রাষ্ট্রের একজন মানুষের জন্ম, বয়স, পরিচয় ও নাগরিকত্বের প্রমাণের অন্যতম উপাদান হলো জন্ম সনদ। স্কুলে ভর্তি, পাসপোর্ট ও এনআইডি করাতে প্রয়োজন জন্মনিবন্ধনের। এই জন্ম সনদ পেতে কিংবা ভুল হলে তা সংশোধনে চরম ভোগান্তিতে পড়ছে সেবা গ্রহীতারা। জন্মনিবন্ধন করাটাই এখন যেন জন্মের কষ্ট হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবী সার্ভার জটিলতার কারণে আবেদন থেকে শুরু করে সংশোধন পর্যন্ত কোনটিই সময়মতো করা যাচ্ছে না।
চট্টগ্রাম নগরীর পূর্ব ষোলশহর ওয়ার্ডের বাসিন্দা কোহিনুর আকতার নিপা একজন গৃহিনী। স্কুলে ভর্তির জন্য সন্তান ইয়াছিন আরাফাতের জন্ম সনদে ইংরেজীতে নাম ভুল হওয়ায় গত ১ মাস যাবত তা সংশোধনের জন্য ৬নং পূর্বষোলশহর ওয়ার্ড নগর ডিজিটাল সেন্টার ঘুরেও সার্ভার জটিলতার কারণে সেবা থেকে বঞ্চিত।
তিনি দৈনিক দেশ বর্তমানকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী ডিজিটাল বাংলাদেশ হলেও ডিজিটাল প্রবলেমে ভোগান্তি বেশী। গত ১ মাস ধরে নামের একটি বানান সংশোধনের জন্য ঘুরছি, এখনও ঠিক করতে পারিনি। ওরা বলছেন সার্ভার জটিলতা, কিন্তু এ জটিলতা আর কতদিন? এটার জন্য সরকারের এত উন্নয়ন ঢাকা পড়বে। আমার শীঘ্রই এটার সমাধান চাই, না হয় বাচ্চাকে স্কুলে ভর্তি করাতে পারবো না।
নিপা আরও বলেন, আমার জন্ম সনদেও ভুল আছে। যেখানে আমার নাম স্পস্ট লেখা থাকলেও লিঙ্গের জায়গায় পুরুষ হওয়ায় তাও সংশোধন করতে বারবার চেষ্টা করেও এখন পর্যন্ত ঠিক করতে পারিনি। তিনি ক্ষোভ জানিয়ে বলেন, সরকারের এত টাকা খরচের পরও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের গাফিলতির কারনে আমাদের এমন দুর্ভোগ।
গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নগরীর ৬ নং পূর্বষোলশহর ওয়ার্ড ও ১৫ নং বাগমনিরাম ওয়ার্ড নগর ডিজিটাল সেন্টারসহ নগরীর বেশ কয়েকটি নগর ডিজিটাল সেন্টার ঘুরে দেখা যায় সার্ভার জটিলতায় জন্ম সনদ পেতে এবং সংশোধনে চরম ভোগান্তিতে পড়ছে সেবাগ্রহিতারা।
পূর্ব ষোলশহর ওয়ার্ড ডিজিটাল সেন্টারে সেবা নিতে আসা মো. বাহাদুর দেশ বর্তমানকে বলেন, আমার মেয়ের জন্ম সনদ সংশোধন করতে গত এক বছর ধরে চেষ্টা করছি, এমনকি জেলা প্রশাসকসহ অনেকের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছি কিন্তু কোথাও সমাধান পাচ্ছি না। মেয়ে অসুস্থ থাকায় দেশের বাইরে চিকিৎসা নিতে পারছি না কারণ জন্ম সনদে ভুল হওয়ায় পাসপোর্টও করতে পারছি না। মেয়ের অসুস্থতা নিয়ে ভীষণ চিন্তায় আছেন বলে জানান তিনি।
একইদিন ১৫ নং বাগমনিরাম ওয়ার্ড ডিজিটাল সেন্টারে আসা মো. জামাল হোসেন দৈনিক দেশ বর্তমানকে বলেন, আমার ছেলে ছাহিদ ইবনে হোসেন এবার এসএসসি পরীক্ষা দিবে। তবে জন্ম সনদে ২০০৯ এর স্থলে ২০০৭ হওয়ায় তা সংশোধন করতে পারছিনা। কারণ সরকারের নিয়ম অনুযায়ী ১৭ বছরের মধ্যে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করতে হয়। নানা জটিলতায় আমার ছেলের শিক্ষা জীবন হুমকিতে পড়েছে।
