে উচ্চতর শ্রেণিতে নিয়ে যান। এই এক বছরে শিশুদের উত্তমরূপে শিক্ষাদানের জন্য শিক্ষকদেরও নানাভাবে প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করার কার্যক্রম চলমান থাকে। শিক্ষকরা যেন পাঠের বিষয়ে শিশুদের পর্যাপ্ত উদাহরণ সহকারে বোঝাতে পারেন সেজন্য রয়েছে শিক্ষক সংস্করণ নামক শিক্ষককে সহায়তাকারী পুস্তক। রয়েছে উপকরণাদি ক্রয়ের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ। শিশুরা ঠিকমতো শিখছে কিনা তা যাচাই করার জন্য শিক্ষকদের পাশাপাশি রয়েছেন পরিদর্শকরা। স্থানীয়দের বিদ্যালয়ের শিশুদের মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিতকরণের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার উদ্দেশে রয়েছে স্কুল ম্যানেজমেন্ট কমিটি, শিক্ষক অভিভাবক সমিতি, সামাজিক মূল্যায়ন কমিটি ইত্যাদি। কিন্তু এতকিছুর পরও দেখা যায় যে প্রায় প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কতিপয় শিশু তৃতীয়, চতুর্থ বা পঞ্চম শ্রেণিতে পড়লেও তারা পাঠ্যপুস্তকগুলো ঠিকঠাক মতো পড়তে পারে না। কেউ কেউ ঠিকঠাক মতো বর্ণগুলোকেও চেনে না। অথচ তারা শিশু শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে নিয়মিত বিদ্যালয়ে যাতায়াত করছে এবং সময়মতো প্রমোশনও পেয়ে যাচ্ছে।
এই যে পড়তে না পারা এবং বুঝতে না পারা শিশুর স্বাভাবিক বিকাশকে যেমন বাধাগ্রস্ত করে তেমনি তার যথাযথ সামাজিকীকরণকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। এসবের প্রভাব পরবর্তীকালে বড় হয়ে শিশুর ব্যক্তিত্বের বিকাশকেও দুর্বল করে দেয়। যে শিশু পাঠ বিষয়ে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষককে প্রশ্ন করতে অভ্যস্ত সে উচ্চ বিদ্যালয়ে গিয়েও অনুরূপভাবে অ-পাঠ সম্পর্কে শিক্ষককে জিজ্ঞেস করে জেনে নিতে পারে। শ্রেণীকক্ষে সে সর্বদাই নিরাপদ বোধ করে। যে শিশু পড়তে পারে না সে কি শিক্ষককে প্রশ্ন করতে পারে? এসব শিশুরা সাধারণত পেছনের বেঞ্চে বসে এবং কদাচিৎ শিক্ষকের চোখে চোখ রেখে কথা বলে। পড়তে না পারার কারণে এদের অধিকাংশ লাজুক প্রকৃতির হয়ে থাকে। পরিদর্শকরা খুব সহজেই এদের চিহ্নিত করে শিক্ষকের নিকটে এদের বিষয়ে যত্নবান হওয়ার জন্য আদেশ, নির্দেশ, অনুরোধ ইত্যাদি করে থাকে। কিন্তু এক-দুই মাস পর গিয়ে দেখা যায় যে অবস্থা আগের মতোই আছে। শিক্ষক তখন অনুপস্থিতির অজুহাত তোলেন। আপাতদৃষ্টিতে বিষয়গুলো স্বাভাবিক মনে হলেও বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে তা মেনে নেয়ার নয়।
