এই বাংলাদেশকে কেউ দাবিয়ে রাখতে পারবে না: শেখ হাসিনা

# আনোয়ারায় হবে আরেকটি শিল্পাঞ্চল # ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ছয় লেইন করা হচ্ছে

কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত দক্ষিণ এশিয়া এবং বাংলাদেশের প্রথম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেলকে চট্টগ্রামবাসীর জন্য বিশেষ উপহার উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সময় তিনি চাটগাঁইয়া ও প্রমিত বাংলায় বলেন, দইজ্জ্যার (নদী) তল দিয়ে গাড়ি চলবে, দইজ্জ্যার তল দিয়ে মানুষ ঘুটঘুট বাড়ি যাবে, এটা আপনাদের জন্য বিশেষ উপহার নিয়ে এসেছি।
গতকাল শনিবার দুপুরে চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার কোরিয়ান ইপিজেড মাঠে চট্টগ্রাম মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগ আয়োজিত জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য প্রধানমন্ত্রী একথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা, স্বাধীনতার সুফল মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া এটাই আমার লক্ষ্য। নদীতে বারবার ব্রিজ করা হলে সিলটেশন হয়। যত ব্রিজ হবে তত সিলটেশন বাড়বে। এজন্য আমরা টানেল করে দিয়েছি। নদীর তল দিয়ে এখন গাড়ি চলাচল করবে। দক্ষিণ এশিয়ায় নদীর তল দিয়ে এত বড় টানেল এটাই প্রথম। এখন ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম শহরকে বাইপাস করে সরাসরি টানেল দিয়ে কক্সবাজারে যাওয়া যাবে।
টানেল নির্মাণের সঙ্গে জড়িতদের ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, দেশি-বিদেশি প্রকৌশলী, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরামর্শক, প্রশাসন, নৌবাহিনী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং শ্রমিকরা যারা দিনরাত পরিশ্রম করে টানেল বাস্তবায়ন করেছেন সবাইকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
চীনের প্রেসিডেন্টকে ধন্যবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, চীন সফরে গিয়ে টানেল করার কথা প্রেসিডেন্টকে বলেছিলাম, সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়েছেন।
চট্টগ্রামবাসীর জন্য আরও উপহার আসবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজ এই উন্নয়ন সম্ভব হয়েছে একমাত্র গত নির্বাচনে আপনারা নৌকা মার্কায় ভোট দিয়েছেন বলেই। নৌকা মার্কায় মানুষ যখনই ভোট দেয় তখনই উন্নয়ন হয়। এই চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ে বঙ্গবন্ধু শিল্পনগর হচ্ছে। ২২ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব ইতোমধ্যে আমরা পেয়েছি। আনোয়ারায় আরেকটি শিল্পাঞ্চল করা হচ্ছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ছয় লেইনের করা হচ্ছে। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কও আমরা ছয় লেইনে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
চট্টগ্রাম শহরে মেট্রোরেল চালু প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, চট্টগ্রামে মেট্রোরেল নির্মাণের সমীক্ষা চলছে। ইনশা আল্লাহ, মেট্রেরেল আমরা করে দেব। চাক্তাই থেকে কালুুরঘাট পর্যন্ত চার লেনের সড়ক আমরা করে দিচ্ছি। মিরসরাই পর্যন্ত বিশ্বের সবচেয়ে বড় মেরিন ড্রাইভ নির্মাণ করা হচ্ছে। পানি শোধনাগার প্রকল্প প্রথম পর্যায়ের কাজ শেষ হয়েছে। দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ চলছে। জলাবদ্ধতা নিরসনে ১১ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, দোহাজারি থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত রেললাইন আমরা নির্মাণ করেছি। রাঙামাটি পর্যন্ত রেললাইন আমরা নিয়ে যাবার পরিকল্পনা আছে। মাতারবাড়িতে ডিপ সি-পোর্ট হবে, এলএনজি টার্মিনাল হচ্ছে। অনেক উন্নয়ন করেছি। এত উন্নয়ন বলে শেষ করা যাবে না। চট্টগ্রামকে প্রকৃতই বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।
বিরোধী পক্ষকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগকে আন্দোলনের ভয় দেখিয়ে লাভ নেই। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আছে বলেই আজকে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, বিশ্বব্যাপী। এই বাংলাদেশকে কেউ দাবিয়ে রাখতে পারবে না, এটা হলো বাস্তবতা। বিএনপির সমালোচনা করে শেখা হাসিনা বলেন, আজকে বিএনপি সরকারের পতন ঘটাবে, নানা রকম আন্দোলনের হুমকি দেয়। একটা কথা স্পষ্ট করে বলতে চাই, জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে বাংলাদেশকে আজকে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা এনে দিয়েছে। ওই সমস্ত ভয়ভীতি আওয়ামী লীগকে দেখিয়ে কোনো লাভ নেই। বরং খালেদা জিয়া ভোট চুরি করেছিল বলেই ১৫ ফেব্রুয়ারি তাকে বাংলাদেশের মানুষ আন্দোলন করে ক্ষমতা থেকে হটিয়েছিল, এটা তাদের মনে রাখা উচিত। এরা ভোট চোর, জনগণের অর্থ চোর, ওরা খুনি। বিএনপি-জামায়াত মানেই হচ্ছে খুনি, হত্যাকারী, সন্ত্রাসী, জঙ্গিবাদে বিশ্বাসী। আওয়ামী লীগ শান্তিতে বিশ্বাস করে, আওয়ামী লীগ উন্নয়নে বিশ্বাস করে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আছে বলেই আজকে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, বিশ্বব্যাপী। এই বাংলাদেশকে কেউ দাবিয়ে রাখতে পারবে না, এটা হলো বাস্তবতা।
