স্বাধীনতা পূর্ব এবং পরবর্তী বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলসহ পার্বত্য জেলা সমূহে প্রচুর বেতঝাড় ছিল। স্বাধীনতার পর ক্রমান্বয়ে এ বেতঝাড়গুলো অর্থনৈতিক প্রয়োজনে এক একটি বেতবাগানে পরিণত হয়েছিল। বেতগাছ থেকে তৈরি সিলেটের শীতলপাটির নাম ছড়িয়ে পড়েছিল দেশ ছেড়ে বিদেশেও। এর বাইরে বেতগাছ থেকে তৈরি রান্না ঘরের বিভিন্ন দ্রব্যসামগ্রী যা ছিল খুবই টেকসই। তাছাড়া চট্টগ্রাম অঞ্চলসহ সারাদেশের কৃষিপ্রধান এলাকা সমূহে কৃষি কাজে ব্যবহৃত হত আরি (ধান এবং চাল মাপার একক) পেঅরগ্গা, (মাটি কেটে নেয়ার পাত্র বিশেষ ), গোলাঘর, (শস্য রাখার বড় পাত্র) ইত্যাদি সামগ্রী।
এসব জিনিষ বেতের মাধ্যমে বিভিন্ন কারুকাজ করে হাত দিয়ে তৈরি করে তা বাজারে বিক্রি করা হতো। এছাড়াও শুকনো বেত দিয়ে বিভিন্ন হস্তশিল্প জাতীয় জিনিসপত্র তৈরি করা হয়, যেমন- চেয়ার, টেবিল, মোড়া, ডালা, কুলা, চাঙ্গারী, মুড়া, ঢুষি, হাতপাখা, চালোন, টোকা, গোলা, ডোল, ডুলা, আউড়ি, চাঁচ, ধামা, পাতি, বই রাখার তাক, সোফা, দোলনা, খাট, ঝুড়ি, টেবিলল্যাম্প, ল্যাম্পশেড ইত্যাদি।
পরবর্তীতে এটি দিয়ে ফার্নিচারও বানাতে থাকে এ শিল্পের সাথে জড়িতরা। ফলে এটির অর্থনৈতিক গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। বিশেষ করে বাংলার ঐতিহ্য রক্ষায় অনেক বাঙালিই বেতগাছের তৈরি চেয়ার, মোড়া, ডাইনিং টেবিল, সোফা ইত্যাদি ব্যবহার করতে থাকে। বেতের তৈরি ফার্নিচার হালকা হওয়ায় এটি যেখানে সেখানে নিয়ে যাওয়া সহজ হয় এতে করে আশির দশকের দিকে এটির ব্যাপক মানুষ ঝুঁকে পড়ে এবং এই ফার্নিচারের কদরও বাড়তে থাকে। তখন এগুলোর দাম এতবেশি ছিল যে শুধু সৌখিন মানুষরাই এগুলো তাদের ড্রয়িং রুমে কিনে নিয়ে গিয়ে ড্রয়িং রুমের শোভাবর্ধন করত। পরবর্তীতে মানুষ তাদের বসবাসের জন্য বাড়িঘর তৈরি করতে থাকায় গ্রামেগঞ্জে প্রচুর সংখ্যক বেতঝাড় কেটে ফেলতে হয় আর পার্বত্য চট্টগ্রামে জুমচাষের ব্যাপকতা বৃদ্ধি পাওয়ায় পার্বত্য অধিবাসীরা বেতগাছ কেটে বিভিন্ন পাহাড়ে ঝুমচাষ করতে শুরু করে, ফলে দেখা দেয় বেতগাছ সংকট। অবশ্য পার্বত্য অধিবাসীরা বেতগাছের তৈরি দ্রব্য ব্যবহার না করলেও পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়গুলোতে অবাধে গজিয়ে ওঠা বাঁশের তৈরি সামগ্রী হরহামেশাই ব্যবহার করে থাকেন।