রবীন্দ্রনাথ যথার্থই বলেছেন- ‘বিশ্ব ধর্মের সঙ্গে আমাদের ইচ্ছাকে মেলাতে পারলেই আমরা বস্তুত স্বাধীন হই।’ স্বাধীনতার নিয়মই তাই। আমি স্বেচ্ছায় বিশ্বের সঙ্গে যোগ না দেই যদি, তাহলেই বিশ্ব আমাদের প্রতি জবরদস্তি করে আমাকে তার অনুগত করবে। তখন আমার আনন্দ থাকবে না, গৌরব থাকবে না, তখন দাসের মতো সংসারে কানমলাখাব।’ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের ‘আসন ব্যবস্থাপনা’ এর মাধ্যমে এ অবস্থা থেকে কিছুটা উত্তরণ পাওয়া যেতে পারে। এই ব্যবস্থাপনাটি শিক্ষকদের প্রতিদিন করার কথা। অর্থাৎ শ্রেণিকক্ষে শিশুদের বিভিন্ন দিন এমনভাবে বসাতে হবে যেন পর্যায়ক্রমে সবাই সামনের বেঞ্চে, মাঝের বেঞ্চে এবং পেছনের বেঞ্চে বসে পাঠ গ্রহণ করতে পারে। এতে করে তাদের মধ্যে পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়াও ভালো হয়। ফলে পড়তে পারা শিশুর সঙ্গে বসার সুবাদে পড়তে না পারা শিশুও তার কাছে থেকে সাহায্য নিয়ে পড়া শিখতে পারে। এতে করে একঘেয়েমি দূর হয়। শিশুরা নিরাপদ এবং স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। সবার সঙ্গে হৃদ্যতা তৈরি হয়। কারো হীনন্মন্যতায় ভোগার সুযোগ থাকে না।
আবার শিক্ষক সুযোগমতো ইংরেজি ইউ-এর মতো শিশুদের বসিয়েও সবার সঙ্গে আই কন্টাক্ট ঠিক রেখে পাঠ শেখাতে পারেন। শিক্ষক দল গঠন করে একটি দলে পারগ শিশুর সঙ্গে অপারগ শিশু দুয়েকজন মিশিয়ে দিতে পারেন। এতে পাঠের বিষয়ে অপারগ শিশুরা পারগ শিশুদের কাছ থেকে শিখতে পারে। অনুপস্থিত শিশুদের অভিভাবকদের মোবাইল ফোনের মাধ্যমে উপস্থিত করা যায়। শিক্ষার্থীদের বাড়ি গিয়েও সঙ্গে করে নিয়ে আসা যায়। অভিভাবকদের সঙ্গে শিক্ষকরা নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করলে শিক্ষার্থী-অনুপস্থিতি কমবে। এমনিতেও শিক্ষককে অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলা ভালো। কারণ শিক্ষক যা কিছু শেখালেন সেগুলো শিশু বাড়ি গিয়ে অনুশীলনের সুযোগ কতটা পেল শিক্ষককে জানতে হবে। বাড়িতে শিশুর পড়ার জায়গা, খাবার-দাবার, টয়লেটের ব্যবস্থা ইত্যাদি সবকিছুই শিক্ষকের জানা থাকলে তিনি উন্নয়নের জন্য কাজ করতে পারবেন। কথায় বলে যে রাঁধে সে চুলও বাঁধে। অর্থাৎ শুধু রুটিনমাফিক কাজের বাইরেও একজন শিক্ষককে কিছু ভূমিকা রাখতে হবে। যে শিশুটি পড়তে পারে না সে বিদ্যালয়, পরিবার এবং সমাজে তার অবস্থান মোটেই সম্মানজনক নয় এবং নিরাপদও নয়। পরিদর্শনকালে দেখা যায় যেসব শিশু ভালোমতো পড়তে পারে না তারাই বিদ্যালয়ের শিক্ষকনির্দেশিত ফরমায়েসি কাজগুলো যেমন বেঞ্চ টানা, শ্রেণিকক্ষে ঝাড়ু দেয়া, আঙ্গিনার ময়লা পরিষ্কার করা, শিক্ষিকার বাচ্চা কোলে নিয়ে থাকার মতো কাজগুলো করে থাকে। এ যেন পড়তে না পারার পরোক্ষ শাস্তি। বিদ্যালয়ে গিয়ে কিছু কাজ করলে তেমন ক্ষতি নেই। কিন্তু সব শিশুকেই যদি সমানভাবে কাজে না লাগানো হয় এবং শুধু পড়তে পারে না বলেই কঠিন কাজে নিয়োজিত করা হয়, তখন তাদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়। শ্রেণিকক্ষেও এই পড়তে না পারার কারণে তারা সবসময় শিক্ষকের চোখকে এড়িয়ে চলতে চায়। কী যেন একটা দ্বিধাগ্রস্ত মন নিয়ে তারা শ্রেণিকক্ষে অবস্থান করে। সহপাঠিদের সঙ্গে খেলাধুলা-মেলামেশা সবই ঠিক আছে কিন্তু শিক্ষকের সঙ্গে পাঠবিষয়ক কোনো কথা তারা বলতে পারে না। এতে শিক্ষকের সঠিক তদারকি থেকে তারা বঞ্চিত হয়। অথচ শিক্ষক এবং পরিদর্শদের তদারকহীনতার কারণে আজ তাদের এই অবস্থা।