দুর্নীতির মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের সাজার প্রসঙ্গ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপির কাজ হচ্ছে মানুষ খুন করা, লুটপাট করা, দুর্নীতি করা। খালেদা জিয়া এতিমের অর্থ এতিমদের না দিয়ে এক ব্যাংকে রেখে দিয়ে সেই অর্থ আত্মসাতের মামলায় সাজাপ্রাপ্ত। তার ছেলে তারেক রহমান বিদেশে পালিয়ে আছে। ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে মুচলেকা দিয়ে দেশ থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। আর কোটি কোটি টাকা মানি লন্ডারিং করেছে। ১০ ট্রাক অস্ত্র চোরাকারবারির সঙ্গে জড়িত, সে কারণে সে সাজাপ্রাপ্ত। একুশে অগাস্ট গ্রেনেড হামলা করে আমাকে হত্যাচেষ্টা করেছে, সেই মামলায় সাজাপ্রাপ্ত।
তিনি বলেন, নৌকায় ভোট দিলে হয় উন্নয়ন, আর বিএনপি করে দুর্নীতি, মানুষ খুন। এরা খুন করা ছাড়া আর কিছু জানে না। ক্ষমতায় গিয়ে ২১ হাজার আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীকে খুন করেছিল। এই চট্টগ্রাম দিয়ে দশ ট্রাক অস্ত্র এনেছিল। গ্রেনেড হামলা করে আওয়ামী লীগের ২২ জন নেতাকর্মীকে হত্যা করেছিল।
আমরা সরকারের পক্ষ থেকে বয়স্ক ভাতা দিচ্ছি, বিধবা, স্বামী পরিত্যক্তা নারী আর প্রতিবন্ধীদের ভাতা দিচ্ছি। শিক্ষা উপবৃত্তি দিচ্ছি। সবার হাতে হাতে এখন মোবাইল ফোন। ডিজিটাল বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করেছি। বহুমুখী উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। দারিদ্র্যের হার ৪১ থেকে ১৮ শতাংশে নামিয়ে এনেছি। গৃহহীনদের ঘর করে দিচ্ছি। জাতির পিতার বাংলায় একজন মানুষ ও গৃহহীন, ভূমিহীন থাকবে না, এটাই আমাদের লক্ষ্য।
আগামী নির্বাচনে আবারও নৌকায় ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি তো বাবা-মা, ভাই সব হারিয়েছি। আমার বাবা হত্যার বিচার করতে পারতাম না। কারণ ইনডেমনিটি দেওয়া হয়েছিল। জিয়াউর রহমান দিয়েছিলেন। খালেদা জিয়া বঙ্গবন্ধুর খুনিদের পার্লামেন্টে বসিয়েছিলেন। সেদিন আমি আর রেহানা বিদেশে ছিলাম বলে বেঁচে গিয়েছিলাম। তারপর ছয় বছর আমাকে দেশে আসতে দেওয়া হয়নি। যখন দেশে ফিরে আসি তখন ওই খুনি আর যুদ্ধাপরাধীরা ক্ষমতায় ছিল। বাংলাদেশে আমার ওপর বারবার হামলা হয়েছে, বারবার হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু আমি জীবনের মায়া করিনি। একটা কথা বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের মানুষ, যে মানুষের জন্য আমার বাবা সারাজীবন কষ্ট করেছেন, জেলজুলুম সহ্য করেছেন, জীবন দিয়ে গেছেন, সেই মানুষের ভাগ্যের আমি পরিবর্তন করবই।
জনসভা মাঠে প্রধানমন্ত্রী চট্টগ্রামের আরও কয়েকটি উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন ও ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন। টানেল উদ্বোধনকে স্মরণীয় করে রাখতে স্বারক ডাকটিকিট উন্মোচন ও ৫০ টাকা মূল্যমানের নোট অবমুক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী।
উদ্বোধন মঞ্চের আনুষ্ঠানিকতা সেরে প্রধানমন্ত্রী দুপুর ১টা ১০ মিনিটে পাশে জনসভা মঞ্চে যান। চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোতাহেরুল ইসলাম চৌধুরীর সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমানের সঞ্চালনায় জনসভায় আরও বক্তব্য রাখেন, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য, জাতীয় সংসদের উপনেতা বেগম মতিয়া চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, প্রেসিডিয়াম সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ এবং ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ প্রমূখ।
উল্লেখ্য, টানেল উদ্বোধন উপলক্ষে আনোয়ারায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জনসভায় সকাল ৯টা থেকে ইপিজেডের মাঠে চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলাসহ মহানগর থেকে দলীয় কর্মীরা রঙবেরঙের ব্যানার ফেস্টুন হাতে নিয়ে, রঙিন টিশার্ট পরে সমাবেশে যোগ দিয়েছেন। দুপুর গড়াতেই মাঠ ভরে যায় কানায় কানায়। এমনকি তীব্র রোদ থেকে বাঁচতে হাজার হাজার আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মি রাস্তায় দাঁড়িয়ে মাইকে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য শুনতেও দেখা যায়।