বর্তমানে বেতের তৈরি দ্রব্যসামগ্রী সৌখিন মানুষ ছাড়া কাউকে তেমন একটা ব্যবহার করতে দেখা যায় না। বেশিরভাগ ফার্নিচার এখন বিভিন্ন গাছ এবং হার্ডবোর্ড দিয়ে বানানো হয়। আরি, লাই, খাঁচা, ধানের গোলা, রান্না ঘরের তৈজসপত্রাদি এখন বাঁশ, টিন কিংবা প্লাস্টিক দখল করে নিয়েছে। দূর অতীতে মাস্টার মশাইদের হাতেহাতে শোভা পেতো এই বেতের টুকর। মূলত, ছাত্র-ছাত্রীদের শাসনের জন্য এই বেত ব্যবহার হতো। তখনকার সময়ে বিদ্যালয়গুলোতে মাস্টার মশাইদের বেতের আঘাত সহ্য করতে হয় নাই এমন ছাত্র খুব কমই ছিল। বর্তমানে অবশ্য বিদ্যালয়গুলোতে এর ব্যবহার নেই বললে চলে। বেতগাছের ফল খুবই সুস্বাদু। এটি দেখতে অনেকটা গোলাকার এবং আকৃতি বেশ ছোট। টকমিষ্টি মিশ্রিত এই ফলের এখন তেমন একটা দেখা মেলেনা। চট্টগ্রামের ভাষায় বেত ফলকে বেতগুলা বলা হয়। এখনও কদাচিত এই বেতগুলা বিভিন্ন গ্রামের বেতজঙ্গলে দেখা মেলে, তাও অত্যন্ত স্বল্পপরিমাণ।
প্রথম দিকে এই বেতশিল্প টিকে ছিল চাহিদার কারণে। কালক্রমে প্লাস্টিক এবং বাঁশের তৈরি দ্রব্যসামগ্রী জনপ্রিয় হয়ে ওঠায় বেতশিল্প চাহিদা হারায় এবং এটি আস্তেআস্তে হারিয়ে যেতে থাকে। বর্তমানে এটি একেবারে বিলুপ্ত হয়ে না গেলেও এ শিল্পের সাথে জড়িত বেশিরভাগ মানুষই তাদের পেশার পরিবর্তন ঘটিয়েছে। মূলত, চাহিদার কম থাকায় বেতশিল্পের প্রসারে তেমন করে কেউ উদ্যেগ নিয়ে এ শিল্পকে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি নিচ্ছে না। তাছাড়া এখন বেতগাছের বাগানও মানুষ আগের মত গড়ে তুলছে না ফলে এটি আস্তেআস্ত দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠছে।
বেতশিল্পের মত এমন একটা সুন্দর হস্তশিল্প শুধুমাত্র উদ্যেগের অভাবে হারিয়ে যাবে এটি হতে পারে না। যে শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে পারলে আমাদের ইতিহাস এবং ঐতিহ্য টিকে থাকবে সে শিল্পকে টিকিয়ে রাখার জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষকে কার্যকরি পদক্ষেপ নিতে হবে। এ শিল্পের সাথে জড়িতদের বাঁচিয়ে রাখতে পারলেই বেতশিল্প বেঁচে যাবে। বেতশিল্পকে বাঁচাতে হলে সরকারি উদ্যোগে এ শিল্পের সাথে জড়িতদের সুদমুক্ত ব্যাংক ঋণসহ বিভিন্ন সুযোগ সুবিধার আওতায় আনতে হবে। প্রয়োজনবোধে সরকারি খরশে বিভিন্ন জেলায় বেতবাগান গড়ে তুলে সরকারিভাবে বেতশিল্পীদের ভরণপোষণের দায়িত্ব নিতে হবে। আর এতে বেতশিল্পের সাথে জড়িতরা স্বাবলম্বী হয়ে উঠবে এবং একটা সময় এরাই বেতশিল্পকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে।
সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া এ শিল্পের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব। তাই এমন একটা সুন্দর শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সরকার এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো এগিয়ে আসবেন বলে আমরা প্রত্যাশা করছি।
লেখক : কলেজ শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক