ঘূর্ণিঝড় হামুনের তাণ্ডবে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার ছনুয়া ইউনিয়নের উপকূলে অবস্থিত দক্ষিণ চট্টগ্রামের সর্ববৃহৎ সচল পাঠাগার ‘বাঁশখালী উপকূলীয় পাবলিক লাইব্রেরি’। এটি চট্টগ্রাম শহর থেকে ৩৬ কিলোমিটার দূরত্বে সাগর পাড়ে প্রায় ৮ হাজার বইয়ের একটি সমৃদ্ধ পাঠাগার। গত মঙ্গলবার বিকেলেও যেখানে পাঠকরা স্বাচ্ছন্দ্য মনে বই পাঠ করছিলেন, অথচ আজ সেটি খোলা আকাশের নিচে এক উন্মুক্ত গৃহে পরিণত হয়েছে।
মঙ্গলবার রাতে চট্টগ্রাম দিয়ে বয়ে যাওয়া ঘূর্ণিঝড় হামুনের আঘাতে আলোকিত এই বাতিঘরকে ক্ষতবিক্ষত করে দিয়েছে। হামুনের প্রচণ্ড আঘাতে নষ্ট হয়েছে ২ হাজার বই, লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে হুলরুম, পাঠকরুম, স্টাডি রুম ও নামাজঘর। সব মিলিয়ে পাঠাগারটির প্রায় ৪ লক্ষাধিক টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বর্তমানে দেশের সচল পাঠাগার সমূহের মধ্যে এটি ছিল একটি বৃহত্তম সচল পাঠাগার।
জানা যায়, ২০১০ সালের ২৯ এপ্রিলে উপকূলীয় পাবলিক লাইব্রেরিটি সংবাদকর্মী সাঈফী আনোয়ারুল আজিম বাঁশখালী উপজেলার ছনুয়া ইউনিয়নের খুদুকখালী গ্রামে প্রতিষ্ঠা করেন। পাঠাগারের বর্তমান সদস্য সংখ্যা ৩০০ জন, বইয়ের সংখ্যা প্রায় ৮ হাজার ও স্টাফ কর্মচারী ৩ জন। ২০১৭ সালে পাঠাগারটি গণগ্রন্থাগার অধিদফতর থেকে নিবন্ধন লাভ করে। এ ছাড়া এটি বাঁশখালী উপকূলের বাতিঘর নামেও পরিচিত।

লাইব্রেরির নামে ক্রয়কৃত প্রায় ২২ শতক জমির জমির ওপর টিনের ছাউনির এ পাঠাগারে রয়েছে ৮ হাজারেরও অধিক বই। গত ১৩ বছর ধরে ইতিহাস, ঐতিহ্য, মুক্তিযুদ্ধ, ধর্মীয়, সাহিত্য ও বিজ্ঞানসম্মত এসব বই সংগ্রহ করে আসছে লাইব্রেরী কর্তৃপক্ষ। আর এসব বই সংগ্রহের পেছনে শ্রম দিয়েছেন দেশের নানান প্রান্তের সুপ্রতিষ্ঠিত লেখক, সাংবাদিক, কবি, সাহিত্যানুরাগীরা।
মনোরম পরিবেশে গড়ে উঠা উপকূলের বাতিঘর হিসেবে খ্যাত এ পাঠাগারকে ঘিরে প্রতিদিন বই পড়ার আনন্দে মেতেছিল বাঁশখালীর তিন শতাধিক শিক্ষার্থী। প্রায় ১৫০ জন নারী সদস্য লাইব্রেরী থেকে নিয়মিত বই ধার নিয়ে ঘরে বসে অধ্যয়ন করেন। দূরের গ্রামের বই পাঠকরাও লাইব্রেরী থেকে বই ধার নিয়ে অধ্যয়ন করতেন নিয়মিত। কিন্তু পাঠাগারটি প্রাকৃতিক দূর্যোগে তছনছ হওয়ায় ৩০০ শিক্ষার্থীর কপালে পড়েছে চিন্তার ভাঁজ।
পাঠাগারের গ্রন্থাগারিক হুরি জান্নাত জানান, ‘পাঠাগারের আজকের দৃশ্যটি দেখে খুব খারাপ লাগছে। তিলে তিলে গড়ে ওঠা পাঠাগারটি চোখের সামনেই যেনো নিমিষেই লণ্ডভণ্ড হয়ে গেলো। এই দৃশ্য দেখে চোখ দিয়ে অঝোরে কান্না আসতেছে।’
পাঠাগারের নারী সদস্য কলি আকতার জানান, ‘পাঠাগারের আজকের দৃশ্য দেখে মর্মাহত হয়েছি, ঘূর্ণিঝড় আমাদের হাজারো বই পড়ার স্বপ্নকে এলোমেলো করে দিয়েছে। স্বপ্নেও ভাবিনি এমনটা হবে।’
পাঠাগারের প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি সংবাদকর্মী সাঈফী আনোয়ারুল আজিম জানান, ‘ঘূর্ণিঝড় হামুনের আঘাতে লাইব্রেরির প্রায় ৪ লক্ষাধিক টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, নষ্ট হয়ে গেছে ১৩ বছর ধরে তিলে তিলে সংগ্রহ করা প্রায় ২ হাজার বই ও অনেকগুলো সংগৃহীত ডকুমেন্টস। আমাদের স্বপ্নের এই পাঠাগার চোখের পলকেই তছনছ হয়ে যাবে কল্পনাও করিনি। একটি টেকসই ভবন না হওয়া পর্যন্ত পাঠাগারের ঘূর্ণিঝড় আতঙ্ক কাটবে না।’’