শুধু নগর নয় চট্টগ্রাম জেলার বিভিন্ন ইউনিয়নেও সার্ভার জটিলতায় চরম ভোগান্তিতে সাধারন জনগণ। আব্বাস উদ্দিন মানিক একজন বেসরকারী চাকুরীজীবী। স্ত্রী ফারজানা ইয়াছমিনের বাড়ি চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার কদমতলী ইউনিয়নে। তাদের ৮ বছরের কন্যা সন্তান জান্নাতুল ফেরদৌকে ভর্তি করাতে প্রয়োজন জন্ম নিবন্ধন সনদ সংশোধন। প্রায় দুমাস ধরে চেষ্টা চালিয়ে এখনও করতে পারেনি সংশোধনের আবেদন। ফলে সন্তানকে স্কুলে ভর্তি নিয়ে পড়েছেন অনিশ্চয়তায়। হতাশ হয়ে প্রতিনিয়ত ঘুরছেন কদমতলী ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারে।
ভুক্তভোগী আব্বাস উদ্দিন মানিক দেশ বর্তমানকে বলেন, বর্তমান ডিজিটাল যুগে সার্ভার জটিলতার নামে ডিজিটাল সমস্যার কারণে আমার স্ত্রীর জন্ম সনদ সংশোধন করতে দুই মাস ধরে চেষ্টা চালালেও সংশোধন করতে পারছিনা। সরকারের এত টাকা খরচ হলেও কিছু কর্মকর্তাদের গাফিলতির কারণে আজ আমরা সাধারণ মানুষ দুর্ভোগে পড়ছি। এটার দ্রুত সমাধান না করলে, সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হবে বলেও মনে করছেন এই ভুক্তভোগী।
এভাবে নগর ও জেলায় প্রতিটি ডিজিটাল সেন্টারে সার্ভার জটিলতায় হাজার হাজার ভুক্তভোগী জন্মসনদ পেতে এবং ভুল সংশোধন করতে মাসের পর মাস ভোগান্তিতে পড়ছে।
বিষয়টি নিয়ে ৬নং পূর্বষোলশহর ওয়ার্ড ডিজিটাল সেন্টারের জন্ম নিবন্ধন সহকারী বনশ্রী সেন গুপ্তা দৈনিক দেশ বর্তমানকে বলেন, সার্ভার জটিলতায় জন্ম সনদের আবেদন ও জন্ম সনদ কোনটিই ঠিক মতো করতে পারছি না। এমনকি অনলাইনে পেমেন্টে নিলেও সার্ভার জটিলতায় শো করে না। তাছাড়া কোন কিছুই সময়মতো ডাউনলোড করতে পারছিনা। সেবা গ্রহীতাদের ফরম জমা নিলেও ডেলিভারি দিতে পারছিনা। ফলে গ্রাহকদের ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। এটা নিয়ে রেজিস্ট্রার জেনারেল কার্যালয়ে (জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন) বারবার জানালেও কোন সমাধান পাওয়া যাচ্ছেনা বলেও দাবী করেন এই নিবন্ধন কর্মকর্তা।
একই বিষয়ে ১৫ নং বাগমনিরাম ওয়ার্ড ডিজিটাল সেন্টারের জন্ম নিবন্ধন সহকারী মো. শামীমুল দৈনিক দেশ বর্তমানকে বলেন, জন্ম সনদ ও সংশোধন করার আবেদন করলে ওটিপি যাচ্ছে না। অন্যদিকে ই-পেমেন্ট দেওয়ার পরও ম্যাসেজ আসে না। তাছাড়া সংশোধনে যদি বিভাগানুযায়ী যাচাইয়ের দায়িত্ব দিলে হয়তো কিছুটা ভোগান্তি কমতো বলে মনে করেন তিনি।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের(সুজন) চট্টগ্রাম সভাপতি আখতার কবির চৌধুরী জানান, সার্ভার জটিলতার কারণে এমন ভোগান্তি মেনে নেওয়া যায় না। যেন দেখার কেউ নেই। দ্রুত এর সমাধান করে ভোগান্তি নিরসন করতে সংশ্লিষ্টদের আহ্বান জানান তিনি।
বিষয়টি জানতে চাইলে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ মুহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম দেশ বর্তমানকে বলেন, নগর ডিজিটাল সেন্টারগুলো সার্ভার জটিলতায় জন্ম নিবন্ধনসহ নানা সেবা দিতে অসুবিধা হওয়ার বিষয়টি জানতে পেরেছি। ইতিমধ্যে আমি রেজিস্টার জেনারেল মহোদয়ের সাথে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছি এবং তিনি তা দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন।