আপাতত ‘স্বস্তিতে’ আওয়ামী লীগ

* ‘বিএনপি সন্ত্রাসী দল- এ তকমা কতদিনে কমাতে পারবে তা নিয়ে সংশয় আছে’ * ‘ভিসা নিষেধাজ্ঞা বা অর্থ ছাড়ে মার্কিনীদের নানা শর্ত সহসাই শেষ হয়ে যাবে না’ * মেগা প্রকল্প, বিএনপির সহিংসতা, সুষ্ঠু নির্বাচনের অঙ্গীকার সবই আওয়ামী লীগের জন্য ইতিবাচক’

গত কয়েকদিনের রাজনৈতিক কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দেশের বড় দুটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে যোজন যোজন ব্যবধান প্রকাশ পেয়েছে বলে মনে করছেন রাজনীতি বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, রাজনীতিতে সহিংসতা আগে ছিল, মাঝে বন্ধ ছিল, এখন তা আবার ফিরে এসেছে। ফলে দল হিসেবে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়া অনেকটা সহজ হয়ে যাবে। এই কদিনের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচন নিয়ে আপাতত ‘স্বস্তি’তে থাকতে পারে আওয়ামী লীগ।
ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ বলেন, বিগত কয়েকদিনের রাজনৈতিক সহিংসতা আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে যোজন যোজন ব্যবধান তৈরি করে দিলো। এই ব্যবধানকে বিএনপি কতদিনে কমাতে পারবে তা নিয়ে সংশয় আছে। তিনি বলেন. একটু একটু করে গড়ে তোলা আন্দোলনের ভবিষ্যৎ অনেকটাই ঝিমিয়ে পড়লো, কেবল বিএনপির এই সহিংস রূপ দেখে। কারণ ক্ষমতাসীন দল বহু আগে থেকেই দেশে-বিদেশ সবখানে এইকটাই দাবি করে আসছে যে, বিএনপি একটি সন্ত্রাসী দল, সুযোগ পেলেই তারা দেশে জ¦ালাও-পোড়াও, অগ্নি সন্ত্রাস, হত্যা-মারামারি করবে। ফলে বিএনপির উপর কোনভাবেই ভরসা করা যায় না। গত কয়েকদিনে বিএনপির কর্মসূচী আওয়ামী লীগের বক্তব্যকেই সত্য প্রমাণ করেছে। ফলে উন্নয়নের ধারবাহিকতা রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দেয়া আওয়ামী লীগ অনেকটাই স্বস্তিতে থাকবে বলে মনে করেন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের এই অধ্যাপক। তিনি আশংকা প্রকাশ করেন যে, নির্বাচনের তফশিল ঘোষণার পর এই সহিংসতা আরও বাড়তে পারে। সকলকে সজাগ দৃষ্টি রাখা এবং সচেতন থাকারও আহ্বান জানান তিনি। রাজনীতিতে ছাড় দেয়ার কথা থাকলেও সংলাপ নিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির অনড় অবস্থানের কারণে তৃতীয় পক্ষ সুবিধা নিতে পারে বলেও মনে করেন তিনি।
এদিকে, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, দীর্ঘদিন পর বাংলাদেশে সহিংসতা ফিরেছে- এটা বাংলাদেশের জনগণের জন্য মোটেও ভালো খবর নয়। কোন কারণেই বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে আতঙ্ক ছড়ানো উচিৎ নয়। বিএনপির এমন কার্যকলাপের ফলে ক্ষমতাসীন দল অনেকটাই নির্ভার হয়ে গেলো। কারণ দীর্ঘদিন ধরে এই দাবিই করে আসছে যে বিএনপি একটি সন্ত্রাসী সংগঠন। মানুষকে পিটিয়ে মেরে, হাসপাতালে আগুন দিয়ে, বিচারপতির বাড়িতে হামলা করে কিংবা বিদেশীদের দিয়ে চাপ দিয়ে কোন ভালো ফলাফল বিএনপি বয়ে আনতে পারবে না। বরং সব দলেরই উচিৎ দেশের জনগণের মতামতকে গুরুত্ব দেয়া। গণমানুষের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে কিছু আইনের পরিবর্তন আনা জরুরি উল্লেখ করে ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, আমাদের সংসদে বেশিরভাগ সদস্য ব্যবসায়ী, এই সংখ্যা কমানো উচিৎ। এছাড়া সংসদ সদস্য পদে নমিনেশনের যে বাণিজ্য- এটা এখন ওপেন সিক্রেট। এমনটা হওয়া অনুচিৎ বলেও মনে করেন তিনি। তবে যা হলো, তাতে আওয়ামী লীগ আপাতত ‘স্বস্তি’ পেয়েছে বলে মনে করেন তিনি। তবে ততদিন ভিসা নিষেধাজ্ঞা বা নানামূখী চাপে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে গণতন্ত্র ফিরে আসবে না, যতদিন না এদেশের জনসাধারণ মানুষ তা অর্জন করতে চায় এবং তা অর্জনে নিজে অংশগ্রহণ করে বলেও মনে করেন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ।
অন্যদিকে, অনেকদিন পর মিছিল, মিটিং-সমাবেশ ফেরায় নিজেরাও গতি পেয়েছে বলে এরই মধ্যে মন্তব্য করেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেছেন, গত কয়েকদিনে নেতাকর্মীদের যে স্পিরিট ছিল, সেটা অব্যাহত থাকলে আওয়ামী লীগের বিজয় নিশ্চিত।
এদিকে, দেশে এখন পর্যন্ত জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার অনুকূল পরিবেশ রয়েছে বলে নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিরা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যে আশ্বস্ত ইসি জানিয়েছে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল নভেম্বর মাসের প্রথমার্ধের যে কোনো সময় ঘোষণা করা হবে। ফলে নির্বাচনের দৌড়ে অনেকটাই এগিয়ে থাকলো আওয়ামী লীগ।
বাংলাদেশের নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে আছে গোটা বিশ^। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নিষেধাজ্ঞা, অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপিয় ইউনিয়নসহ বিশে^র বিভিন্ন দেশ কড়া নজরদারিতে রেখেছিল। সেসব দেশও তাদের উদ্বেগের কথা জানিয়ে দিয়েছে। ২৮ অক্টোবর ঢাকায় রাজনৈতিক সমাবেশেকে কেন্দ্র করে সহিংসতার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ঢাকার সাত দেশের দূতাবাস ও হাইকমিশন। সোমবার মার্কিন দূতাবাসের ফেসবুক পেজে প্রকাশিত এ বার্তায় অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে পরিবেশ তৈরির আহ্বানও জানানো হয়েছে। রাজনৈতিক সমাবেশে সহিংসতার ঘটনায় গভীরভাবে উদ্বিগ্ন এবং প্রাণহানি ও আহতদের জন্য সমবেদনা জানিয়েছে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জাপান, কোরিয়া প্রজাতন্ত্র, নরওয়ে, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র সরকার। অবাধ, সুষ্ঠু, অংশগ্রহণমূলক ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করতে সব অংশীজনদের সংযম, সহিংসতা পরিহার এবং একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছে তারা। আর এর মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের দাবির (বিএনপি সন্ত্রাসী সংগঠন) বিষয়কে কিছুটা হলেও বিবেচনায় রাখতে তাদের বাধ্য করছে।
ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. গোবিন্দ চক্রবর্তী দেশ বর্তমানকে বলেন, রাজনীতিতে এমন সহিংতা পরিহার করা উচিৎ। নির্বাচন কমিশনের উপর সবগুলো রাজনৈতিক দলের আস্থা রাখা প্রয়োজন জানিয়ে অধ্যাপক গোবিন্দ বলেন, সরকার বার বার দেশে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের অঙ্গীকার করছে, করেছে। এখন দেশের রাজনৈতিক দলগুলোরও যৌক্তিক ভূমিকা রাখা উচিৎ। আমাদের রাজনীতির যেমন গৌরবময় ইতিহাস আছে, তেমনি আছে নেতিবাচক ইতিহাসও। সুতরাং সাধারণ মানুষের রায়কে সবাইকে মেনে নিতে হবে। তার আগে সকলের ভোট দেয়াটা নিশ্চিত করতে সকলকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে বলেও মনে করেন অধ্যাপক ড. গোবিন্দ।
এছাড়াও বাংলাদেশের আমজনতার কাছে শেখ হাসিনা সরকারের উন্নয়নের নমুনা স্বরূপ মেগা প্রকল্পগুলোর উদ্বোধন- টনিক হিসেবে কাজ করছে। কাল ১ নভেম্বর উদ্বোধন করা হবে আখাউড়া-আগরতলা ডুয়েলগেজ রেলপথ। এ রেলপথের ভার্চ্যুয়ালি আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন বাংলাদেশ ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী। আগামী ৪ নভেম্বর রাজধানীর আগারগাঁও থেকে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেলের এমআরটি লাইন-৬ উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওইদিন রাজধানীতে আওয়ামী লীগের বিভাগীয় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। ৯ নভেম্বর খুলনা-মোংলা রেললাইন উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি আগামী নির্বাচন উপলক্ষে খুলনার সার্কিট হাউজ মাঠে নির্বাচনি জনসভায় ভাষণও দেবেন। এর আগের দিন অর্থ্যাৎ ৮ নভেম্বর রাজধানীর হোটেল র‌্যাডিসনে দুদিনব্যাপী মেলার উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বলা হচ্ছে এই নভেম্বর নাগাদ ঢাকা সিটিতে বিআরটিসির বহরে আরও ১০০ এসি ডাবল ডেকার ইলেকট্রিক বাস যুক্ত হবে। এটি ঢাকা ও বাংলাদেশে প্রথম ‘সিটি সার্ভিস’ হিসেবে চলবে। আগামী ১২ নভেম্বর চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইন উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মেগা প্রকল্প, বিএনপির সহিংসতা, সরকারের সুষ্ঠু নির্বাচনের অঙ্গীকার- সবই আওয়ামী লীগের জন্য ইতিবাচক ইন্ডিকেটর হিসেবে কাজ করছে। এসবই আওয়ামী লীগের জন্য উইনিং ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।