শ্রেণিকক্ষে রিডিং পড়া মুখস্থ করানো থেকে শিক্ষককে সরে আসতে হবে। পরিদর্শনকালে দেখা যায় পুরো অধ্যায় শিশু পড়ে দিচ্ছে। কিন্তু মাঝখান থেকে একটি শব্দ ধরলে তা শিশু পড়তে পারে না। অথচ শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে উচ্চস্বরে বলে দিচ্ছেন। সঙ্গে সঙ্গে শিশুরাও তা বলে পাঠ মুখস্থ করে ফেলছে। তাৎক্ষণিকভাবে যে কেউ মনে করবেন শ্রেণিকক্ষে অনেক পড়ালেখা হচ্ছে। শিক্ষক বলতে বলতে ক্লান্ত হলে যেসব শিক্ষার্থী বাড়ি থেকে পড়া শিখে বিদ্যালয়ে এসেছে তাদের দিয়েও পাঠ মুখস্থ করিয়ে দিচ্ছেন এমনও দেখা যায়। এই বিষয়টি না করে শিক্ষার্থীদের বর্ণ চিনিয়ে শব্দ এবং বাক্য পড়তে শেখাবেন শিক্ষক। প্রধান শিক্ষক এবং পরিদর্শকরা বিষয়টি অবশ্যই নিশ্চিত করবেন। আজকে যেসব শিশু পাঠ্যপুস্তক পড়তে পারছে না অতীতে তাদের পিতামাতাও এই একইভাবে পড়া না শিখে স্কুল পাড়ি দিয়েছিল। যার ফলে আজ সেই পিতামাতাদের নিরক্ষরতার কারণে তাদের শিশুর শিক্ষালাভের আইনি অধিকারগুলো বুঝতে পারা, সেগুলোর সুযোগ গ্রহণ করা এবং যথাযথ ব্যবহার করার ক্ষমতা তারা হারিয়ে ফেলেছে।
নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন তার ভারত উন্নয়ন ও বঞ্চনা গ্রন্থে লিখেছেন, প্রতিষ্ঠিত আইনি অধিকারগুলোর লঙ্ঘন আটকানোর নানাবিধ উপায় আছে; কিন্তু বঞ্চিতরা এসব উপায়ের নাগাল পায় না; এখানে স্কুল শিক্ষার অভাব সরাসরি সুরক্ষাহীনতার কারণ হয়ে উঠে। ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ বিনির্মাণের ধারাবাহিকতার বাংলাদেশ ২০২১ সালের ১২ ডিসেম্বর ফাইভ জি যুগে প্রবেশ করেছে। উল্লেখ্য ২০১৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি বিশ্বে ফাইভ জি প্রযুক্তির সূচনা করে প্রথম কোরিয়া ও পরে আমেরিকা। অতীতের তিনটি শিল্প বিপ্লব থেকে দূরে থাকা একসময়ের কৃষিনির্ভর অর্থনীতির বাংলাদেশ বর্তমানে সব পশ্চাৎপদতা কাটিয়ে ডিজিটাল প্রযুক্তিতে উন্নত বিশ্বের সমান্তরালে চলছে। এই ফাইভ জি প্রযুক্তির যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, আই ও টি, রোবোটিক্স, বিগ-ডাটা, ব্লকচেইন, স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য প্রযুক্তির আই ও টি, হিউম্যান টু মেশিন, মেশিন টু মেশিন ইত্যাদি প্রযুক্তির ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করতে জানতে হবে সবাইকে। কারণ আগামী দুই দশকের মধ্যে মানবজাতির প্রায় অর্ধ-শতাংশ কাজ স্বয়ংক্রিয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন যন্ত্রের মাধ্যমে হবে মর্মে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। এজন্য চাই জ্ঞানভিত্তিক ডিজিটাল সাম্য সমাজ প্রতিষ্ঠা। যে সমাজ ২০৪১ সালে বাংলাদেশকে বিশ্বে উন্নত দেশ হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড় করাবে।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক খবরে বলা হয়েছে, দেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির হার ৯৮% হলেও এই শিশুরা কতটা মানসম্পন্ন শিক্ষা অর্জন করছে সেটা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বাংলাদেশে মাত্র ৩৫% শতাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বাংলা পড়তে পারে। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশের ৬৫% প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বাংলাই পড়তে পারে না। ইংরেজি ও গণিতে তার চেয়েও বেশি দুর্বল। আমাদের ভর্তিকৃত সব শিশুকেই বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার জন্য সরকার কর্তৃক নির্ধারিত ২৯টি প্রান্তিক যোগ্যতা অর্জন করাতে হবে। বাংলা ইংরেজি এবং গণিত বিষয়ক প্রান্তিক যোগ্যতাসমূহ প্রসঙ্গত উল্লেখ করছি। এগুলো হলো- যথাক্রমে বাংলাভাষার মৌলিক দক্ষতা অর্জন এবং জীবনের সর্বক্ষেত্রে কার্যকরভাবে তা ব্যবহার করা, বিদেশি ভাষা হিসেবে ইংরেজি ভাষায় মৌলিক দক্ষতা অর্জন ও ব্যবহার করা এবং গাণিতিক ধারণা ও দক্ষতা অর্জন করা। তাই আর কোনো শিক্ষার্থী অনুপস্থিতি নয়, কোনো শিক্ষার্থী পড়তে না পারা নয়। একাজের বিষয়ে পারস্পরিক দোষারোপ করেও কাজ নেই। কর্তৃপক্ষ বলে শিক্ষকের আন্তরিকতার অভাব, আর শিক্ষক বলে অভিভাবক শিক্ষিত/সচেতন নয়, বাড়িতে কিছুই লেখাপড়া করে না- ইত্যাদি অজুহাত আর চলতে দেয়া নয়। কারণ শিশুর মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষাপ্রাপ্তি নিশ্চিত করার কাজ শুধু শিক্ষকের একার নয়; সংশ্লিষ্ট সবাইকে সমন্বিতভাবে প্রচেষ্টা চালাতে হবে।
প্রশিক্ষণকালে অধিকসংখ্যক শিক্ষার্থীদের কীভাবে শেখানো যায় সে বিষয়ে বলা হয়, শিক্ষককে শ্রেণীর সর্বত্র ঘুরে ঘুরে শেখানোর বিষয়ে বলা হয়। আকর্ষণীয় উপকরণাদি ব্যবহারের মাধ্যমে শিশুকে খেলার ছলে শিক্ষাদানের বিষয়ে বলা হয়, সংগীত, চারুকলা, গল্প বলা, বিতর্ক প্রতিযোগিতা ইত্যাদিতে অংশগ্রহণ করানোর মাধ্যমেও শিক্ষাদানের কথা বলা হয়। সবশেষে বলা হয়, শিক্ষক তার শ্রম মেধা, ধৈর্য, পক্ষপাতহীনতা, বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ, সর্বোপরি শিশুর সঙ্গে একাত্ম হয়ে নিজে যেভাবে শিখেছিলেন সেভাবেই শেখানোর চেষ্টা করবেন। পরিদর্শকদেরও শ্রেণিকক্ষে গিয়ে প্রথমতো শিক্ষকের ভূমিকাভিনয় করতে হবে। তবেই দেশের প্রতিটি শিশুর মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা অর্জনের মাধ্যমে সর্বত্র নিরাপত্তাপ্রাপ্তি নিশ্চিত হবে।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও উপজেলা শিক্ষা অফিসার