‘বিকল্প’র খোঁজে বিএনপি

# আগামী সপ্তাহে বিকল্প কর্মসূচির পরিকল্পনা # চলছে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব নিয়ে আলোচনা আন্দোলন ও দমন-পীড়ন অব্যাহত থাকলে সমাধানের পথ বের করা কঠিন ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, স্থায়ী কমিটির সদস্য, বিএনপি

টানা অবরোধ, নেই নতুন কর্মসূচি। দলের মহাসচিবসহ শীর্ষ নেতারা গ্রেপ্তার। দেশব্যাপী ধরপাকড়ে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়ার নেতায় সংকট। আত্মগোপনে থেকেও গ্রেপ্তার এড়াতে পারছে না নেতারা। এসবে কয়েক দিনের ব্যবধানে বিধ্বস্ত অবস্থা দাঁড়িয়েছে বিএনপিতে। দলটির তৃণমূল থেকে দাবি উঠেছে বিকল্প খোঁজার। কর্মসূচিতে এবং আন্দোলনের নেতৃত্বে বিকল্প নিয়ে আলোচনা হচ্ছে দলটির উচ্চ মহলেও।
বিএনপি বর্তমান নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কার করে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন চায়। আর আওয়ামী লীগ এই আন্দোলনের মধ্যেই বিদ্যমান পদ্ধতিতে আগামী নির্বাচন সম্পন্ন করায় অনড়। আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে বিএনপির মধ্যে শঙ্কা দেখা দিয়েছে, তাদের আন্দোলন বা নির্বাচনে অংশ নেওয়া-না নেওয়াকে পাত্তা নিয়ে জানুয়ারিতে নির্বাচন করে ফেলবে আওয়ামী লীগ। এই প্রেক্ষাপটে বিএনপি তাদের আন্দোলন কর্মসূচিতে নতুন মাত্রা যোগ করার পরিকল্পনা করছে। যুগপৎ আন্দোলনে থাকা দলগুলোর সঙ্গেও এ নিয়ে যোগাযোগ চলছে। এরই মধ্যে এক দিনের হরতাল ও দুই দফায় অবরোধ কর্মসূচি পালনের পর বিএনপির উপলব্ধি হচ্ছে, মানুষ একই কর্মসূচি টানা দিলে গুরুত্ব দেয় না। যে কারণে হরতাল ও প্রথম দফার অবরোধে মানুষ নৈতিকভাবে সাড়া দিলেও দ্বিতীয় দফার অবরোধে গতকাল শেষ দিনে কর্মসূচি ঢিলেঢালাভাবে হয়েছে। জীবিকার প্রয়োজনে মানুষ কাজে যাচ্ছে, সড়কে বেড়েছে যানবাহন। টানা অবরোধে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। এগুলো মানুষের জন্য ক্ষতিকর এবং বিষয়গুলো বিএনপি নেতারা অনুধাবন করে। ফলে গতকাল আবারো ৪৮ ঘন্টার অবরোধ দিলেও আগামী সপ্তাহে অবরোধের বিকল্প নতুন কর্মসূচি দেওয়ার পরিকল্পনা করছে বিএনপি।
বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের এক নেতা বলেন, হরতাল-অবরোধ কর্মসূচি এবং দলীয় নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার সমানতালে চলছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে মনে হচ্ছে অবরোধ চালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে তা বিএনপির জন্যই ক্ষতিকর হবে। শহর থেকে গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত নেতা-কর্মীরা বাড়িছাড়া। এমনকি এলাকা ছাড়া। এভাবে চলতে থাকলে আন্দোলনের নিয়ন্ত্রণ দলের হাতে রাখা যাবে না।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, ‘আমাদের কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবে শুরু হয়েছে, শান্তিপূর্ণভাবেই চলবে। সিনিয়র নেতাদের গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে নতুন ধরনের কর্মসূচি আসবে।’ তিনি বলেন, বিরোধীদের চলমান আন্দোলন ও সরকারের দমন-পীড়ন অব্যাহত থাকলে সমাধানের পথ বের করা কঠিন। এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মধ্যস্থতার কাজে আসতে পারে।
এদিকে, কর্মসূচিতে নতুনত্ব আনার পাশাপাশি আন্দোলনের নেতৃত্ব নিয়ে জোর আলোচনা হচ্ছে দলের মধ্যে। মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ শীর্ষ নেতাদের প্রায় সবাই কারাগারে থাকায় বিকল্প কাউকে সামনে থেকে আন্দোলন পরিচালনার প্রয়োজন বোধ করছে তৃণমূল নেতা-কর্মীরা। তাছাড়া, নেতাদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ পশ্চিমা বিশ^ বিএনপির প্রতি অন্যায্য হিসেবে দেখছে। গ্রেপ্তারে তারা বিবৃতি দিয়ে নিন্দা ও উদ্বেগ প্রকাশ করছে। সেক্ষেত্রে, দলের পক্ষে পশ্চিমা শক্তির সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা ও প্রেক্ষাপট তুলে ধরার মত গ্রহণযোগ্য নেতা নির্ধারণ করারও প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী দলটির দপ্তরও দেখেন। এর আগে দেখা গেছে, রিজভী গ্রেপ্তার হওয়ার পর সাংগঠনিক সম্পাদক এমরান সালেহ প্রিন্সকে ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দপ্তরের কার্যক্রম সামলানোর জন্য চিঠি দেওয়া হয়। গত ২৯ অক্টোবর মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গ্রেপ্তার হওয়ার পরপরই ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব নিয়ে দলে আলোচনা শুরু হয়। তবে, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমান চলমান আন্দোলনে যে যেখান থেকে পারে সেখান থেকেই নেতৃত্ব দেওয়ার নির্দেশনা দিলে এবং সিনিয়র অধিকাংশ নেতা গ্রেপ্তার হওয়ায় ওই আলোচনা থেমে যায়। কিন্তু নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তা থেকে আবারো বিকল্প নেতা নির্ধারণ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।
এক্ষেত্রে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে আত্মগোপনে থেকে আন্দোলনে অবদান রাখা কয়েকজন নেতার নাম সামনে আসছে। বর্তমানে শীর্ষদের মধ্যে কেবল সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী প্রকাশ্যে ঢাকার সড়কে অবরোধের পক্ষে মিছিল করছে। বিএনপির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, মহাসচিব আটক বা গ্রেফতার হলে কিংবা অন্য কোনো কারণে তার অনুপস্থিতিতে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করবেন। সে অনুযায়ী ফখরুলকে আটক করার পর তার মুক্তি চেয়ে দলের পক্ষ থেকে বিবৃতিও দেন রিজভী। তবে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান চাইলে স্থায়ী কমিটির কোনো সদস্য বা অন্য যে কাউকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দিতে পারেন। নানা দিক বিবেচনায় রিজভী ছাড়াও কূটনৈতিকভাবে অভিজ্ঞ স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান এবং ড. আবদুল মঈন খানের নামটিও আলোচনায় রয়েছে।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বলা যায় আন্দোলনের নেতৃত্ব স্বয়ং দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন নিজেই দিচ্ছেন। তিনি জেলা পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রক্ষা করছেন নিয়মিত। তবে, কূটনৈতিক যোগাযোগের জন্য হলেও জ্যেষ্ঠ কাউকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে বলে দলটির দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে।